২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উপন্যাস ॥ যে ফুলে শিশির জমে

  • সেলিনা হোসেন

দিল্লি বিমানবন্দর থেকে আনন্দগ্রামের সংস্কৃতি কেন্দ্রে পৌঁছাতে প্রায় রাত বারোটা হয়ে যায়। ‘উইমেন্স ইনিসিয়েটিভ ফর পিস ইন সাউথ এশিয়া’ শান্তি সংগঠনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শান্তি বিষয়ে সাউথ এশিয়ার দেশগুলোর নারী লেখকদের সম্মেলন। বিমানবন্দরের বাইরে এসে দাঁড়ালে এক ঝলক ঠা-া বাতাস এসে নাকে ঢোকে। যদিও মাসটা এপ্রিল, টি.এস. এলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ড’-এর ক্রুরতম মাস।

বিমানবন্দরে ‘উইপসা’ লেখা কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে ও পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠলে টের পাই ওর মুখভরা শক্ত পানীয়ের গন্ধ। পথে ছেলেটি কোন এক জায়গায় থেকে খানিকটা সময় অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে থাকলে ভয় পাই। আলো-আঁধারী জায়গা, রাত বেড়েছে, গাড়িতে বসে আকাশ দেখতে পাই না। শহরটা আমার একদম অপরিচিত নয়, কয়েকবার এসেছি, তবু এই বেশ রাতের অন্ধকার সময় রহস্যময় করে তোলে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার শীর্ষবন্ধু এই শহরটিকে। আমরা কতিপয় নারী লেখক শান্তির আকাক্সক্ষায় এখানে এসেছি, কিন্তু এই শহর এখন একটি ক্রুরতম মাসের বাতাসে ভরপুর। মাথা ঝিম মেরে যায়। মাতাল ট্যাক্সি-চালক ঠিকঠাক মতো সংস্কৃতি কেন্দ্রের গেটে পৌঁছে দেয়।

গেটে দু’জন দারোয়ান ছিল। তারা আমার স্যুটকেসটা আমার জন্য নির্ধারিত ঘরে পৌঁছে দেয়। একঘরে আমরা তিনজন থাকবো। দরজায় সাঁটা কাগজ থেকে জানতে পারি নেপালের দু’জন প্রতিনিধি এ ঘরে থাকবেন। রাত দু’টো বাজে ঘড়ি দেখে বুঝতে পারি ওরা দরজা বন্ধ করে ঘুমুচ্ছে। মৃদু শব্দ করতেই দরজা খুলে দেখে তোয়ে। ওর সঙ্গে আমার আগেই দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আর একটি সম্মেলনে দেখা হয়েছিলো। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার সঙ্গে আবার আমার দেখা হলো। ভীষণ ভালো লাগছে। এ ভুবন। ভুবন ডুয়াঙ্গা। গল্প লেখে।

বললাম, বাহ বেশ মজা হলো। তোয়ে অর্থ জল, আর ভুবন তো পৃথিবী। তোমাদের পেয়ে আমি ধন্য। তো আমার বিছানা কৈ?

পাশের ছোট ঘরটি তোমার জন্য রেখেছি। তুমি একলা থাক। আমরা দুই নেপালি পাশাপাশি বেডে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে যাবো।

তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে কথা হবে।

আমি পাশের ঘরটিতে ঢুকে জানালায় দাঁড়াই প্রথমে। মাঝখানে ছোট একটি প্রাঙ্গণ। স্বল্প আলোয় অপূর্ব দেখাচ্ছে প্রাঙ্গণের ওপর পড়ে থাকা বড় গাছটির ছায়া। চারপাশে ঘর। মাঝখানে সরু প্যাসেজ। ওই প্যাসেজ দিয়ে এগোলে আনন্দগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের বড় গোল মঞ্চ, তার ওপাশে থাক থাক সিঁড়িতে দর্শকদের বসার জায়গা। মনে হচ্ছে ময়ূর ডাকছে। ঠিক শুনছি তো? জানালার কাচে কুয়াশা জমেছে। কুয়াশা ভেদ করে আমার মুখোমুখি বাড়ির রান্নাঘরে কাজ করতে থাকা কিশোরী মেয়েটিকে ধরে গৃহকর্তাকে চুমু খেতে দেখি। মেয়েটি দু’হাতে বাধা দিতে থাকে। কালো, মোটা, থলথলে ভুঁড়িসর্বস্ব লোকটির সঙ্গে পারবে কেন ওই পুঁচকে মেয়েটি। অসহায় বোধে ও কাঁদতে থাকে। লোকটি ওকে বেশিক্ষণ আটকে রাখে না। দ্রুত চুমু খেয়ে ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখে চোরের মতো পালিয়ে যায়। মেয়েটি দু’হাতে মুখ ঢাকে। আমি ওর কান্নার শব্দ শুনতে পাই না। কিন্তু ওর আন্দোলিত শরীর দেখে বুঝতে পারি যে ও গৃহকর্তা ওকে গ্রাম থেকে এনেছে। ওর এখনো ফ্রক পরে। সালোয়ার কামিজ ওড়না পরার মতো স্বাস্থ্যবতী হয়নি। মাত্র গতকাল দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রের রাজধানী দিল্লিতে আসার আগে এমন একটি দৃশ্য দেখে আমি ক্রোধান্বিত হইনি। প্রতিবাদের কথা ভাবিনি। পুরুষরা এমনই আচরণ করে এমন এক উদাসীন ভাবনায় আমি নিজেকে গুটিয়ে রাখি। মেয়েটির নাম শান্তি। হাসিখুশি থাকে। অভাব কাবু করেনি ওকে। এসব ভেবে আমার সুবিধাবাদী মানসিকতা শেয়ালের মতো গর্তে ঢুকে যায়। এই মুহূর্তে জানালার কাচের ওপর শান্তির কান্নার দৃশ্যটি দেখে আমার মনে হয় এই সংস্কৃতি কেন্দ্রের কোনো ঘরে কেউ না কেউ নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আনন্দগ্রামে চৌহদ্দীর ভেতরে থাকা অসংখ্য ময়ূর-ময়ূরীর সম্মিলিত সঙ্গম।

আমার ঘুম আসে না। আমি তাকিয়ে থাকি জানালার কাচের দিকে। দেখতে পাই জানালার কাচের ওপরে জমে থাকা শিশির সরু হয়ে নিচের দিকে নামছে। যেন সেটা বেইজিংয়ের একটি রাস্তা। আমি এখন চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের এক অদৃশ্য নারী। আমার সামনে হুয়াংÑধুমসে চুরুট টানছে, চুরুটের ধোঁয়ায় কুচকুচে কালো ঠোঁট, ক্ষুদে চোখের দৃষ্টিতে বয়সের ছাপ। আসলে হুয়াং তো বয়সী নারীই। জীবনের তৃষ্ণায় ওর পথচলা ফুরোয়নি। হুয়াং চুরুটের ধোঁয়ায় জমাট করে রাখে নিজের অতীত। ওর মুখের চামডায় ভাঁজ। বলছে, প্রথমবার ধর্ষণের শিকার হই একুশ বছর বয়সে। বেইজিং থেকে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পথে ট্রাকের ওপরে। খবর আসে মায়ের অসুখের। বাঁচবে কি বাঁচবে না ঠিক নাই ওষুধ দরকার। ওষুধ কেনার পয়সা নেই আমার। ভাবলাম, এ সময়ে মায়ের কাছে গিয়ে থাকা দরকার। আমাকে দেখলে মা খুশি হবে। আমার গায়ের খুব পরিচিত কাছের মানুষ ছিল ট্রাক ড্রাইভার। ওকে অনুরোধ করলে ও বিনে পয়সায় আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি হয়। কিন্তু আমি বুঝিনি ও আমাকে নিয়ে উৎসব করবে বলে বন্ধুদের বলে রেখেছে। গাঁয়ে ফেরার পথে বেশ মৌজ করবে ওরা। আমি আলু বোঝাই ট্রাকের এক কোণায় জায়গা করে নেই। সারা রাত ঘুমিয়ে যেন বাড়ি পৌঁছাতে পারি এভাবেই জায়গা করেছিলাম। ট্রাক ড্রাইভার কুতকুতে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বেশ বানিয়েছো বিছানাটা। আলুর মধ্যে এমন বিছানা হয় আমরা তো ভাবতেই পারি না। চলো শুয়ে পড়ি।’ ওর কথা শুনে আমি বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকি। ও এমন একটি প্রস্তাব দিতে পারে তা ভাবতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। পরক্ষণে বুঝলাম, আমার গাঁয়ের লোক বলে ওকে আমি নির্ভর করেছিলাম, আসলে ওতো পুরুষ। মেয়ে দেখলে হামলে পড়বে। কিন্তু যখন দেখলাম ও একা নয়, আমাকে নিয়ে ফুর্তি করবে বলে ও বন্ধুদের ডেকে এনেছে, তখন আমার সামনে এক ছমছমে ভৌতিক পরিবেশ ঘনিয়ে ওঠে, আমি চিৎকার করার জন্য হা করতেই ওর চারটা রুমাল দিয়ে আমার মুখ বেঁধে দেয়। দেখলাম, চারজনের পকেট থেকে বের হলো চারটা রুমাল। রুমালগুলো নতুন, ভাঁজও ভাঙেনি। ওরা তৈরি হয়েই এসেছিলো। সব শেষ হয়ে গেলে ড্রাইভার আমাকে বললো ‘আমরা এখন রওনা করবো। তুমি পোশাক পরে নাও।’ ও একে একে রুমালগুলো খুলে দিলো। বললাম, ‘রুমাল কিনতে পারলে তো কনডম কিনতে পারলে না?’ ও হাসতে হাসতে বলে ‘তুমি একটুও ভেবো না। পেট বাধলে আমাদের জানিও। ছেলে বিয়োবে কিন্তু। আমরা চারজনই ওই ছেলের বাপ হবো।’ আমি ওদের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিলাম। ওরা আমাকে আর কিছু বলেনি। ওই নোংরা বিছানায় শুয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙলে দেখি আমি মায়ের কাছে পৌঁছে গেছি।

দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হই যাকে আমি ভালোবাসতাম তার হাতে। যেদিন আমরা দু’জনে খোলা আকাশের নিচে পার্কের ঘাসের ওপর শারীরিক আনন্দ উপভোগ করি, তার পরদিন থেকে ও উধাও হয়ে যায়। আমি দ্বিতীয়বারে জন্য ওকে আর দেখিনি। আমার বয়স এখন পঁয়ষট্টি। আমি মনে করি আমি বেশ আছি। আমার সংসার নেই, আমি মা হতে পারিনি। তাতে কিছু আসে যায় না। মা হওয়া আমি খুব জরুরি মনে করি না। বেশতো আছি, হা-হা করে হাসতে থাকে হুয়ান। হাসতে হাসতে চুরুটটা দূরে ছুড়ে ফেলে। ভলান্টিয়ারদের কেউ ওটা কুড়িয়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে। আমি হুয়ানকে বিশ্ব নারী সম্মেলনের লোগোর মতো দেখি- ওর বুকে পিঠে সম্মেলনের সেøাগানটি আটকে আছে সমতা, উন্নয়ন শান্তি ইত্যাদি। ওর সঙ্গে আমিও হা-হা করে হাসতে থাকি। আমাকে হাসতে দেখে ও চুপ করে যায়। আমি ওকে তর্জনি নাচিয়ে বলি, তুমি এই সম্মেলনের লোগোর শান্তির পায়রা। পায়রার শরীরের সঙ্গে নারী চিহ্নটি মিশে গেছে। আর পায়রার লেজটাকে বানানো হয়ে সমতার আদলে, গাণিতিক চিহ্নে আছে সাম্যের রেখা। হুয়ান তুমিই শান্তি, আমি আমার তর্জনি আরও প্রবলভাবে ওর মুখের ওপর নাড়তে থাকি।

