১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিডিএফ আয়োজনের প্রস্তাব দাতাদের

  • অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে তারিখ নির্ধারণের তাগিদ, ভেবে দেখছে সরকার

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ অবশেষে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকের (বিডিএফ) প্রস্তাব দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। সম্প্রতি এক্সকম গ্রুপের (উন্নয়ন সহযোগীদের জোট) চেয়ার ইউএসএইডের ইয়ানিনা জেরুজালেসকি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে এ বৈঠক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহের যে কোন দিন নির্ধারণ করলে এতে দাতা সংস্থা ও দেশগুলোর উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সমস্যা হবে না।

এ বিষয়ে ইআরডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, দাতাদের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে অক্টোবরে বিডিএফ আয়োজন সম্ভব হবে কিনা সেটি এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। কেননা আমাদের প্রধানমন্ত্রী তখন সময় দিতে পারবেন কিনা সেটি একটি বিষয়। তাছাড়া এর সঙ্গে যুক্ত আরও অন্যান্য বিষয়গুলো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, পরপর কয়েকবার প্রস্তুতি নিয়েও পদ্মাসেতু নিয়ে টানাপোড়েন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও জাতীয় নির্বাচন এ তিন ইস্যুতেই এতদিন আটকে ছিল দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠক। সর্বশেষ আবারও যুক্ত হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা ইস্যু। ফলে চলতি এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে এ বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে প্রস্তুতি গুটিয়ে এনেও শেষ পর্যন্ত এ বৈঠক স্থগিত করা হয়েছিল। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলছে, সর্বশেষ সময় স্বল্পতার কারণে উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এ সময়ের মধ্যে তাদের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অবশ্যই বৈঠকটি করা সম্ভব হবে।

বৈঠক স্থগিত বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী শফিকুল আজম জনকণ্ঠকে বলেন, তাড়াহুড়ো না করে একটু সময় নিয়ে ভালভাবে করার জন্য এমনটি সর্বশেষ বিডিএফ স্থগিত করা হয়েছিল বলে শুনেছিলাম। আশা করছি এ বছরই বিডিএফ অনুষ্ঠিত হবে।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ২০১০ সালের ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিডিএফের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর ২০১১ সালের ২ ও ৩ নবেম্বর বিডিএফ বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করার পরও শেষ পর্যন্ত দাতাদের কারণেই এটি বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সালেও এ বৈঠক হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল।

দীর্ঘ চার বছর ঝুলে থাকার পর ঋণদাতাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠক চলতি এপ্রিল মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠানের সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এ বিষয়ে দাতাদের সমন্বিত সংস্থা লোকাল কন্সালটেটিভ গ্রুপের (এলসিজি) ডিপি এক্সকম গ্রুপের সঙ্গে প্রস্তুতি সভাও করেছিল সংস্থাটি। বৈঠকে অংশ নেন এক্সকম গ্রুপের অন্য সদস্য বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাজুহিকো হিগুচি, ডিএফআইডির সারাহ কোকি (এক্সকমের ভাইস-চেয়ার), কইকার কিম বুক হি, এসডিসি এর ডেরেক মুলার এবং ইউনাইটেড নেশন্স-এর ক্রিস্টা রাডার। সাধারণত এ গ্রুপটিই পুরো দাতাদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। তাই ওই বৈঠকে প্রাথমিক সম্মতি পাওয়ার পর বিডিএফ বিষয়ে জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। বিডিএফ বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া তৈরির কাজও জোরেশোরেই শুরু হয়। এছাড়া বৈঠকে এজেন্ডাও চূড়ান্ত করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু সম্প্রতি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, বর্তমান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে এ বৈঠকটি স্থগিত করা হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, এপ্রিল মাসেই এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলে ভাল হতো। কেননা বর্তমানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। এ সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন। আগামী ৫ বছরের জন্য তৈরি হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ এ আর্থিক পরিকল্পনায় তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। এটি এক ধরনের ভাল সুযোগ ছিল বলা যায়। কিন্তু তারা সেটি হাতছাড়া করেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে নিযুক্ত লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠক বলেন, এ ধরনের বৈঠক হলে সব উন্নয়ন সহযোগীরা এক টেবিলে বসে সরকারের আর্থিক কৌশল, উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয় জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী কোন দাতা সংস্থা বা দেশ কোন খাতে সহযোগিতা দেবে সে সব বিষয়ে একটি কমিটমেন্ট পাওয়া যায়। ফলে সহযোগিতার ক্ষেত্রে ডুপ্লিকেশন হয় না। এক্ষেত্রে সরকারও জানতে পারে কোথায় কি ধরনের সহায়তা পাওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বোধ হয় বড় কারণ নয়, কেননা কয়েকদিন আগেই আমাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেছেন। সেখানে তো সমস্যা হয়নি। এটি স্থগিতের কারণ হচ্ছে, বিডিএফ তো আর প্রতি মাসে হয় না, তাই আমরা এবং সরকার চায় দাতাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং দাতাদেশগুলো মন্ত্রী পর্যায়ের অংশগ্রহণ। কিন্তু এত কম সময়ে তা সম্ভব নয়। আর একটি কারণ হচ্ছে এজেন্ডা তৈরির ক্ষেত্রে মূল টেকনিক্যাল বিষয় হচ্ছে এবারের জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এপ্রিলের মধ্যে সেই ডকুমেন্ট প্রস্তুত করা সম্ভব হবে কি-না সে বিষয়েও একটা সংশয় রয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরতো বিডিএফ হয়নি, কিন্তু বৈদেশিক সহায়তাতো কমেনি।

ইআরডি সূত্র জানায়, এর আগে প্যারিসে বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এখন থেকে প্যারিসে নয় উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ঢাকায়। সে হিসেবে ২০০৩ এবং ২০০৪ সালে ঢাকাতেই বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরোমের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর আর বৈঠক হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সময়ে এ ফোরামের বৈঠক অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সরকারের জনভিত্তি না থাকায় উন্নয়ন সহযোগীরা বিডিএফ বৈঠকে বসার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। এরপর দীর্ঘ ৫ বছর পর ২০১০ সালে এসে বর্তমান সরকার আগের মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত হয় সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ১৪ জুন অনুষ্ঠিত লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপের (এলসিজি) বৈঠক হয়। বৈঠকে দাতা সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিডিএফ বৈঠকের প্রস্তাব করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর দাতারা একমত হয়ে সম্মতিও দিয়েছিল। দাতারা বলেছিল, তারা কেন্দ্রীয় অফিসের সঙ্গে কথা বলে এ বৈঠক অনুষ্ঠান করার বিষয়ে ইআরডিকে শীঘ্রই জানাবে। সে মোতাবেক ওই বছরের নবেম্বর অথবা গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিডিএফ বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছিল ইআরডি। কিন্তু এরপর দাতারা আর কিছু জানায়নি। প্রথমদিকে পদ্মাসেতু নিয়ে টানাপোড়েন ও পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতীয় নির্বাচনের কারণে এ বৈঠক পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।