২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঝাড়ু হাতে পুলিশের মাঠে নামার ঘটনায় বিব্রত চসিক মেয়র

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ এক সময়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সড়কের কারণে দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল চট্টগ্রাম। সময়ের পরিক্রমায় সে চট্টগ্রাম পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। ৫০ লাখের বেশি জনসংখ্যার এ শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক)। নানা কারণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এখন নগরবাসীর জন্য রীতিমতো বিরক্তিকর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে আছে। জঞ্জাল জমতে জমতে অর্ধশতাধিক খাল ভরাট হয়ে বর্ষা মওসুমে অথৈই পানিতে সারা শহর যেমন ভাসতে থাকে, তেমনি প্রতিটি সড়কের পাশে আবর্জনার স্তূপের পুঁতিময় গন্ধে সাধারণ মানুষের চলাফেরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি প্রধান সড়ক থেকে অলিগলির রাস্তা পর্যন্ত খানাখন্দক ও গর্তে চলাচল অযোগ্য। সিটি কর্পোরেশন যেন নীরব এক দর্শক।

এ অবস্থায় শুক্রবার ঝাড়ু ও বেলচা হাতে পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন অভিযানে নেমেছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) হাজারখানেক নারী-পুরুষ সদস্য। নেতৃত্ব দিয়েছেন খোদ সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল ম-ল। অস্ত্র ছেড়ে ঝাড়ু হাতে পুলিশ সদস্যদের রাস্তায় নেমে আবর্জনার ভাগাড় পরিষ্কার কাজ নজরে আসায় সাধারণ মানুষ বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি পুলকিত হয়েছে। নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের সামনে থেকে চারভাগে বিভক্ত হয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসা, জিইসি, টাইগারপাস, কাজির দেউড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের এ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান পরিচালিত হয়।

এদিকে, পুলিশের এ ঘটনা লজ্জায় ফেলেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে। সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছেন সিটি মেয়র এম মনজুর আলম। শনিবার পুলিশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযানের ঘটনা ফলাও করে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রচারিত হবার পর মেয়রের যেন বোধোদয় হয়েছে। শনিবার তিনি নগরীর পরিবেশ সুরক্ষায় পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সচেষ্ট থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সকালে তার বাস ভবনে পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের তলব করে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি বলেন, নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখা ও উন্নত পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। তিনি বলেন, ৫০ লক্ষাধিক নগরবাসীর জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত দুই হাজার সেবক রয়েছে। সকলকে সার্বিকভাবে স্ব-স্ব কর্মে নিয়োজিত রাখা এবং কাজ আদায় করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম অর্থনীতির স্বর্ণদ্বার। এ চট্টগ্রাম দিয়ে দেশের ৯০ ভাগ আমদানি ও রফতানির কাজ হয়। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক নগরী, বন্দরনগরী ও নৈসর্গিক নগরী। এ নগরীর সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ওপর নির্ভর করে দেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। পর্যটননগরী খ্যাত এ চট্টগ্রামে দেশী-বিদেশী মেহমানদের স্বাচ্ছন্দে চলাচল, বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। মেয়র বলেন, পরিচ্ছন্ন বিভাগে কর্মরত এবং এ বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলকে আন্তরিক হতে হবে। তিনি সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে চট্টগ্রামের সুনাম ও মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার তাগিদ দেন। পরিবেশ সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন নগরী রাখার ক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন মঞ্জুর। তিনি যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলা, নালা-নর্দমা ভরাট না করা এবং নির্ধারিত ডাস্টবিন ও কন্টেনারে আবর্জনা ফেলার আহ্বান জানান। বৈঠকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হাজী নুরুল হক, কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, মোঃ ইসমাইল বালি, মোহাম্মদ আজম, মোরশেদ আক্তার চৌধুরী, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা, পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা, তত্ত্বাবধায়ক ও পরিদর্শকগণ উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম মহানগরীর রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ইতোমধ্যে সরকারী উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি বৈঠকে মেয়র মঞ্জুর আলম আর্থিক তহবিল সঙ্কট এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবের বিষয়টিও তুলে ধরে বার বার পাশ কাটিয়ে গেছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এখন যে চেন অব কমান্ড একেবারে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে তা কখনও স্বীকার করেননি। তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে যে সকল আয়বর্ধক প্রকল্প গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটিকে যে স্বাবলম্বী করা হয়েছিল সে অবস্থাও তিনি ধরে রাখতে পারেননি। আয়বর্ধক বিভিন্ন প্রকল্প তার শাসনামলে কিছুর অবস্থা হয়েছে অর্ধমৃত, আর কিছু হয়েছে লোকসানি। কয়েকটি প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, আর কয়েকটি ভাড়ায় দেয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে সিটি কর্পোরেশনের আর্থিক তহবিলের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। যে কারণে এফডিআর হিসেবে রাখা গচ্ছিত ভেঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ করতে হয়েছে। বর্তমান মেয়রের ক্ষমতার মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে নির্বাচন করার একটি ঘোষণাও রয়েছে। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসে মেয়র প্রত্যক্ষ করলেন আবর্জনা পরিষ্কারে পুলিশ সদস্যদের রাস্তায় নামার জননন্দিত একটি ঘটনা; যা তাকে রীতিমতো লজ্জায় ফেলেছে। লজ্জা ঢাকতে তিনি শনিবার পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের ডেকে নসিহত করলেন যাতে শহর পরিচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু কথায় আছে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। প্রশাসনিক কর্মকা-ে যেখানে অচলাবস্থা সেখানে এ কর্পোরেশনে বর্তমান হয়েছে কার কথা কে শোনেÑসে অবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, কর্পোরেশন পরিচালনায় কর্মকা-ে তার নিজস্ব কোন কমান্ড পরিলক্ষিত হয় না। ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কারও কারও প্রভাব সিটি কর্পোরেশন প্রশাসনে এত বেশি যে মেয়র তাদের দ্বারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচালিত হয়ে থাকেন। যে কারণে আয়বর্ধক প্রকল্পগুলোর নাজুক পরিস্থিতি। সিএমপি প্রশাসন ইতোমধ্যে নগরীর রাস্তার দুপাশে চলাচল রাস্তা অর্থাৎ ফুটপাথ অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বেশকিছু রাস্তাঘাট দখলমুক্ত হয়ে যানবাহন ও জন চলাচলে স্বস্তি এসেছে। সিএমপির এ ধরনের কর্মসূচী অনুযায়ী জেলা পুলিশ প্রশাসনও মহাসড়ক থেকে ইতোমধ্যে রাস্তার দুপাশে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করছে।