২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৈশাখে অর্থনীতির সুবাতাস

  • আরিফুর সবুজ

বড় বড় টালি খাতার মাঝে ডুবে আছেন ছলিম সাহেব। চশমার ফাঁক দিয়ে বেশ মনোযোগের সঙ্গেই দেনা-পাওনার হিসেব কষছেন তিনি। চালের আড়তে সারা বছর বেচা-কেনা শেষে কার কাছে কত টাকা তিনি পাবেন, কার কাছে কত দেনা আছেন, সে হিসেব মিলাতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। সামনে পহেলা বৈশাখ। তাই তার হিসেব মিলানোর এত ব্যস্ততা। কারণ হালখাতা। প্রতিবছরই করেন। তবে এবারের হালখাতা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে ছলিম সাহেব খুব একটা লাভবান হবেন, এমনটি নয়। হবেনই বা কীভাবে? টানা তিন মাসের হরতাল-অবরোধে বেচা-বিক্রি, লেনদেন তেমন হয়নি।

দৃশ্যপট-২

স্বপন ম-লের মুখে বেজায় হাসি। তার মিষ্টির দোকানে বিগত তিনটি মাস তেমন বেচা-বিক্রি না হলেও হালখাতা উপলক্ষে তার দোকানে উপচে পড়া ভিড়। খরিদ্দারের আগাম বুকিং চলছে। কর্মচারীরা খরিদ্দারদের চাহিদামত মিষ্টি, নিমকি প্যাকেট করছে। আর স্বপন বাবু কাউন্টারে বসে টাকা গুনছেন। ভুলে গেছেন বিগত তিন মাসের যন্ত্রণার কথা। এই তিন মাস কর্মচারীদের বসিয়ে বসিয়ে টাকা দিচ্ছিলেন আর আফসোস নিয়ে দিন গুজরান করেছেন। পহেলা বৈশাখ তার সেই দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। তবু গত বছরের তুলনায় এ বছর মিষ্টি বিক্রির পরিমাণ কম। ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা নেই। বেশি মিষ্টি কিনবে কোত্থকে? স্বপন সাহেব নিজের দিকে তাকিয়ে বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারছেন। তারপরও তিনি খুশি তিন মাসের অচল অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ায়। স্বপন ম-লের মতো দেশের সব মিষ্টি ব্যবসায়ীর এখন হাসিখুশি মুখ, তা বুঝতে কারও বেগ পেতে হয় না।

দৃশ্যপট-৩

মৃধা হক ফ্যাশন হাউসে উপচে পড়া ভিড়। বৈশাখের কারুকার্যময় শাড়ি, থ্রিপিস কিনতে আসছে ক্রেতারা। শহুরে তরুণীরা যতই আধুনিক ফ্যাশনে গা ভাসাক না কেন, এই একটি দিন পুরোদস্তুর বাঙালি হতেই চায় তারা। এজন্য গ্রামীণ ঐতিহ্যসমৃদ্ধ শাড়ি কেনার চলছে ধুম। মৃধা হক তাই এখন কিছুটা স্বস্তিতে। তিন মাস কী দুঃসহ যন্ত্রণাই না ছিল তার। এখন যে বিক্রি হচ্ছে তাতে ক্ষতি হয়ত পুষিয়ে নেয়া যাবে না, তবু দীর্ঘ অচলাবস্থা থেকে মুক্তি মিলছে এই ভাবনাই মৃধা হকের স্বস্তি এনে দিচ্ছে। প্রতিবছর মৃধা হকের ফ্যাশন হাউসে বৈশাখ উপলক্ষে বেচাকেনার ধুম লেগে যায়। ব্লক, বাটিক ও হাতের কাজের শাড়ি তৈরির জন্য অনেক নারী কর্মী নিয়োগ দিতে হয় তাকে। এ বছর বেশি শ্রমিক নিয়োগ দেবে কিনা, তা নিয়ে বেশ দুঃশ্চিন্তাতেই ছিলেন। যদি হরতাল-অবরোধ চলে, যদি দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলে তার ব্যবসায় জ্বলবে লালবাতি। তবু ঝুঁকি নিয়ে তিনি বেশ কয়েকজন ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ দিলেন অন্যবারের মতো। এখন দেখছেন, ঝুঁকি নিয়ে ভুল করেননি। দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা মন্দা গেলেও বৈশাখ বলে কথা। বৈশাখী জামাকাপড় কিনতে কেউই কার্পণ্য করছেন না। বছরে তো একবারই আসে পহেলা বৈশাখ, যেভাবেই হোক না কেন, বৈশাখী পোশাক চাই। এজন্য মৃধা হকের মতো দেশের ফ্যাশন হাউসগুলো তিন মাস পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন বৈশাখের কল্যাণে। শুধু মালিকরাই নন, এর সঙ্গে জড়িত সবারই মুখে হাসি ফুটছে। বৈশাখে প্রতিবছর প্রায় আটশ থেকে একহাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি করে ফ্যাশন হাউসগুলো। তবে এবার সার্বিক অর্থনৈতিক মন্থর গতির কারণে এরকম বিক্রি করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে একটু সন্দিহান ফ্যাশন হাউসগুলো।