শান্তি কি? হুয়ান আমাকে প্রশ্ন করে এবং উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলে, আমার অভিজ্ঞতা আমাকে স্পষ্ট করে দেয়। আমি কোনো পুরুষের সঙ্গে জড়িয়ে আমার জীবন আর যাপন করতে চাইনি। আমি ভালো আছি। যা আয় করি তা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন চলে যায়। দিনগুলো যেন সোনার চামচ, চড়ুইয়ের মতো ফুড়ুৎ। সবচেয়ে আনন্দের কি জানো? সমকামীর যৌনসুখে এখন আমি হোয়াংহো নদী আমাকে ঠেকায় কে? হুয়ান কোমর দুলিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। আমার চোখের সামনে পুরো বিশ্ব হুয়াংয়ের মুখ এক নতুন মানচিত্র। নারী অধিকারের লড়াই সে মানচিত্রের হোয়াংহো নদী। আমার শরীর শিউরে ওঠে। আশ্চর্য আমার ভেতরেও সমকামের শিহরণ কখনো অনুভূত হয়। কিন্তু না, আমি সমকামের পথে যাওয়ার মতো সাহসী হতে পারি না। আমার শান্তির ধারণা অনেক বড়। আমার সামনে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ১৯৭৪ এখন। আমেরিকা গমের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বলে ভীষণ দুর্ভিক্ষ। গরিবের ঘরে ঘরে হাহাকার। ইন্দিরা গান্ধী পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের আয়োজন শেষ করেছে। বাংলাদেশের রাস্তায় রাস্তায় ফুলকলিদের শরীর বিক্রির হিড়িক। আমার ঘুম পায় না। আমি আনন্দগ্রামের পুরো আকাশটা দেখবো বলে দরজা খুলে বাইরে আসি।

পরদিন সন্ধ্যায় জমে ওঠে উইপসার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। খোলা মঞ্চ। মঞ্চের সামনে অনেক প্রদীপ রাখা হয়েছে। সাতটি দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিরা ওই প্রদীপগুলো প্রজ্বলিত করবে। জ্বলে উঠবে আলো, তেলের মধ্যে ডুবে থাকা সলতে, একটুখানি মাথা উঁচিয়ে রেখে মৃদু আলো ছড়াবে। আমরা সিঁড়ির ওপর বসে আছিÑ আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নারী লেখকরা, আমরা এখানে জড়ো হয়েছি শান্তির পক্ষে কথা বলার জন্য। আমাদের বলতে হবে নারী ও শান্তির যোগসূত্রের কথা জীবনের জন্য কতটা অপরিহার্য তা খতিয়ে দেখা। ভেসে আসে রাণী জেঠমালানির কণ্ঠ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন। সংস্কৃতি কেন্দ্রের আকাশের দিকে উড়ে যায়। বুলেটের মতো শব্দ, নাকি কারগিল সীমান্তে গোলাগুলির শব্দে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে নারীদের আটপৌরে জীবনের দেয়ালগুলো। টেলিভিশনের ক্যামেরা তুলে আনে যুদ্ধের নানা চিত্র। নেপথ্যে আড়াল হয়ে থাকে বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন স্বজন হারানো শেকার্ত নারীরা। গভীর বেদনা নিয়ে কয়েকজন নারী এগিয়ে আসেন সেই সব নারীদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য। যিনি কোনদিন কবিতা লেখেননি, পাঞ্জাবি ভাষায়তো নয়ই, তিনি লেখেন আসমান হায় সাদি শানজিহি সীমা- স্কাই ইজ আওয়ার কমন বাউন্ডারি। এমন গভীর প্রত্যয় থেকে জন্ম নেয় উইমেনস ইনিসিয়েটিভ ফর পিস ইন সাউথ এশিয়া। ছুটে যায় শান্তির বাস দিল্লি থেকে লাহোরে। আমার মনে হয় সেই বাসের চাকার নিচে পিষ্ট হয় সেই দানব যে শান্তির প্রতীক মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী। গান্ধী স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে সেই সব মহিলারা পরস্পরের হাত ধরে শান্তির পক্ষে কাজ করার শপথ নিচ্ছে। তখন গোধূলি আলোর ম্লান ছাড়া বিছিয়ে আছে চারদিকে, নারীদের হাতে মোমবাতি ও ফুল- এক স্বর্গীয় দৃশ্য যেন। আলো শেষে অন্ধকার নামে। আমি ঢাকায় উর্বশী বুটালিয়ানকে দেখতে পাই, তার লম্বা চুলের গোছার মতো অন্ধকার নামে। সম্পাদনা করেছে বই। ‘স্পিকিং পিস : উইমেনস ভয়েসেস ফ্রম কাশ্মীর।’ আমি উর্বশীর সম্পাদিত বইটি কিনি। উর্বশীর প্রকাশিত বই প্রথমবার কিনেছিলাম ’৯৫ সালে দিল্লি বই মেলা থেকে। একটি বইয়ে শান্তির কথা লিখলে কি শান্তির প্রবক্তা হওয়া যায়? আমি বুঝি না। শুধু জাফস এই সম্মেলনে উর্বশীর সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে। এই নিয়ে তিনবার। কোনো কারণ ছাড়া আমি একজনকে নিয়ে ভাবছি কেন? কাশ্মীরী নারীদের কণ্ঠস্বর জলপ্রপাতের মতো আমার কানে পড়ছে বলে কি? নাকি উইপসার আর একটি বাস নারীদের নিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসছে বলে? বুঝতে পারি শান্তির পক্ষে এতসব আয়োজন আমার বেঁচে থাকার সাধ বাড়িয়ে দেয়। আমি মোহিনী গিরির হাত জড়িয়ে বলি, চলুন যাই। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন, কোথায়ই? বলি, আপনাদের স্বপ্নের জগতে। যুদ্ধ-মুক্ত পরমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি জনপদে ঘুরে বেড়াবো আমরা দু’জনে। তিনি মৃদু হেসে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলেন, সত্যি একদিন আমরা এমন জায়গা গড়ে তুলতে পারবো। আমরা না পারলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ঠিকই পারবে। গভীর প্রত্যয়ে উচ্চকিত মোহিনী গিরি আমার সামনে আর একা থাকেন না। শত শত হন। শত শত নারী। তারা দেখতে চায় নিরুপদ্রব জীবনÑ যেখানে হিমালয় পর্বত আছে, অজন্তা ইলোরা আছে, নদীমাতৃক ভূখ- আছে, সাগর-মেখলায় নন্দিত দ্বীপ আছে পাহাড়-বেষ্টিত সমতল ভূমি আছেÑ এসব কথাইতো শুনেছিলাম ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনের মঞ্চ থেকে উচ্চারিত কমলা ভাসিনের কণ্ঠে।

আনন্দগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের ছোট সেমিনার কক্ষ নারীদের তুমুল আলোচনায় গমগম করে। প্রত্যেকের ভেতর থেকে নিজস্ব কথাগুলো বুলেটের মতো ছুটে বেড়ায়। কবি আতিয়া দাউদ তাঁর স্মৃতিচারণে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আনে। আতিয়ার স্মৃতিচারণ আমি মোহাবিষ্ট হয়ে শুনি। ১৯৭১। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরে একটি স্বাধীন দেশ অর্জনের লক্ষ্যে যুদ্ধরত। বিজয় সূচিত হয়। বন্ধুরাষ্ট্র ভরত। কোটি শরণার্থী ভারতের মাটিতে। এই যুদ্ধ জীবনের ফুল ফোটানোর যুদ্ধ। আতিয়া তাঁর কিশোরী জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছে একদিন যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু বাবা-মা বলছে, যুদ্ধ শেষ হলেও আমাদের আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা পাকিস্তানের আর একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান হারিয়েছি। আতিয়ার পরিবার বিষণœ হয়ে থাকে। আমার সামনে জেগে ওঠে মার্চের পঁচিশের গণহত্যার রাত। সংস্কৃতি কেন্দ্রে আজ ২৪ মার্চ। পরদিন দুপুর রাতে গণহত্যার সূচনা করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। নয় মাস ধরে ধর্ষিত হয়েছে নারীরা। চারদিকে মৃত্যু, ধ্বংস, কান্না। যুদ্ধশিশু। নীল নকশা প্রণয়ন করে বুদ্ধিজীবী হত্যা, অপারেশন সার্চলাইট। আগুনে পুড়ে যাওয়া ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এলাকা। আমার বুকের ভেতর ক্ষত। মহারাষ্ট্রের পাঁচগণির মরাল রি-আর্মামেন্ট সেন্টারে দাঁড়িয়ে আমি সুশোভা বারবিকে বলছি, আমি কোনো পাকিস্তানির সঙ্গে কথা বলতে ঘৃণা বোধ করি। সুশোভা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ও চেয়েছিলো পাকিস্তান থেকে আসা প্রতিনিধি অরুণা কামালের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে। তখন পর্যন্ত পাকিস্তান শব্দ শুনলে আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। আমরা এসেছি সার্ক সম্মেলনে। রাজমোহন গান্ধী আমাদের হোস্ট। আমার এই কথায় সুশোভা বিব্রত হয়ে চলে যায়। বিষয়টি যে শুনেছে তারই খুব প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কারণ কনফারেন্সের মূল থিম ঘৃণা নয়, বিদ্বেষ নয়, শুধু ভালোবাসা দিয়ে জয় করতে হবে মানুষকে। ফলে বেশ তোলপাড় ওঠে। দুদিন পরে রাজমোহন গান্ধী অন্যদের নিয়ে আমার সঙ্গে বসেন। প্রথমেই বলেন, আপনার ক্ষত মুছে ফেলতে হবে। আমি বলি, ক্ষত মুছে ফেলা তো সম্ভব নয়। এই ক্ষত নিয়েতো আমার স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তিনি মৃদু হেসে বলেন, যুদ্ধ সংঘাত নিরসন হলে ভালোবাসা ছাড়া আর কোন শব্দ থাকতে পারে না। আপনাদের প্রতি অন্যায় করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। সাধারণ মানুষ নয়। আমি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবো সেখানে অরুণা কামাল ও ওয়াহিদুজ্জামান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে ক্ষমা চাইবে। আমি চমকে তাঁর দিকে তাকাই। তিনি বলেন, আমরা ভালোবাসার আগুন জ্বালাবো। আমাদের বিদায়ের আগে অরুণা ও ওয়াহিদুজ্জামান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে আমাদের কাছে ক্ষমা চায়। অরুণার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। আমরা ফেরার পথে ঐতিহ্যবাহী অজন্তা গুহা ও ইলোরা দেখতে যাই, যে দু’টো পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সমগ্র মানবজাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ওখানে দাঁড়িয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলি, এগুলোই আমাদের জীবনে শান্ত ও সৌহার্দ্যরে নিদর্শন। সেমিনার কক্ষে কথা বলছে সুমাথি, সম্মেলনের তরুণ প্রতিনিধি, শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছে। একদিন ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরেছে, কিন্তু নিজের আলোচনার দিন শাড়ি পরেছে, সঙ্গে সিøভলেস ব্লাউজ। শ্যামলা ছোটখাটো সুমাথিকে আমার খুব স্নিগ্ধ লাগছিলো। সংঘাতময় শ্রীলঙ্কার বিপরীতে এই সম্মেলনে সুমাথি শিবামোহন আমার চোখের সামনে শান্তির বৃষ্টি। যেভাবে নেপালের মঞ্জুশ্রী থাপাও শান্তি হয়Ñমার্ক্সবাদী গেরিলাদের সংঘাতে বিপন্ন নেপালের কথা যখন ও বলে তখন ওর চমৎকার মুখশ্রীতে আমি হিমালয়ের চূড়ায় বরফের গায়ে বিচ্ছুরিত সূর্যালোক দেখি এবং একইভাবে পাকিস্তানি তরুণ লেখক উযমী ও কামিলার সামরিক শাসনবিরোধী তীব্র কথায় আমার বুকের ভেতর শান্তির বাণী ছায়া বিস্তার করে। ওরা সবাই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। ভেসে আসে মীরা খান্নার কণ্ঠ। গোধূলি আলোয় স্নাত মঞ্চ থেকে আলো সরে গেছে। জ্বলে উঠেছে বিদ্যুতের আলো, নৃত্যের তালে মুখর হয়ে উঠেছে মঞ্চ। অপূর্ব ভঙ্গিমায় মঞ্চে নেচে যাচ্ছে রামা, নেপথ্যে মীরা খান্নার কণ্ঠ। ভারতনাট্যমের তরঙ্গছন্দের সঙ্গে মিশেছে যৌনতা ও প্রজনন স্বাস্থ্যে নারীর অধিকার বিষয়ের সমকালীন তীব্রতা। খোলা আকাশের নিচে বসে থেকে মনে হয় ময়ূরীর এখন ডিম পাড়ার সময়। বর্ষা কি দূরাগত ধ্বনি? মীরার কণ্ঠের সুগভীর ব্যঞ্জনা আমাদের মুগ্ধ করে রাখে, আর নৃত্যের জাদুকরী ঝঙ্কারে স্নিগ্ধ হয়ে যায় স্নায়ু। আমার ঘোর কাটে না। বসে থাকি। দু’হাত পেছনে ঠেলে ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখি। পাশে বসে ছিলেন নিয়াজ জামান। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, চমৎকার মীরা দারুণ লিখেছে। তেমন সুন্দর পাঠও করেছে। বলি হ্যাঁ মীরা চমৎকার কাজ করেছে। সমকালীন বিষয়কে শুধু আন্দোলন কর্মীর কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পের মাধ্যমেও তুলে ধরেছেন। অপূর্ব।

একে একে সবাই উঠে যাচ্ছে। অনুষ্ঠান শেষ। আরও কিছুক্ষণ বসে থাকি। জয়া মিত্র এসে বলে, চলুন চারপাশটায় ঘুরে বেড়াই। কেন্দ্রে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিনের বেলায় একরকম, রাতে অন্যরকম। ভাবি, ময়ূরগুলো কোথায় ঘুমিয়ে পড়লো! সংস্কৃতি কেন্দ্রের ঢোকার মুখে রাখা বড় বড় মাটির তৈরি ঘোড়াগুলো বুঝি মাঠে নেমে এসেছে। ঘাস খুঁজছে এবং জোড়ায় জোড়ায় আজ রাতকে নিজেদের কামনায় উৎসবমুখর করবে।

কথা বলি উর্মিলা পাওয়ারের সঙ্গে মুম্বাই থেকে এসেছে। আমার পাশের ঘরে আছে। সকালে রাতে অনেক গল্প হয়। ওর সাদাসিধে আচরণ সহজাত লেখকের ভিন্ন দৃষ্টি এবং কথা বলার স্বচ্ছ দক্ষতায় আমি মুগ্ধ শ্রোতা। ওর কাছে দলিত সাহিত্যের কথা শুনি। নির্যাতিত দলিতদের কথা শুনতে শুনতে বিষণœ হয়ে যাই। ভাবি, আর কতদূর এগুলে এসবের অবসান হবে? নারীর পথ চলা ফুরোবে কবে? সম্মেলন শেষ হওয়ার একদিন আগে উর্মিলা চলে যায়। মুম্বাইয়ে জরুরি কাজ আছে। ও দীর্ঘদিন ধরে দলিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। আন্দোলন করছে না কে? এখন থেকে তিন মাস পরেইতো থাইল্যান্ডের মহিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারে বসে সমকামী মেয়েদের অধিকারের দাবিতে যখন পাপুয়া নিউগিনির রুবি কোনকে সরব হতে শুনবো তখন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠবে একটি হাত। চিদমলের বিশাল সেন্ট্রাল ডিপার্টমেন্ট সেন্টারের সামনে প্লোয়েনচিতের ফুটপাথে পড়ে থাকবে একটি মানুষ। চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। পুরো শরীর ঢাকা। ও নারী না পুরুষ তা বোঝার জন্য আমি একটি সময় দাঁড়াবো। হঠাৎ দেখবো একটুখানি বেরিয়ে থাকা হাতে একটি কালো চুড়ি শোভা পাচ্ছে। মুহূর্তে নারীর অস্তিত্ব টের পেয়ে আমি নিজেকে মূর্খ বলে গালি দেবো এই বলে যে এখন পর্যন্ত আমি নারী-পুরুষের অবস্থানকে বুঝতেই শিখলাম না। ও পুরুষ হলে চাদরের নিচে ঢাকা থাকতো না। ও উলঙ্গ পড়ে থাকতে পারতো- নেতিয়ে থাকা শিশ্ন ওকে পৃথিবী জয়ের আনন্দে অজস্র গাড়ির শব্দের ভেতরও ঘুমিয়ে থাকতে দিতো। আমি সম্মেলনে গৌতম আর নাতাশাকে দেখবো। ওরা যৌনকর্মীদের ওপর পুলিশের নির্যাতন বিষয়ে ছাব্বিশ মিনিটের ডকুমেন্টরি বানিয়ে নিয়ে সম্মেলনে আসবে। লেকচার থিয়েটারে যৌনকর্মী রেহানা নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে থাকলে গৌতম আর নাতাশার ছয় মাসের ছেলেটি তারস্বরে চেঁচাবে। আসলে ও ঘোষণা দিতে থাকবে যে আগামী দিনের পৃথিবী ওর। ও পুরুষ। তখন নিজের চেয়ে দশ বছরের বড় একটি মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনলে নাসিরের মা চিৎকার করে কাঁদবে। চিৎকার করে আমাকে বলবে, ছেলেটা আমাকে শান্তি দিল না। একটি মাত্র ছেলে আমার। আমি আমার বান্ধবী জরিনাকে জিজ্ঞেস করবো, এতো অল্পে তোর শান্তি বিঘিœত হয় কেন? শান্তি কি খুব ছোট জিনিস? জরিনা ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। বলবে, আমি কি এখন একটা সিগারেট খাবো? আমি ওকে গালি দেবো। বলবো হারামজাদী নিজেকে নারীবাদী বলে গলা ফাটাস। সবার সামনে সিগারেট খাওয়ার সাহস নেই। আমার মায়ের সঙ্গে তোর পার্থক্য থাকলো কোথায়? সাহস থাকলে সবার সামনে ধোঁয়া ওড়া। তখন থরথর করে কেঁপে উঠবে কারগিলের আকাশ। আমি দেখবো সাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশে কু-ুলি পাকানো ধোঁয়া। পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে ভরে যাচ্ছে আকাশ। আমি আমার গন্তব্যে ফেরার জন্য চিৎকার করবো। দেখবো ঘুটঘুটে অন্ধকারে মোড়ানো রাস্তার দু’ধারে অজস্র ফেরিওয়ালা রামবুতান ফল বিক্রি করছে। পরস্পরকে বলছে, আজকের দিনটায় বেচাকেনা ভালো হয়েছে। চাল আর আলু কিনে ঘরে ফিরতে পারবো। ভীষণ খুশি লাগছে। থাইল্যান্ডের আকাশের কালো ধোঁয়া মেঘ হয়ে বৃষ্টি নামাবে। আমি আমার গন্তব্যের পথ খুঁজে পাবো। দেখবো রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করছে একটি কিশোরী। বলবে আপা একটা কদম ফুল নেন? জিজ্ঞেস করবো, তোর নাম কী রে? ও হাসিতে উচ্ছল হয়ে উঠে বলবে, শান্তি। আমার মনে হবে হিমালয়ের চূড়া থেকে শীতল বাতাস এসে আমার বুক ভরিয়ে দিচ্ছে। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বিশৃঙ্খল শহর ঢাকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাববো এই শহরে আমার একটি ঘর আছে। ওখানে ফিরতে হবে। ফেরাটা নিশ্চিত নয়। অনিশ্চিত যাত্রায়। আর আমার শহরের মেয়ে শান্তিরতো কোন ঘরই নাই। ও ফুটপাথে বড় হতে হতে শরীর বিক্রির সবক নেয়। কে যে ওর নাম শান্তি রাখে বুঝি না।

আমি তখন মনোযোগ দিয়ে সম্মেলনের সমাপনী বক্তৃতা শুনি ডক্টর কাপিলা বাৎসায়নের কাছ থেকে। বয়সী নারীর অভিজ্ঞতা এবং প্রজ্ঞা তাঁর কণ্ঠে ধ্বনি হয়। এই সেসনে অন্তরা দেবসেনের সঞ্চালক হওয়ার কথা ছিল। ওর আসতে দেরি হচ্ছে দেখে মীরা খান্না সঞ্চালকের দায়িত্ব নেয়। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। অন্তরার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় কাঠমান্ডুতে, অন্য আর একটি সম্মেলনে। সেই থেকে ও আমার পছন্দের মানুষ। সভা বেশ খানিকটা চলার পরে অন্তরা আসে এবং ওকে মঞ্চে এসে দায়িত্ব নিতে হয়। ভাবি ওতো তেমনই আছে যেমন দেখেছিলাম আগে। অনুষ্ঠানের র‌্যাপোটিয়ারের দায়িত্বে ছিলেন ড. সাইয়েদা হামিদ। তাঁর কণ্ঠে গত কয়েকদিনের অনুষ্ঠানের বিবরণ শুনতে শুনতে দেখতে পাচ্ছিলাম তামিলনাড়ুর বামাফ স্টিনা কত জোরালো ভাষায় কথা বলছে। যেন আবার সেই বারুদ ফাটা কারগিলের আকাশ কিংবা গুজরাটের দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। নাকি কথা বলছে নীলগিরি থেকে আসা মার্সি নাকি কাশ্মীরের নাসিম সাইফ, গুজরাটের স্বরূপ, পাকিস্তানের জাহিদা হিনা, আসামের অরূপা বা মিত্রা, কেরালার কবি সুগাতাকুমারী, কতজনের নাম বলবো। অনন্তকাল ধরে বললে এই নাম বলা শেষ হবে না। আকাশে ঝুলে থাকবে নক্ষত্ররাজি, ধরণীতে ধুলোর পাহাড়। আমরা পিষ্ট হতে থাকবো পায়ের নিচে জননীর মমতা নিয়ে। ছুটে যাবে সুশোভার গাড়ি গুরগাঁওয়ের দিকে। আমি হরিয়ানা সীমান্তে ঢুকে ভাববো আবার কি দেখা হবে। রাজমোহন গান্ধীর সঙ্গে, যাঁর রিভেঞ্জ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন : আন্ডারস্ট্যান্ডিং সাউথ এশিয়ান হিস্টরি, বইটি পড়ে আমিও ভাববো ‘সে দ্য গুড স্পিরিট দ্যাট কুইকেনস দ্য রেইন অ্যান্ড কিনডলস দ্য লাফটার, দ্য ইগারনেস অ্যান্ড দ্য ডেডিকেশন ইউস উইলি উমেন অ্যান্ড মেন টু রিকনসাইল সাউথ এশিয়া’স ইনজেনিয়াস, ইমপসিবল অ্যান্ড লাভেবল ইনহ্যাবট্যাস্টস।’ তখন রাধা চক্রবর্তী আমার বন্ধু, আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কবে ফিরবেন ঢাকায়। কেমন হলো সম্মেলন? দিল্লির ত্রিমূর্তি ভবনের উল্টো দিকে ওর বাড়ি। আমরা ডাইনিং টেবিলে বসে কথা বলছি প্রচুর খাবার টেবিলে। ভাবি রাধা যখন পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের লেখকদের গল্প অনুবাদ করে বই প্রকাশ করে সেটাতো শান্তি খোঁজার চেষ্টায় একটি অন্যরকম যাত্রা কিছু মানুষের অনুভব একত্র হলে অন্যরা স্বস্তি পাবে।

