১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সংসদ এলাকার কবর অপসারণ

বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি বাঙালীর কাছে অতি পবিত্র। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর কবল থেকে দেশকে স্বাধীন করতে প্রাণ দিয়েছেন ত্রিশ লাখ মানুষ। সম্ভ্রম হারিয়েছে তিন লাখ মা-বোন। স্বাধীনতার জন্য এত আত্মাহুতি আর কোন জাতি দেয়নি। তাই দেশের মাটির প্রতি গভীর মমত্ব সব বাঙালীর রয়েছে। আর এত রক্তদানে অর্জিত বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদ ভবন, যা পবিত্র হিসেবে বিবেচিত। জনপ্রতিনিধিরা যেখানে বসে আইন প্রণয়নসহ দেশ ও জাতির অগ্রগতির, জনগণের ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন ঘটান, সেই ভবন এলাকাটি পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে নানাভাবে কলঙ্কিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশকে পাকিস্তানী ধারায় পরিচালনাকারীরা স্বাধীনতাবিরোধীদের সমাজ ও রাষ্ট্র, রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করার কাজটি চালিয়েছে সামরিক শাসকরা। সংসদ ভবন চত্বরে গোরস্তান বা কবরস্থানের অনুমতি নেই। মৃত মানুষের কবর হয় পারিবারিক সম্পত্তিতে বা কবরস্থানে। কিন্তু যেখানে কবরের জন্য স্থান নির্ধারিত ছিল না সেখানে হঠাৎ করে একাত্তরের ঘাতক, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের কবর দেয়া শুরু হলো। সংসদ ভবনের ঐতিহ্য বিনষ্ট ও লুই কানের নক্সা বিকৃত করার কাজটি যে ঐতিহ্যবিরোধী তা তাদের মগজেও আসেনি, বিবেকেও বাধেনি। স্বাধীনতাবিরোধীসহ নানাভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের এখানে কবর দেয়ার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মদানকে বিদ্রƒপ ও উপহাসের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করার প্রবণতাই পরিলক্ষিত হয়, যা বাংলাদেশকে পাকিস্তানে রূপান্তরকরণের চক্রান্তের অংশ। ভবন এলাকায় আবুল মনসুর আহমদ, তমিজউদ্দিন খান, আতাউর রহমান খান, আবদুস সাত্তারের কবর রয়েছে। এরই পাশাপাশি রয়েছে সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমান, মসিউর রহমান যাদুমিয়া এবং অন্য পাশে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের কবর। এ কবরস্থান নিয়ে মাঝে-মধ্যে ক্ষীণ প্রশ্ন উঠলেও গত কয়েক বছর ধরে প্রকাশ্যে বিতর্ক চলে আসছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধীসহ সবার কবর সরিয়ে নেয়ার দাবিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কর্মসূচী পালন করে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। এমনকি ২০০৯ সালের তিন জুলাই স্পীকারকে স্মারকলিপিও দেয়া হয়েছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন ছাত্র, যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও সংসদ ভবন এলাকা থেকে কবর সরানোর দাবিতে সমাবেশসহ জনমত গড়ার কাজ করেছে। তাদের ভাষ্য ছিল, সংসদ ভবন চত্বর থেকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীই শুধু নয়, সব কবরই সরিয়ে ফেলা উচিত। বিশেষ করে এখানে স্বাধীনতাবিরোধীদের কবর থাকা জাতির জন্য কলঙ্কের, মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা, স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের অপমান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য সংসদ ভবন চত্বর থেকে এসব কবর সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। লুই কানের নক্সা বাস্তবায়নের জন্য হলেও এগুলো সরানোর সিদ্ধান্ত সরকার কার্যকর করবে বলে আশ্বস্তও করেছে। এর মাধ্যমে ত্রিশ লাখ শহীদের পরিবারবর্গসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার ধারক সর্বস্তরের নাগরিকের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে। অনেক রক্তের দামে পাওয়া এই দেশÑ বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণপ্রত্যাশা পূরণ হওয়ার পথ তৈরি হোক- এই প্রত্যাশা।