দৃশ্যপট-৪

ছবির মিয়া দু’হাতে কাঠের পুতুল বানাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে বউ, ছেলেমেয়েরাও লেগে গেছে পুতুল বানানোর কাজে। দিনরাত ছবির মিয়া পুতুল বানাচ্ছেন। পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করেই ছবির মিয়ার পরিবারের দিনরাত পরিশ্রম করে যাওয়া। করবেই বা না কেন। সারাবছর তেমন বিক্রিবাট্টা না হলেও এই সময়টাতে বেশ হয়। ছবির মিয়ার মতো আরও কয়েকটি পরিবার পুতুলসহ বাঁশ-বেত, সোলা ও মাটির সামগ্রী তৈরি করছে বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে। বৈশাখ মানেই গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া। সাজগোজের সামগ্রী থেকে শুরু করে মুড়ি, মুড়কি, মিঠাইসহ নানা খাবার সামগ্রীর বিক্রি চলছে হরদমে। ছবির মিয়ার মতো গ্রামের মানুষের মুখে তাই হাসি। বৈশাখ উপলক্ষে তাই গ্রামীণ কুটির ও হস্ত শিল্পকর্মীরা তাই পার করছে বেশ ব্যস্ত সময়। তাদের তৈরি পণ্য শহরে বিক্রির জন্য চলে যাচ্ছে। সারা বছর তেমন একটা বিক্রি না হলেও এখন বেশ বিক্রি হচ্ছে। হাসি ফুটছে মুখে। বৈশাখ উপলক্ষে যে গ্রামীণ মেলার আয়োজন হবে সে মেলা তাদের মুখের হাসিকে আরও প্রসারিত করবে, এমন আশায় পসরা সাজানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা।

দৃশ্যপট-৫

জমিরউদ্দীনের মুখে তৃপ্তির হাসি। কতদিন ধরে তার মুখে হাসি ছিল না। হরতাল-অবরোধে ঢাকায় মাছ আনতে না পারায় মাছি মারা ছাড়া আর কোন কাজই ছিল না। সংসার চালানো বেশ দায় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পহেলা বৈশাখ তার অবস্থা বদলে দিয়েছে। গতকালই সে আয় করেছে ত্রিশ হাজার টাকা। বাজারে ইলিশের চাহিদা। যে দামই হাঁকাচ্ছে ক্রেতারা কিনে নিচ্ছে মাছ। পান্তা-ইলিশ ছাড়া এখন বাঙালী বৈশাখ কল্পনাই করতে পারে না। ইলিশের চাহিদা তাই বেড়ে গেছে শতগুণ। দুর্লভ হয়ে পড়েছে মাছ। ক্রেতারা হন্যে হয়ে খুঁজেও মাছ পাচ্ছেন না। এ সুযোগে জমিরউদ্দীনের মতো প্রায় সব মাছ ব্যবসায়ীই বেশ দাঁও মারছেন এখন। এক কেজির এক একটি ইলিশ বিক্রি করছেন চার পাঁচ হাজার টাকা। টানা তিন মাস তাদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, তাই যেন উসুল করে নিচ্ছেন ক্রেতাদের গলা কেটে। কাঁচা বাজারেই শুধু ইলিশের ব্যবসায় চলছে না, অনলাইনেও চলছে এই ব্যবসায়। দুষ্প্রাপ্যতার সুযোগে সবাই ক্রেতাদের থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

