২০ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গোয়েন্দা আড়িপাতা ॥ পিছিয়ে নেই ফরাসীরাও

  • আবিদ হাসান

খবরটা দু’বছরের পুরনো। তখন প্রকাশ পেয়েছিল যে, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) ইউরোপীয় নেতাদের ওপর ইলেক্ট্রনিক গোয়ান্দাগিরি চালাচ্ছে। ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে পড়ায় আমেরিকা বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। ফ্রান্সের সোসালিস্ট প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ তখন বলেছিলেন, এটা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে তার এ নিয়ে কথা হয়েছিল। এ নিয়ে ছোটখাটো হৈ-চৈও হয়। তবে অল্পদিনের মধ্যে সেই হৈ-চৈয়ের রেশ মিলিয়ে যায়। গত ২৪ জুন উইকিলিকসের ফাঁস করা কিছু খবরকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের দিক থেকে আবার একই রকমের উষ্মা প্রকাশ করা হয়। উইকিলিকস্্ জানায়, ২০০৬ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এমএসএ ৩ জন ফরাসী প্রেসিডেন্টের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালিয়েছিল। এরা হলেন ওঁলাদে এবং তার দুই মধ্য-ডানপন্থী পূর্বসূরী নিকোলাস সারকোজি ও জ্যাক সিরাক। ফ্রান্সের জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের জরুরী বৈঠকের পর এলিসি প্রাসাদ থেকে আবার বলা হয় ব্যাপারটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। আরও বলা হয়, আমেরিকানরা ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ফ্রান্সের কাছে আন্ডার টেকিং দিয়েছিল সেটা কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। কিন্তু এবারের প্রতিবাদটা ফ্রান্সের দিক থেকে একটু বিব্রতকরও হওয়ার কথা। কারণ ফ্রান্স নিজেই এখন তার গোয়ান্দাবাহিনীকে ইলেক্ট্রনিক আড়িপাতার ক্ষমতাদান আইনসিদ্ধ করার কাজে ব্যস্ত।

উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্যগুলো মিডিয়া পার্ট নামে একটি ওয়েবসাইট এবং লিবারেশন নামে একটি দৈনিক পত্রিকায় পরিবেশিত হলেও এখনও পর্যন্ত ওতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় কোন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এনএসএর কিছু ক্লাসিফাইড রিপোর্ট যেগুলো কিনা প্যারিস, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনস্থ সিনিয়র ফরাসী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফরাসী প্রেসিডেন্টদের টেলিফোন কথোপকথন ইন্টারসেপ্ট করার ভিত্তিতে প্রণীত। প্যারিসস্থ মার্কিন দূতাবাস ছিল এসব কর্মকা-ের প্রাণকেন্দ্র। এলিসি প্রাসাদের মতো এই দূতাবাসটিও একই রাস্তায় অবস্থিত।

এনএসএর এই রিপোর্টগুলোর কোন কোনটি ছিল নিতান্তই গতানুগতিক ও তুচ্ছ। আবার কোনটি ছিল কৌতুকময়। ২০০৮ সালের একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘সারকোজি মনে করেন তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের সমাধান এনে নিতে পারেন।’ এর দ্বারা সাবেক ফরাসী প্রেসিডেন্টের আত্মম্ভরিতাকে অতি প্রচ্ছন্নভাবে একটা সূক্ষ্ম খোঁচা মারা হয়েছিল। তবে অন্যান্য রিপোর্টে বেশকিছু স্পর্শকাতর ক্রিয়াকলাপের কথা প্রকাশ করা হয়েছিল। যেমন ইউরো থেকে গ্রীসের বেরিয়ে যাওয়ার পরিণতি নিয়ে আলোচনার জন্য ওঁলাদের নির্বাচিত হওয়ার পরপরই জার্মান বিরোধী দলের সঙ্গে তার এক গোপন বৈঠক অনুমোদন। এই বৈঠকটি চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেলের অজান্তে বা তার অজ্ঞাতসারে অনুষ্ঠিত হয়।

এনএসএ বলেছে, তারা ওঁলাদকে টার্গেট করেনি এবং করবেও না। তবে মিস মার্কেলের টেলিফোনে এনএসএর আড়িপাতা ফাঁস হওয়ার পর হোয়াইট হাউস থেকে প্রদত্ত বিবৃতিতে যেমন অতীতের কোন প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়নি, তেমনিভাবে অনএসএও এই বিবৃতিতে আগের কোন ঘটনার উল্লেখ করেনি। ওঁলাদে বারাক ওবামাকে টেলিফোন করেছিলেন। ওবামা নাকি অতীতের এসব কর্মকা-ের অবসান ঘটাতে তার অঙ্গীকারের পুনরুল্লেখ করেছিলেন। সোশালিস্ট পার্টি এই ঘটনাটি প্রসঙ্গে বলেছে যে, এসব তথ্য প্রকাশে তারা শঙ্কিতবোধ করছে। এ থেকে আমেরিকার পাগলামির এক হতবুদ্ধিকর অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়। ফরাসীরা আড়িপাতার প্রসঙ্গ এলেই একটু বেশি রকমের অস্বাচ্ছন্দ্যের পরিচয় দেয়। তার প্রধান কারণ তাদের নিজেদের গোয়েন্দা সার্ভিসগুলোও ঠিক এ কাজই করছে। এক প্রাক্তন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ফরাসীরা আজ যেভাবে ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করছে, তাতে অবাক লাগে। কারণ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ জানে যে, তাদের যোগাযোগ বার্তা ইন্টারসেপ্ট করা হয়। ফরাসীরা নিজেরাও এ কাজ করছে। ফরাসী গোয়েন্দা সার্ভিস আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল থেকে প্রচুর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে এবং আফ্রিকানদের সঙ্গে তা শেয়ার করছে। স্বদেশেও তাদের ইলেক্ট্রনিক আড়িপাতার তথ্য ফাঁস হয়েছে। ২০০৩ সালে লা মঁদে পত্রিকায় প্রকাশ করা হয় যে, ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএসই ইন্টারনেট যোগাযোগের বার্তাগুলো ব্যাপক পরিসরে ইন্টারসেপ্ট করার কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। সম্প্রতি ফরাসী পার্লামেন্টে নতুন গোয়েন্দা আইন অনুমোদিত হয়েছে। তাতে ফরাসী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকেই এ ধরনের কার্যকলাপ চালিয়ে আসছে বলে ধারণা করা হয়। সেগুলিকে বৈধতা দিয়ে ফরাসী গোয়েন্দাদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইনে আরও অনেক কিছুর মধ্যে এই ব্যবস্থা আছে যে, গোয়েন্দারা গোপন মাইক্রোফোন পেতে রাখতে, টেলিফোন ও ইন্টারনেট বার্তা ট্যাপ করতে এবং প্রাইভেট ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মেটাডাটা হাতিয়ে নিতে পারবে। বিলটি নিয়ে জনসাধারণ্যে তেমন কোন বিতর্ক হয়নি এবং বাম ও ডান উভয় তরফের সদস্যদের জোরাল সমর্থনে পাস হয়ে যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মার্কিন ও ফরাসী গুপ্তচররা একই কাজ করে বেড়াচ্ছে। শুধু ফরাসীদের কার্যকলাপ ফাঁস হয়নি বলে তাদের নিয়ে কোন হৈ-চৈও হয়নি।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

নির্বাচিত সংবাদ