১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই ঘন্টায়    
ADS

মুক্তির অণ্বেষণে মানু[ষ]ষী

  • অপূর্ব কুমার কুন্ডু

আগুনের তাপে উথলে ওঠা দুধ হাঁড়ি ছাপিয়ে যেমনিভাবে পরিমাণে এবং সামষ্টিকভাবে অপচয়ের স্বীকার হয় অনেকটা সেভাবে পুরুষের সঙ্গে জড়িয়ে একজন নারীর জীবন কিভাবে ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু এবং একাকিত্বের শেষ সীমায় পৌঁছে যায় তা নিয়েই নাকট ‘মানু[ষ]ষী’। ইতালিয়ান নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক এবং নাট্যকার দারিও ফোর নাটক ‘এ ওম্যান এ্যালন এ্যান্ড আদার্স’ অবলম্বনে বলিষ্ঠ এবং তেজোদীপ্ত রূপান্তরে রূপান্তরিত করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং নাট্য ব্যক্তিত্ব অসীম দাশ। বাংলাদেশীর রূপান্তরিত ইতালির নাট্যকারের নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন আবার কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নির্দেশক শান্তনু দাস। দৃষ্টিপাত নাট্যদল আয়োজিত ছয় দিনব্যাপী নাট্যোৎসবের শেষ দিনে অর্থাৎ ১৪ নবেম্বর শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় অসীম দাশ রূপান্তরিত, শান্তনু দাস নির্দেশিত, কলকাতার কল্যাণী কলাম-লম প্রযোজিত নাটক মানু[ষ]ষী।

মানু[ষ]ষী নাটকের কেন্দ্রীয় এবং একমাত্র চরিত্র পঞ্চাশ উর্ধ্ব এক নারী যার নাম মেলা। ব্যবসায়ী স্বামী বাইরে থেকে ঘরে তালা মেরে রেখে যাওয়ায় মেলা গৃহবন্দী। বন্দী গৃহের একটি ঘরে স্বামীর প্যারালাইজড ভাই আধমরা হয়ে পড়ে থাকলেও মেলা তাকে দেখে সর্বদা শঙ্কিত কেননা বিগত সময়ের সব গৃহপরিচারিকা ঐ প্যারালাইজড রোগীর কামাতুর দাবড়ানী খেয়ে পালিয়েছে। বদ্ধ ঘরে দমবন্ধ দশা মেলার অবলম্বন রেডিওর আবহ, টেলিভিশনের দৃশ্য, টেলিফোনের খবরাখবর আর ছোট্ট একটা জানালা। জানালার অপর পাশের ফ্ল্যাটে হঠাৎ আগত বাসিন্দাকে দেখতে পেয়ে মন উজার করে মেলা বলে চলে তার মরমীয় কথা। কৈশরের ভালবাসা রঞ্জনের নিরুদ্দেশ, যৌবনে প্রেমহীন স্বামীর সম্ভোগ, ফরাসাী ভাষা শিখতে যেয়ে অসম প্রেম ও তার নৃশংস পরিণতি, দুই ছেলে এক মেয়েকে মানুষ করে গড়ে তোলায় কাছে ধরে রাখতে না পারা, বড় ছেলের বিদেশী মেম বৌমার অপেক্ষায় থেকেও এ্যাডজাস্ট করতে না পারার অজুহাতে উপেক্ষিত হওয়া, কার্য কারণ ছাড়াই স্বামীর ব্যাংকক যাত্রা প্রভৃতি কথা উচ্চারণের মধ্যে দিয়েই উথলে অপচয় হওয়া দুধের মতো মেলার গর্ব সে একা, সে সত্যিই একা। একাই যথেষ্ট যে কারও পক্ষে যে কোন শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করে তুলে ধরা। রূপান্তরে হাত দিয়ে নারী বাদী কিংবা পুরুষ বিদ্বেষী হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অসীম দাশ বরাবরের মতো মাত্রা নিয়ন্ত্রিত, মূল দ্বন্দ্বে নিমগ্ন কিন্তু মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একমাত্র দৈব ব্যাপার না বরং মানুষও যে নিয়তি নির্ধারণ করে একথা অসীম দাস যেমন লিখেছেন ঠিক তেমনি সময় এবং পথ পরিক্রমার এবড়ো থেবড়ো টানাপোড়েনকে এক সুতায় গেঁথেছেন। গাঁথুনিতে রূপকল্প ও নির্দেশনায় শান্তনু দাস একের মাঝে দুই আবার দুইয়ের মাঝে এক। নাটকের চরিত্র একটি কিন্তু অভিনয় করেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রী মিলে দুজন। জটিলতাটা হতে পারত শুধু মাত্র নারীর কিন্তু দিক নির্দেশনায় জটিলতাটা নারী-পুরুষ উভয়ের।

হতে পারত পুরুষের নিষ্পেষণ অথচ হয়ে গেল নিষ্পেষণের পাশাপাশি অবদমন (প্রসঙ্গ : একাকিত্বকে গ্রহণ)। হতে পারত আমাকে দেখ’র অত্যাচারে পারফরমেন্সরত অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রীর দর্শকদের দৃষ্টির ফোকাস থেকে সরে যাওয়া তা না হয়ে হলো উভয়ের জাগ্রত সত্তা। একাধারে রূপকল্প ও নির্দেশনা অপরদিকে পুরুষ হয়ে আঙ্গিক-বাচিক-সাত্তিক ভঙ্গিমায় নারী চরিত্রে শান্তনু দাসের অনবদ্য অভিনয়। মঞ্চে দাপুটে অভিনয়ে শান্তনু দাসের সমান্তরালে জীবনসঙ্গী, শিল্প সঙ্গী, সহঅভিনেত্রী অনন্যা দাস আর ব্যাকগ্রাউন্ডে টিম বাংলাদেশ। তিন তিনটি দেশের (প্রসঙ্গ : ইতালি, ভারত, বাংলাদেশ) শিল্প উপকরণ মিলে মিশে যখন শিল্প সৃজন এক মঞ্চে এক বেশে তখন মানুষ এবং মানুষী জাগ্রত এবং জীবন্ত, মুক্তির অন্বেষণে আবহমান থেকে প্রবাহ মানে, কাল থেকে মহাকালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্ম জিজ্ঞাসা, ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাই দিবে অধিকার’ এর মঞ্চ জিজ্ঞাসা কল্যাণী কলাম-লম প্রযোজিত নাটক মানু[ষ]ষী।