রাধা একটি ট্যাক্সি ডাকতে বলে ওর বাড়ির দারোয়ানকে। লোকটি একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে আসে আমার জন্য। আমি যাচ্ছি অন্তরার অফিসে। ওর ‘দ্য লিটল ম্যাগাজিন’ পত্রিকা অফিসে দুজনে কাজ করছিলো। অন্তরা আর প্রতীক কাঞ্জিলাল। যখন চা খাচ্ছি গল্প করছি তখন কলকাতা থেকে ফেন করেন নবনীতাদি। বলেন, শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক ও আরও কিছু জিনিস চুরি হয়ে গেছে। যেন হাইড্রোজেন বোমা ফেটে গেলো এমন একটি খবর। চিড় খেয়ে যায় বুকের ভেতর। কতক্ষণ সময় হাঁসফাঁস করি। প্রতীক গভীর মনোযোগে কম্পিউটারে কাজ করে যাচ্ছে। আমি আর অন্তরা ময়ূরবিহারের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করি, টুকটাক জিনিস কিনি। লোকের ভিড় রাস্তায় হাট বসেছে ভ্যান, রিক্সার ঠেলাঠেলি। আমি নিশ্বাস টানলে মানুষের গন্ধ পাই। এসব মানুষইতো খুঁজি নিয়ত, এদের প্রচ- শক্তি আছে, এরা জাগায় লেখককে। মানুষ নানাভাবে সংগঠিত করে নিজেদের। এই সম্মেলনের সময়ইতো আমি আর জয়া ঠিক করলাম দক্ষিণ এশিয়ার নারী লেখকদের গল্প নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করবো বাংলা ভাষায়। রবীন্দ্রনাথের প্রাণের ভাষা। মানুষেরা তার জীবনদর্শনকে নিজের জীবনে কাজে না লাগিয়ে একটি ধাতব বস্তু নিয়ে সটকে পড়েছে। হায় ঈশ্বর! আমরা, তার উত্তরসূরী নারী লেখকরা এই নগরীতে মাত্র গতকাল নারী শান্তিকর্মীদের আয়োজনে একটি সম্মেলন শেষ করছি। আমাদের বুকের ভেতরে শান্তির বাণী উচ্চারণের প্রতিজ্ঞা। আমার অটো তখন পার হয়ে যাচ্ছে যমুনা নদীর ওপরের নাজিমুদ্দিন সেতু। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আলো ঝলমল শহর। অন্তরা বিদায় দেওয়ার সময় বলেছে ভালো থেকো। আমি যাচ্ছি মনীষার বাড়িতে, আজ রাতে ওর সঙ্গে থাকবো। নিজেকে বলি বেশতো আছি। কত দ্রুত অদ্ভুত সময় পেরিয়ে গেলো একদমই অচেনা একটি নগরীতে। দূর থেকে এই শহরটিকে আমি ভয় পাইÑ কারণ এই শহরে নিয়ন্ত্রিত হয় আমার মতো অসংখ্যজনের নিয়তি।

মনীষার কিশোরী মেয়ে অখিলা রাতের খাওয়ার সময় আমার প্লেটে মুরগির টুকরো তুলে দেয়। কত সহজাত ভঙ্গি অখিলার। এইটুকু বয়সে শিখে গেছে অতিথি আপ্যায়নে নারীর সহজাত মানবিক স্বাচ্ছন্দ্য, তারপরও সমাজের বন্দুকের নল ওর দিকেই তাক করা থাকবে। কারণ ও একটি মেয়ে। যুদ্ধ নারীর স্বামীর জীবন হরণ করেই ক্ষান্ত হয় না, সংসারের সমুদয় দায় চাপে তার ঘাড়ে। অখিলা আমার সামনে সুযোগ্য বালিকা, দায় নেয়ার কায়দা রপ্ত করার যোগ্য হয়ে উঠেছে। ওর চারপাশে অজস্র সাদা ফুল। ওকে ঠেকাবে কে। ওদের বাড়ির বড়সড় তালমেশিয়া কুকুরটি এখন টেবিলের পাশে বসে মনীষার হাত থেকে মুরগির মাংসের টুকরা চিবুচ্ছে। ওর ভঙ্গিতে পুরুষতন্ত্র ফুটে আছে। দীর্ঘদিন ধরে এই একই রকম ভঙ্গি মানুষ ও পশুতে দেখে আসার পরও আমি ভয় পাচ্ছি। ভয় পাচ্ছে না অখিলারা। ওদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। ওরা ঠিকই মোকাবেলা করতে পারবে। আমার জন্য ঘর ছেড়ে দেয় অখিলা। ওর বিছানায় শুয়ে থেকে আমি অখিলার শরীরের গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করি। ভাবি একদিন নির্মলা দেশপ্রা-ে অখিলার বয়সী ছিলেনÑ এই বয়সকে অতিক্রম করে এসেছেন মোহিনী গিরি পদ্মা শেঠ, সাইয়েদা হামিদ, কমলা ভাসিন, মীরা খান্না। তারা এখন অখিলাদের জন্য স্বস্তিময় পৃথিবী গড়তে চায়। ওদের কণ্ঠে ওম শান্তি ধ্বনি। আমরা দক্ষিণ এশিয়ার লেখক অলেখক নারীরা ওই শব্দ আঁকড়ে ধরি। ভাবতে চাই আমাদের সামনে কোন পারমাণবিক বোমার হুমকি নেই। পুরুষতন্ত্র নেই। মানুষেরা মানুষ হয়েছে। আখিলা ঘরে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখি। আকাশ দেখা আমার প্রিয় অভ্যাস।

