১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ম্যাডাম জিয়া, আমনে আর কয়ডা লাশ চান

  • অবরোধে আগুনে নিহত মানুষগুলোর স্বজনদের প্রশ্ন

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল থেকে ॥ “দয়া করে মোর ভাইয়ের মতো আর কোন ভাইরে পোড়াইয়া মাইরেন না। মোরা নিরীহ দিনমজুর, প্যাডের দায়ে রাস্তায় কাম কইরা খাইতে হয়। পেট্রোলের পোড়া সে কি যে যন্ত্রণা, তা আমনেরা এসিরুমে বইয়া বোঝতে পারবেন না। ক্ষমতার লোভে আন্দোলনের নামে মোগো লাহান নিরীহ দিনমজুরদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার নির্মমতা বন্ধ করুন। আর নয় ম্যাডাম খালেদা জিয়া আপনি জাতির সামনে বলুন, আমনে আর কয়ডা লাশ হইলে এ নির্মমতা বন্ধ করবেন।”

আবেগ আপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের সামনে কথাগুলো বলছিলেন অবরোধকারীদের ছোড়া পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাংতা গ্রামের আবুল কালাম আজাদের (৩০) ভাই মোঃ ইব্রাহীম হাওলাদার। আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় আবুল কালামের বৃদ্ধ মা সুফিয়া বেগম। অগ্নিদগ্ধ হয়ে আবুল কালাম আজাদের অকালমৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রবিবার (১৮ জানুয়ারি) ভোরে উজিরপুরের সানুহার নামক এলাকায় পিকেটারদের ছোড়া পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে নিহত ট্রাক হেলপার সোহাগ হাওলাদারের (১৯) করুণ মৃত্যুর বিষয়টিও মেনে নিতে পারছেন না এলাকার সচেতন মহল। পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার রাজনীতি চিরতরে বন্ধ করার জন্য এলাকাবাসী সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার অনুরোধ করেন।

সূত্র মতে, গত ৯ জানুয়ারি রাজধানীর মগবাজারের আগোরা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে রাত সোয়া এগারোটার দিকে অবরোধকারীদের ছোড়া পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হন প্রাইভেটকার চালক রাংতা গ্রামের মৃত আব্দুল হক হাওলাদারের ছোট পুত্র আবুল কালাম আজাদ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে সাতদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ১৫ জানুয়ারি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন আবুল কালাম।

অপরদিকে পিতৃহীন পরিবার ও দৃষ্টিহীন মায়ের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সোহাগ হাওলাদার অভাবী সংসারের হাল ধরতে সম্প্রতি ভাইবোন পরিবহনের (ফরিদপুর ট-১১-০১৮৯) ট্রাকে হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অন্যান্য দিনের ন্যায় রবিবার (১৮ জানুয়ারি) ভোরে ফরিদপুর থেকে বরিশাল নগরীতে কাঁচামাল নামিয়ে দিয়ে ফের ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ট্রাকটি ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে জেলার উজিরপুর উপজেলার সানুহারের নিরবচ্ছিন্ন এলাকা অতিক্রমকালে অবরোধকারীরা ট্রাককে লক্ষ্য করে পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারে। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় ট্রাকের হেলপার সোহাগ। চালক রিপন শেখ হন গুরুতর আহত। খবর পেয়ে থানা পুলিশসহ স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে সোহাগের পুড়ে অঙ্গার হওয়া নিথর দেহ দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অভিশাপ দেন অবরোধের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যাকারীদের। নিহত সোহাগের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা গ্রামে। সে ওই গ্রামের মৃত সাগর হাওলাদারের পুত্র। একই এলাকার মীরের গ্রামের আব্দুল লতিফ শেখের পুত্র অগ্নিদগ্ধ ট্রাক চালক রিপন শেখকে (২৯) মুমূর্ষু অবস্থায় ফরিদপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

উজিরপুর মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলাম-পিপিএম জানান, উল্লেখিত ঘটনায় রবিবার রাতে থানার এসআই মোঃ সহিদুর রহমান বাদী হয়ে ৫০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। একই দিন (রবিবার) সন্ধ্যায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে পৌর বিএনপির যুগ্মসম্পাদক শহীদুল ইসলাম শাহীন, পৌর যুবদলের সভাপতি শফিকুল ইসলাম খান, বামরাইল ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিম রাঢ়ী ও একই ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা সেলিম মৃধাকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করেছেন। সোমবার দুপুরে গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। ওসি আরও জানান, অন্যান্য আসামিকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।