২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুন্সীগঞ্জে একদিন

চয়ন বিকাশ ভদ্র

রাজধানী থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক জনপদ মুন্সীগঞ্জ। এ জেলাটি অতীশ দীপঙ্কর, জগদীশ চন্দ্র বসু, হুমায়ূন আজাদের স্মৃতিবিজড়িত জনপদ। আগে নাম ছিল বিক্রমপুর। ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারী হরগঙ্গা কলেজের নামের নিচে এখনও লেখা আছে বিক্রমপুর। ঢাকার সদরঘাট থেকে বিকেল সাড়ে ৩টায় লঞ্চে গেলাম মীরকাদিমের কাঠপট্টি, সেখান থেকে ইজিবাইকে মুন্সীগঞ্জের কাচারী সড়কে নামলাম। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রিক্সাওয়ালার কাছে একটি ভালো রেস্টুরেন্টের নাম জানতে চাইলে সে সবুজ ছায়া এর নাম বলল। গেলাম সেখানে। হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করে নিলাম। তারপর আরেক রিক্সায় গেলাম হরগঙ্গা কলেজে। স্বাগত জানালেন হরগঙ্গা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বন্ধু আহসান কবির চঞ্চল। তার সঙ্গে সার্কিট হাউসে গেলাম। রাতে সেখানেই থাকলাম। মুন্সীগঞ্জে এই প্রথম যাওয়া। বন্ধু চঞ্চলকে বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে সব ব্যবস্থা করলেন। আমরা একটা ইজিবাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম রামপাল কলেজে। রাস্তার দুই পাশে প্রচুর সবুজের সমারোহ চোখে পড়ল। তার ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় পুকুর আর পুকুরপাড়ে নতুন বাড়ির পাশে প্লাস্টারবিহীন পুরনো বাড়ি চোখে পড়ল। বোঝা গেল একসময় এটি সমৃদ্ধশালী জনপদ ছিল। এখানকার বাড়িগুলো টিন আর কাঠ দিয়ে একই ডিজাইনে তৈরি করা। কোনটার ভিত পাকা, কোনটার কাঁচা। আমরা একে একে ইদ্রাকপুর দুর্গ, রামপাল দীঘি, বল্লাল সেনের বাড়ি, হরিশচন্দ্রের দীঘি, বাবা আদম শহীদ মসজিদ, অতীশ দীপঙ্কর স্মৃতিস্তম্ভ দেখলাম।

ইদ্রাকপুর দুর্গ

মুন্সীগঞ্জ শহরের ইদ্রাকপুরে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ইদ্রাকপুর দুর্গ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরে পুরনো ইছামতি নদীর পশ্চিম তীরের ইদ্রাকপুরে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গের চেয়ে এটি আয়তনে কিছুটা ছোট। সে সময় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকা রক্ষা করার জন্য নির্মিত হয়েছিল এই দুর্গটি। সুড়ঙ্গ পথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সঙ্গে এই দুর্গের সংযোগ ছিল বলে একটি জনশ্রুতি আছে। উঁচু প্রাচীর ঘেরা এই দুর্গের চারকোণে রয়েছে একটি করে গোলাকার বেস্টনি। দুর্গের ভেতর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপ করার জন্য চারদিকের দেয়ালের গায়ে রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। বাংলাদেশে মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নির্দশন হিসেবে ইদ্রাকপুর দুর্গটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয় ১৯০৯ সালে।

রামপাল দীঘি

জেলার রামপালে অবস্থিত। বিক্রমপুরের রাজধানী রামপালের রাজা বল্লাল সেন জনগণের পানীয় কষ্ট দূর করার জন্য এই বিশাল দীঘিটি খনন করেন। কিংবদন্তি আছে, বল্লাল সেনের মা প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে তাঁকে একটি দীঘি খনন করার আদেশ দেন। বল্লাল সেন মাকে আশ্বাস দেন, তিনি (মা) যতদূর হেঁটে যেতে পারবেন ততটুকু জায়গা নিয়ে দীঘি খনন করে দিবেন। পরের দিন সকালে তার মা দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করেন। বল্লাল সেন দেখলেন তাঁর মা অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে চলে গেছেন। তখন তাঁর অসুস্থতার সংবাদ পাঠালে তিনি ফিরে আসেন। সেদিন বল্লাল সেনের মা যতদূর পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন ততটুকু দীর্ঘ দীঘি খনন করেন বল্লাল সেন।

বল্লাল সেনের বাড়ি

রামপাল দীঘির উত্তর পাশে ছিল বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ ও একটি পরিখা। বর্তমানে পরিখার চিহ্ন থাকলেও রাজপ্রাসাদটি ধ্বংস হয়ে গেছে।

বাবা আদম শহীদ মসজিদ

জেলার রামপালের রেকাবি বাজার ইউনিয়নের কাজী কসবা গ্রামে অবস্থিত বাবা আদম শহীদ মসজিদ। এর কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উপরের একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, সুলতান ফতেহ শাহের শাসনামলে, ১৪৮৩ সালে মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির বাইরের দিকের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১০.৩৫ মিটার ও ৩.৭৫ মিটার। এর দেয়াল প্রায় ২ মিটার পুরু। মসজিদের উপরে দুই সারিতে ছয়টি গম্বুজ আছে। মসজিদের পাশেই আছে বাবা আদমের সমাধি। জনশ্রুতি আছে, বল্লাল সেনের রাজত্বকালে বাবা আদম নামে একজন ব্যক্তি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসেন। বল্লাল সেনের নির্দেশে বাবা আদমকে হত্যা করা হলে তাঁকে এখানে সমাহিত করা হয়।

মীরকাদিম পুল

মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মীরকাদিম খালের ওপর নির্মিত মুঘল আমলের পুল। প্রায় ৫২.৪২ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ পুলটি বেশ কয়েকবার সংস্কারের ফলে এর পুরনো রূপ এখন আর নেই। চুন-সুরকিতে তৈরি এ পুলটির সঠিক নির্মাণকাল জানা যায়নি। এলাকায় এটি পানামের পুল নামে পরিচিত। সোনারগাঁয়ের পানামের পুলের সঙ্গে এই পুলটির গঠনগত মিল রয়েছে।

অতীশ দীপঙ্কর স্মৃতিস্তম্ভ

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী অতীশ দীপঙ্কর ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে মুন্সীগঞ্জ জেলার তথা বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার স্মৃতিকে চিরঞ্জীব করে রাখার জন্য বজ্রযোগিনী গ্রামে তাঁর জন্মভিটায় চীন সরকারের সহায়তায় স্থাপিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। সে সময় প্রখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত অবধূত জেতারির কাছ থেকে ব্যাকরণ ও অংক শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। চীন সম্রাট দীপঙ্করের পা-িত্য ও বিজ্ঞতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অতীশ শ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর রচিত বহু মূল্যবান গ্রন্থ ইতালির টুচি ও প-িত হরপ্রসাদ আবিষ্কার করেন। মুন্সীগঞ্জ শহর থেকে বজ্রযোগিনীর দূরত্ব ৪-৫ কিলোমিটার। বজ্রযোগিনী গ্রামের রাস্তায় প্রচুর চালতা গাছের দেখা পেলাম।

বেড়াতে বেড়াতে মনটা কিছু সময়ের জন্য অতীতের সুবর্ণময় দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিল। শেষ বিকেলে চমৎকার একটা অনুভূতি নিয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরে ফিরে এলাম।