এখন আমি দিল্লি বিমানবন্দরে। সুযুক্তার মুখোমুখি বসে আছি। ও ভীষণ আলাপী মেয়ে। উচ্চতায় পাঁচ ফুটেরও কম, শুকনো শরীর বেগুনি রঙের শাড়ি পরে আছে। গায়ের শ্যামলা রঙে চকচকে আভা, দৃষ্টি উজ্জ্বল। সুযুক্তা তামিলনাড়ুর মেয়ে। ব্যাংককে যাবে আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার জন্য। ওর কথা শুনে বুঝতে পারি যে ও ভীষণ উদ্যোগী মেয়ে। চেন্নাইয়ে একটি এইডস গবেষণা কেন্দ্র ও ক্লিনিকের পরিচালক। আমার বিমান ছাড়ার ঘোষণা শুনতে পাচ্ছি। ওর কাছ থেকে বিদায় নেবো। ফিরে যাচ্ছি নিজ দেশে। ওকে বললাম ভালো থেকো। আবার হয়তো কখনো কোথাও দেখা হতে পারে। ও আমার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বললো, তোমার সঙ্গে কথা বলে আমারও ভালো লেগেছে। কিন্তু তোমার সঙ্গে আগামী দিনে কখনো দেখা হবে কিনা আমি জানি না। আমি বিস্ময়ে বলি, কেন? পৃথিবীটা খুব ছোট সুযুক্তা। ও মৃদু হেসে বলে, আমি এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত। স্বামীকে মনে করেছিলাম বিশ্বস্ত বন্ধু। কখনো টের পাইনি যে অন্য নারীর সঙ্গে ওর দৈহিক সম্পর্ক আছে। ও নিজেও মৃত্যুর দিন গুনছে এবং আমিও। তবে আমি ঘাবড়ে যাইনি। এইডস রোগিদের নিয়ে কাজ করছি। যারা আক্রান্ত হয়নি তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি।

আমি অস্ফুট স্বরে বলি সুযুক্তা!

ও হা হা করে হেসে ওঠে। বলে, তুমি ভয় পাচ্ছো? ভয় পেয়ো না। মানুষের মৃত্যুতো একবারই হবে। সেটা নিয়ে আমি ভাবি না। আমার দুঃখ স্বামীর অবিশ্বস্ততায়। যাকগে। শোনো, আমি আমার বাবার বিরুদ্ধে সম্পত্তির অধিকার নিয়ে মামলা করেছি। মেয়ে বলে বাবা আমাকে বঞ্চিত করবে তা হবে না। তবে এই মামলার রায় আমি হয়তো দেখে যেতে পারবো না। দুঃখ নেই লড়াইটাই সত্য।

আমি বিমূঢ় হয়ে থাকি। আমার মনে হলো সুযুক্তা অনেক বড় জীবনবাদী লেখক। আমি ওর কাছে নগণ্য। ওর এত কথার পরে আমার মুখে কথা জোগায় না। ও বলে, তুমি এবার যাও। তোমার বিমানে ওঠার শেষ কল হয়েছে।

আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, ওম শান্তি তুমিই আমার শান্তির শক্তি। মনে হচ্ছে আমি নীলগিরি পাহাড়ের কুরুঞ্জি ফুল খুঁজে পেয়েছি।

ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে নিজের ভেতরে আবার নতুন করে শক্তি খুঁজে পায় যুথিকা। এক’দিনে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা হলো। যে আয়োজন করার জন্য এতদিন ধরে তোড়জোড় করছে তার একটি ছবি নিজের ভেতরে স্পষ্ট করে তোলে। বুঝতে পারে যে মিছিলটি করার জন্য ও নিজেকে তৈরি করেছে তার পটভূমি দেখতে পেয়েছে একটি সম্মেলনে সবখানে জাগরণের জোয়ার।

বাড়ি ফিরে এলে ছোটবোন ওকে দেখে বলে, তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে আপু। দিল্লিতে যে বেশ আনন্দে ছিলে তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।

হ্যাঁ, আনন্দে ছিলাম তা বলতে পারিস। লিখে ডায়েরির পৃষ্ঠা ভরে ফেলেছি। জ্ঞানের সীমা বেড়েছে। দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। নিজেকে ভরাতে পেরেছি রে ময়না পাখি।

ও বাব্বা, তুমি আমাকে একটা নতুন নাম দিয়ে ফেললে।

হা হা করে হাসে যুথিকা। খুশি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে খালাম্মাÑ

ওরে ছোট্ট খুকি তোমার জন্য একটা সুন্দর জামা এনেছি। তুই দেখলে খুশি হয়ে যাবি।

আমার জামা লাগবে না। আপনাকে চা দেবো?

না, কিচ্ছু দিতে হবে না।

যুথিকা বাথরুমে ঢোকে। খুশি মনে মনে বলে, খালাম্মা এমুনই। নিজের জন্মদিনেও জামা কেনে ওর জন্যÑতারপর সারাদিন ছুটি দেয়। টাকা দেয় ঘোরার জন্য। খালাম্মা বেশি খুশি হয় মামা আসলে। ওর ছোট বয়সের দৃষ্টিতে সেটুকু এড়ায়নি।

বিকেলে অনিমেষ আসে। বাড়িতে যুথিকা একা। দিল্লি থেকে আনা একগাদা ছবি, বই ও কাগজ নিয়ে বসে। যেসব পেপার ওখানে পড়া হয়েছে সেগুলো এখন মনোযোগ দিয়ে পড়বে। কোনটা আগে পড়বে, কোনটা পড়ে পড়বে সেসব বাছাই করে। অনিমেষকে দেখেই বলে, কেমন আছে?

তোমার খবর আগে বলো।

আমি দারুণ কাটিয়ে এসেছি। একটু একটু করে তোমাকে বলবো।

ভালোই হলো, অনিমেষ হো-হো করে হাসে।

কি ভালো হলোÑ

এই, তোমার এখানে রোজ রোজ আসা যাবে।

ভাবটা এমন দেখাচ্ছো যে আমার এখানে আসতে তুমি বাধা পাও? তুমি স্ত্রী মারা যাবার পরেÑ

থাক যুথিকা, আমাদের কাজের খানিকটা এগিয়েছে। পল্লব এসেছে বরিশাল থেকে। ও বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে এসেছে। শ্যামলী দিনাজপুর থেকে ফিরেছে। মনিরা কুষ্টিয়া থেকে। চারদিকের খবরই ভালো। মিছিলটা বেশ বড় হ