২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নাগরিক বিনোদনে সিনেপ্লেক্স

  • রেজাউল করিম

এক সময়ে নাগিরক বিনোদনে সিনেমাই ছিল প্রধান অবলম্বন। সিনেমা হলগুলো ছিল সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। তখনও এ দেশে টেলিভিশনের প্রচলন হয়নি। সিনেমা হলে গিয়ে লাইন ধরে টিকিট কিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে সিনেমা দেখাটা ছিল রুটিনমাফিক কাজ। অনেক পরিবারে সিনেমা দেখার জন্য প্রতিমাসে আলাদা বাজেট বরাদ্দ থাকত। কাক্সিক্ষত সিনেমাটি সিনেমা হলে মুক্তি পেলে দল বেঁধে পরিবারের সবাইকে নিয়ে যেতেন কর্তা কিংবা গিন্নি। অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশে পরিবারের সবাই মিলে সিনেমা উপভোগ করতেন। প্রিয় নায়ক-নায়িকার সিনেমাটি দেখতে বসে দর্শক হারিয়ে যেতেন অন্য এক ভুবনে। আবিষ্ট হয়ে উপভোগ করতেন পুরো সিনেমাটি। সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরার পরেও আনন্দের রেশ কাটত না। অনেকেই গুন গুন করে গাইতেন সিনেমায় দেখা জনপ্রিয় গানটি। সিনেমার নানা বিষয় নিয়ে বাড়িতে, পাড়ার আড্ডায় চলত আলোচনা-সমালোচনা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ভারতীয় সিনেমা এখানকার প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হতো। উত্তম-সুচিত্রা, দিলীপ কুমার-মধুবালা, রাজকাপুর-নার্গিস, মীনা কুমারী-অশোক কুমার অভিনীত বাংলা হিন্দি সিনেমাগুলো এখানকার দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে দীর্ঘদিন। এরপর আমাদের বাংলা সিনেমা দর্শকদের বিনোদন চাহিদা পূরণের উপায় হয়ে ওঠে। রাজ্জাক-কবরী, শাবানা, আজিম-সুজাতা, সুচন্দা, ববিতা, শবনম, রহমান প্রমুখ তারকাদের সিনেমা দেখার জন্য এখানকার সিনেমা হলগুলোর সামনে দর্শক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সিনেমা দেখার টিকিট সংগ্রহ করতে অনেক আগে থেকে টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়াতে হতো। খুব ভাল সিনেমা হলে তার টিকিট যোগাড় করাটাও ছিল কঠিন কাজ। তখন কয়েকগুণ বেশি দামে কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কিনে সিনেমা দেখে তারপর বাড়ি ফিরেছেনÑ এমন উৎসাহী সিনেমা দর্শকের সংখ্যাও কম ছিল না। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও বাংলাদেশের সিনেমা ব্যবসায় রমরমা ভাবটি বেশ বজায় ছিল। সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ছিল তখনও। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা, রাজশাহী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মফস্বল শহরগুলোতেও সিনেমা হলের সংখ্যা বেড়েছে। কারণ এদেশের মানুষ তখনও সিনেমা দেখাটাকে বিনোদন লাভের প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করতেন। সুস্থ বিনোদনের প্রকাশ ছিল আমাদের বাংলা সিনেমা। সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনা সুখ-দুঃখ প্রেম-বিরহ ভালবাসা ইত্যাদির প্রতিফলন সিনেমা হলের পর্দায় ফুটে উঠত তখন। কিন্তু অশ্লীলতা, রুচিহীনতা, অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের বাংলা সিনেমা যখন থেকে কলুষিত হতে শুরু করে তখন থেকেই সিনেমার দর্শক কমতে শুরু করেছে। দর্শক পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসে সিনেমা দেখতে বিব্রত বোধ করার পর থেকে তারা সিনেমা হলে যাওয়া ছেড়ে দিতে শুরু করে। দর্শক সংখ্যা কমতে শুরু করায় এক সময়ে আমাদের সিনেমা ব্যবসায় চরম ধস নামতে শুরু করে। সিনেমা হলের পরিবেশও ক্রমেই অবনতির চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সিনেমাপ্রেমী দর্শকের অভাবে সিনেমা হলগুলো খাঁ খাঁ করতে থাকে। এভাবেই দর্শকের অভাবে একে একে বন্ধ হয়ে যায় দেশের হাজার হাজার সিনেমা হল।

বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত সিনেমা হলগুলো ভেঙে কিংবা আঙ্গিক পরিবর্তন করে সুপারমার্কেট অথবা শপিংমলে রূপান্তর করা হয়েছে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে। এভাবেই বন্ধ হয়ে গেছে অনেক বিখ্যাত জনপ্রিয় সিনেমা হল। দর্শক বিনোদনের জন্য সিনেমা ছেড়ে টেলিভিশনে বেশি ঝুঁকে পড়ায় আমাদের সিনেমা ব্যবসা আরও বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। বর্তমানে আমাদের বাংলা সিনেমার দৈন্যদশা চলছে। এখানকার বেশিরভাগ সিনেমা দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। দর্শক বিনোদনের জন্য এখন সিনেমা হলমুখী হচ্ছেন না। ফলে শহরের বড় বড় সিনেমা হলগুলো দর্শকশূন্য থাকছে সব সময়ে। তবে সময়ের বিবর্তনে রাজধানী ঢাকা শহরে বিনোদন কেন্দ্রের ধরন ও রূপ বদলেছে। বড় বড় সিনেমা হলের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক দর্শক আসন বিশিষ্ট ছোট আকারের সিনেপ্লেক্স চালু হয়েছে। একই ছাদের নিচে কিংবা একটি নির্দিষ্ট কমপ্লেক্সে একসঙ্গে তিন-চারটি সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠেছে। যেখানে পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে। দর্শক তার রুচি ও পছন্দমাফিক সিনেমাটি উপভোগের জন্য যে কোন একটি সিনেপ্লেক্সে টিকিট কেটে ঢুকে পড়ছে। অপেক্ষাকৃত ছোট আয়তনের হওয়ায় সীমিতসংখ্যক দর্শকের জন্য সিনেমা প্রদর্শিত হচ্ছে প্রতিটি সিনেপ্লেক্সে। চমৎকার ছিমছাম সুন্দর আকর্ষণীয় পরিবেশ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারে মনোমুগ্ধকর সিনেমার প্রদর্শন দর্শকদের জন্য অসাধারণ কিছু বয়ে না আনতে পারলেও বিনোদন লাভের ক্ষেত্রটিকে দারুণভাবে প্রশস্ত করেছে। আজকাল শহরে বেশ কয়েকটি সিনেপ্লেক্স চালু হওয়ার পর থেকে সিনেমা দর্শকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। সিনেপ্লেক্স ধারণাটি আধুনিক মেট্রোপলিটন কসমোপলিটন নাগরিক জীবনে একটি প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লী, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর শহরে প্রচুর সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠেছে গত কয়েক দশকে। সেখানে প্রতি সপ্তাহে বড় বড় সিনেমা হলের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ছোট আয়তনের ছিমছাম পরিবেশের সিনেপ্লেক্সে নতুন ছবি মুক্তি পাচ্ছে। সাধারণত ভদ্র রুচিশীল শিক্ষিত উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দর্শক এবং তরুণ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা সিনেমা উপভোগের জন্য সিনেপ্লেক্সগুলোকে বেছে নিচ্ছেন সেখানে। ফলে এখানকার দর্শকের রুচি ও পছন্দের কথা বিবেচনা করা সিনেপ্লেক্সগুলোতে সিনেমা প্রদর্শনীর আয়েজন করা হয়।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ উন্নত পরিবেশের বেশ কিছু সিনেপ্লেক্স চালু হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে আলাদা দর্শকশ্রেণী গড়ে উঠেছে। সিনেপ্লেক্সগুলোতে ইংরেজী ও বাংলা সিনেমা প্রদর্শিত হয়ে থাকে। নাগরিক জীবনযাপনে সিনেপ্লেক্সগুলোকে কেন্দ্র করে ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক আবহ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শকদের সর্বোচ্চ বিনোদন দেয়ার নানা আয়োজন থাকছে। ডিজিটাল ডলবি সাউন্ড সিস্টেম, থ্রি-ডি থিয়েটার ব্যবস্থা প্রভৃতি সিনেপ্লেক্স কালচারে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করেছে সন্দেহ নেই। যারা একবার সিনেপ্লেক্সে গিয়ে ছবি দেখছেন তাদের রুচি ও পছন্দ বদলে যাচ্ছে। অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল হলেও সাধারণ সিনেমা হলের অনুন্নত পুরনো মান্ধাতার আমলের প্রজেকশন সিস্টেম, ভ্যাপসা অস্বস্তিকর পরিবেশ, অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন আসন, ছাড়পোকার কামড় ইত্যাদির চেয়ে সিনেপ্লেক্সে সিনেমা উপভোগ করাটাকেই বেছে নিচ্ছেন অনেক দর্শক। আরামদায়ক উন্নত পরিবেশে আধুনিক রুচিসম্মত সিনেমা উপভোগের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে সিনেপ্লেক্সগুলো।

বসুন্ধরা সিটিতে ২০০২ সালে স্টার সিনেপ্লেক্স চালুর পর থেকে নাগরিক বিনোদন ভিন্নমাত্রার সূচনা হয়। আরামদায়ক সুপ্রশস্ত আসন, চমৎকার উন্নতমানের সাউন্ড সিস্টেম এবং দর্শকদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য রুচিসম্মত ব্যবস্থা সিনেপ্লেক্সগুলোকে আকর্ষণীয় করেছে সন্দেহ নেই। বর্তমানে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সের পাশাপাশি যমুনা ফিউচার পার্কেও বেশ কয়েকটি সিনেপ্লেক্স চালু হয়েছে। ব্লকবাস্টার সিনেপ্লেক্সগুলোতে চলছে বাংলা ও ইংরেজী ছবির প্রদর্শনী। নাগরিক বিনোদনে সিনেপ্লেক্সের জনপ্রিয় বাড়ায় বলাকার মতো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলটিকে কয়েকটি সিনেপ্লেক্সে রূপান্তরিত করা হয়েছে। শহরের ভদ্র রুচিশীল আধুনিক মনস্ক সিনেমা দর্শক আজকাল প্রায়ই ভিড় করছেন সিনেপ্লেক্সগুলোতে। এখানে টিকিটের দাম কিছুটা বেশি হলেও দর্শক সিনেমা দেখে বেশ মজা পাচ্ছেন। অনন্দময় মজার অনুভূতি নিয়ে সিনেপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে আসছেন। আরামদায়ক পরিবেশ এবং উন্নত প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার সিনেপ্লেক্সে সিনেমা উপভোগের স্বাদটাই পাল্টে দিয়েছে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে। এভাবে শহরে আরও সিনেপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দর্শকদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে।