১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিক্ষাঙ্গনে আশার আলো

  • বিভাষ বাড়ৈ

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষা সেক্টর জনমনে সবচেয়ে বেশি আশার সঞ্চার করে চলেছে। যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের যে কোন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চেয়ে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি তৈরি করেছে শিক্ষা খাত। সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অধিদফতরগুলো। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষপ্রান্তে এসে পাবলিক পরীক্ষার লাগাতার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ম্লান হতে বসেছে সরকারের শিক্ষার সব অর্জন। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে আছে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর সংঘাতে নিজেদেরই কর্মী হত্যার উদ্বেগজনক ঘটনা। শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত আর একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, অভিভাবকদের জন্য এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হয়, সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন শিক্ষার অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে লাগাতার প্রশ্ন ফাঁস। কেউ কেউ বলছেন, ২০১৪ হচ্ছে প্রশ্ন ফাঁসের বছর।

তবে আশার কথা হচ্ছে, গত কয়েক বছরের উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষা তারপরেও এগিয়ে গেছে অনেকদূর। বিশ্বব্যাংক তার সর্বশেষ রিপোর্টে বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হারসহ শিক্ষায় ও নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হারে শতভাগসহ অন্য শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ৪৪ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে। সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলেছে, শিক্ষা খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষার প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিগম্যতা ও সমতা অর্জনে উল্লেযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে উপবৃত্তি। সংস্থটির মতে, বছরের শুরুতেই কয়েক বছর ধরে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেয়া ও উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে অধিক সংখ্যায় নিম্ন আয়ভুক্ত পরিবারের শিশু ও মেয়েদের ভর্তির ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন অভিগম্যতা অর্জন করে ফেলেছে।

বছরের শুরুতেই শিক্ষাঙ্গনজুড়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের ধ্বংসযজ্ঞ

২০১৪ শিক্ষাবর্ষের শুরুটা ছিল শিক্ষাঙ্গনের জন্য রীতিমতো ভয়াবহ। জাতির মেরুদ- শিক্ষাব্যবস্থা পুরোই ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সংগঠন জামায়াত-শিবির। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিরোধের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে নিজেদের একাত্তরের চেহারার জানান দেয় উগ্রবাদী এ গোষ্ঠী। এ দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে সৃষ্টি হয় এক জঘন্য নজির। যার ক্ষতি আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়। নির্বাচন প্রতিহত করার নামে বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচনী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা দেশের ২৫টি জেলায় ৫৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগুন দিয়ে জালিয়ে দেয়। নির্বাচনী কেন্দ্র ব্যবহৃত এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের কারণে বই-খাতা, চেয়ার-টেবিল-বেঞ্চ, চক-ডাস্টার, শিক্ষা উপকরণ এবং কম্পিউটার ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ সব জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বাভাবিক শিক্ষাদান ব্যাহত হয়েছিল দীর্ঘদিন। সরকার ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফিরিয়ে আনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগের অবস্থা। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ বিষয়ে বলছিলেন, গেল ডিসেম্বর-জানুয়ারির সময়টা ছিল এ দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের এক জঘন্য নজির। এ দেশের জন্ম থেকে যারা দেশের বিরোধিতা করেছে, তারাই শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। কষ্ট পেয়েছে আমাদের চার কোটি শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় লেখাপড়া নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেয়া ছিল আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জনগণ আর সরকারের সহযোগিতায় আমরা সেই দুঃসময় পার করে এসেছি। আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে পেরেছি। স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে সভ্যতাবিনাশী যে অপকর্ম চালিয়েছে, তার সেমুচিত জবাব ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরাই দেবে ভবিষ্যতে। জানা গেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে যে সব জেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাংচুর, অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলো পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করতে শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের পরিবর্তে পাশে টিনশেড ঘর দিয়েও শ্রেণী কার্যক্রম চালু রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এমনকি কক্ষ সঙ্কট থাকলেও সেখানে দুই-তিন দফায় পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হয়েছে। ৫৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্যাডাররা। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪৪৩টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৮৭টি, মাদরাসা ২৬টি এবং কলেজ ১২টি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বছরের একটি ক্লাসও যেন বাদ না যায়, সে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নির্বাচনী সহিংসতার আগুনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়। যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি ক্ষতি হয়েছে, সেগুলোয় পুর্ননির্মাণ করেছি। তবে বিকল্প ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা প্রথম থেকেই ছিল। তাৎক্ষণিক লেখাপড়ার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য ভাল কক্ষগুলোয় দুই-তিন শিফট করে ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

বিএনপি-জামায়াতের তা-বের পরেও ৩২ কোটি বই বিতরণ

২০১৩ সালের শেষের দিক থেকেই দেশজুড়ে ছিল আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের হরতাল-অবরোধসহ নাশকতা। ফলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল সারাদেশের বিনামূল্যের ৩২ কোটি বই বিতরণের বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে। কিন্ত শিক্ষামন্ত্রীর সর্বক্ষণিক কঠোর নজরদারি ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তৎপরতায় সরকার সফল হয়। ২০১০ সাল থেকে সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শুরু করে আসছে। পর পর পাঁচ বছর বছরের শুরুতেই সারাদেশে ঘরে ঘরে বই পৌঁছে দিয়ে পৃথিবীতে নতুনভাবে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এদিকে আসছে নতুন বছরের জন্যও এখন প্রস্তুত প্রায় ৩৩ কোটি পাঠ্যবই। সারাদেশে চলছে বই বিতরণের কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই ছাত্রছাত্রীরা যেমন পায়নি বিনামূল্যের বই, তেমনি বছরের প্রথম দিনও পাঠ্যবই হাতে পায়নি। বরং তা পেতে পেতে মার্চ-এপ্রিল পার হয়ে যেত প্রতিবছর। আর এ সুযোগে পাঠ্যবই নিয়ে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র অস্থির করে তুলত বইয়ের বাজার