দৃশ্যপট-৬

জাফর সাহেবের প্রেসে সারাক্ষণই ঘটাং ঘটাং শব্দ চলছে। শুভেচ্ছা কার্ড আর ক্যালেন্ডারের অনেকগুলো অর্ডার আছে। আর তাই প্রেসে এতো ব্যস্ততা। অবশ্য আগের তুলনায় এ ব্যস্ততা তেমন কিছ্ইু নয়। আগে শুভেচ্ছা কার্ডের বেশ চল থাকলেও এখন মোবাইল এসএমএস, ই-মেইল, ফেসবুকের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়ে দিচ্ছে। ফলে আগে বৈশাখ আসা মানেই শুভেচ্ছা কার্ড ও ক্যালেন্ডার প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ীদের যে রমরমা ব্যবসায় হতো, এখন তা নেই। তবু কেউ কেউ ঐতিহ্য ধরে রেখে কার্ড, ক্যালেন্ডার পাঠায়। ফলে এখনও আগের মতো না হলেও বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বেশি ছাপা হচ্ছে। বিগত তিন মাসের হরতাল অবরোধে জাফর সাহেবের প্রেসের চাকা প্রায় বন্ধই ছিল বলা যায়। এখন বৈশাখ উপলক্ষে কিছু অর্ডার পেয়ে চাকা ঘুরছে, এতেই খুশি জাফর সাহেবের মতো অন্যসব প্রেসব্যবসায়ী ও এই সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা।

দৃশ্যপট-৭

ফখরুদ্দীন সাহেবের ইলেকট্রনিক্সের দোকানে ছাড় চলছে। বৈশাখী ছাড়। ক্রেতারাও এজন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কিছু ছাড় দেয়ায় যে ফখরুদ্দীন সাহেবের লোকসান হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বেশ মুনাফা পাচ্ছেন তিনি। ফখরুদ্দীন সাহেবের মতো দেশের অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে চলছে বৈশাখী ছাড়। এতে বিক্রি বেড়ে গেছে বহুগুণ, সেই সঙ্গে মুনাফাও। তিন মাসে বেঁচা বিক্রি না থাকায় তাদের মাঝে যে হতাশার ছায়া নেমে এসেছিল, তা দূর হয়ে গেছে। বৈশাখ নিয়ে এসেছে তাদের জন্য আনন্দবার্তা।

বৈশাখের জন্য হকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যেসব জায়গায় মেলা বসে সেখানে স্টল সাজানো হচ্ছে। ঐ দিনটিতে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিক দিনের থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ আয় করতে সক্ষম হবেন, এই আশাই করছেন। এমনটা অতীতেও তারা করতে পেরেছেন। ঐদিন ঢাকাসহ সারাদেশেই মোড়ে মোড়ে বসবে পান্তা-ইলিশ, ফুচকা, চটপটি, মুড়ি, মুড়কি, জুস, ফল থেকে শুরু করে নানারকম খাদ্যসামগ্রী, খেলনা, তৈজসপত্রের দোকান। সিজনাল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থায়ী ব্যবসায়ী সবাই এ দিনটিকে ঘিরে বেশি বিক্রি ও মুনাফার প্রত্যাশা করছেন। রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে সাধারণ ও ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা যেমন এই বৈশাখের দিনটিতে অন্যদিনের চেয়ে বেশি আয় করবেন বলে প্রত্যাশা করছেন, তেমনি বড় বড় ব্যবসায়ীও পহেলা বৈশাখকেই টার্গেট করছেন তিন মাসের অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে। বর্ণিত কয়েকটি দৃশ্যপটই সাক্ষ্য দিচ্ছে এবারের হালখাতা এবং বৈশাখী উৎসব এসেছে ভিন্নভাবে। অর্থনীতিতে মোটামুটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। ব্যবসা ক্ষেত্রের হঠাৎ সুবাতাস জাতীয় অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলবে, এমনটাই আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

arspatuary@gmail.com