পরীক্ষায় মেধার বিস্ফোরণ, প্রশ্নের মুখে শিক্ষার মান

বছরজুড়েই পাবলিক পরীক্ষায় অব্যাহত ‘মেধার বিস্ফোরণ’র পর উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ভর্তি পরীক্ষায় গণফেলের প্রেক্ষাপটে দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসএসসি, এইচএসসিসহ সকল পবলিক পরীক্ষায় গণহারে পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির উদ্বেগজনক ঘটনার পর শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাদান ও সকল পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে। ভাবার সময় হয়েছে শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও। শিক্ষাবিদরা একই সঙ্গে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, শিক্ষার সংখ্যাগত সূচকে রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটলেও, প্রশ্নের মুখে পড়ে আছে শিক্ষার মান। প্রচলিত পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার অধিকাংশ সূচনকেই যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষার মান নিয়ে বছরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পুরোটা সময়েই আলোচিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় গণফেলের বিষয়টি।

পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিসহ সকল সূচকেই আগের বছরের সাফল্যকে ম্লান করে দিয়ে দিয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। পাসের হার ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৭০ হাজার ৬০২ জনে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায়ও আগের সকল ভাল ফলকে ম্লান করে ফলাফলের প্রতিটি সূচকেই শিক্ষার্থীদের সাফল্য চলে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাসের হার ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জনে। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণের স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সকল ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায়েই রীতিমতো ফল বিপর্যয় ঘটেছে।

লাগাতার প্রশ্ন ফাঁসে চ্যালেঞ্জের মুখে শিক্ষা

বিএনপি-জামায়াতের শিক্ষাবিরোধী কর্মকা- বছরের শুরুতেই আস্তে আস্তে সামাল দিতে পারলেও, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে সারাবছরই সমালোচনার মুখে থাকতে হয়েছে সরকারকে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে সকল পরীক্ষার প্রশ্নই ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফেব্রুয়ারিতে এইচএসসি পরীক্ষার ইংরেজী প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা দিয়ে শুরু। সেই পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নে পরে পরীক্ষা নিলেও সুবিধা হয়নি। চলতে থাকে অন্যান্য পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। প্রশ্নপত্র ফাঁসের রাহু থেকে মুক্ত হতে পারেনি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাও। একের পর এক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। তবে এ পরীক্ষাই নয়Ñজেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, বিসিএসসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠতে থাকে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কখনোই বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করেনি। আবার মাঝে মাঝে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের হোতাদের শাস্তির ঘোষণা দিলেও, তা বাস্তবায়ন হয়নি।

শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলছিলেন, প্রশ্ন ফাঁস চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর বিরুদ্ধে কড়া আইনী ব্যবস্থা জরুরী। অপরাধ অপরাধই। তবে যেসব অভিভাবক ফাঁস হওয়া প্রশ্ন শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তাঁরাও ভুল করছেন নিজেদের সন্তানের ক্ষতি করছেন। প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে এড়িয়ে গেলে হবে না। এটা তো আর ভিন্ন গ্রহ থেকে এসে করে যায়নি। এটা ঘটেছে, এটাই সত্য। তাই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরী। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ ইকরামূল কবীর বলছিলেন, শিক্ষানীতিতে যেহেতু অষ্টম শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষা কথা বলা হয়েছে তাই সেভাবে আগানোই ভাল ছিল। পঞ্চম শ্রেণীতে উপজেলা ভিত্তিতে একটি পরীক্ষা হতে পারত। এভাবে শিশুদের দিয়ে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া ঠিক হয়নি। তাছাড়া প্রশ্ন ফাঁস পরীক্ষাকে আরও বিতর্কিত করে ফেলেছে। এখন সময় হয়েছে নতুন করে ভাবার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে এবার ভাবার সময় হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করার সুপারিশ করে তিনি বলেন, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে। একই সময়ে যেহেতু একটি পাবলিক পরীক্ষা হচ্ছে, তাহলে শিশুদের জন্য পঞ্চম শ্রেণীতে এভাবে একটা পরীক্ষা নেয়ার মানে হয় না।

তারপরেও আশার আলো

স্বল্প মেয়াদে প্রশ্ন ফাঁস শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও, অর্জন একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। গত কয়েক বছর শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের নেয়া যুগান্তকারী সব পদক্ষেপের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষায় ইতিবাচক ধারা সূচিত হয়েছে। গত কয়েক বছরের উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষা এগিয়ে গেছে অনেকদূর। বিশ্বব্যাংক তার সর্বশেষ রিপোর্টে বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ও শিক্ষায় ও নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হারে শতভাগসহ অন্য শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট বলেন, শ্রমশক্তিতে তারুণ্যের প্রাধান্য বাড়ায় আগামী ১০ বছর বাড়তি সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। এ সুবিধা পেতে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে নতুন কৌশল নিতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কর্মমুখী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, আগামী ১০ বছরে কর্মক্ষম নাগরিকের সংখ্যা বাড়বে এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমবে।

এ প্রেক্ষাপটে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ও দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রবৃদ্ধিসহ সামনে এগোনোর এক দারুণ সুযোগ পাচ্ছে দেশটি। বাংলাদেশ অবিচলভাবে শিক্ষায় অভিগম্যতা বাড়িয়েছে। ফলে প্রাথমিক স্কুলে মোট ভর্তির হার ৯১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০০ শতাংশের ওপরে হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তির হার ৫২ থেকে ৬২ শতাংশ হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে ভর্তির হার ৩৩ থেকে ৪৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার ৭ থেকে ১০ শতাংশ হয়েছে।