২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মোহন মাস্টারের ঈদ উদযাপন

অনেক বছর স্ত্রীকে ঈদ উপলক্ষে নতুন শাড়ি দেননি মোহন মাস্টার। এ নিয়ে সামনে কিছু না বললেও আড়ালে মন খারাপ করতে ভুল করেনি স্ত্রী। এবার মনস্থির করেছেন স্ত্রীকে শাড়ি দেবেনই। তাই নিজে পছন্দ করে কেনার জন্য এ দোকান থেকে সে দোকান ঘুরে দামে মেলাতে পারছেন না। বড় মেয়ে শশী টিউশনির টাকা জমিয়ে বাবার হাতে দিয়েছে ঈদের কেনাকাটার জন্য। মেয়ের আর নিজের সঞ্চিত টাকা মিলিয়ে হাজার সাতেক। স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এবার ঈদে মেয়েদের জন্য দামী পোশাক দেবেন।

সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে খবর দেখে খুব কষ্ট পান মোহন মাস্টার। যাকাতের শাড়ির জন্য সাতাশটি প্রাণ ঝরে গেল! মানুষের অর্থের পরিমাণ জাহির করার জন্য এভাবে হতদরিদ্র মানুষের প্রাণ নিয়ে অবহেলা আর কতদিন দেখতে হবে? ঐ সাতাশটি পরিবারের এবারের ঈদের খুশি (একটি শাড়ি বা লুঙ্গির জন্য) শোকে পরিণত হলো! কিছুতেই নিজেকে সান্ত¡¡না দিতে পারছেন না তিনি।

রাতে টিউশনি শেষে বাড়ি ফিরছিলেন মাস্টার সাহেব। এক বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। এগিয়ে যান। শুনতে পান এক নারীর আহাজারি। ছেলেমেয়েরা বায়না ধরেছে ঈদে নতুন পোশাক চায়। অথচ স্বামী সামান্য চায়ের দোকানদার। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে মাসখানেক। সঞ্চিত টাকা স্বামীর চিকিৎসা করাতেই শেষ! ছোট ছেলেমেয়েদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে ঈদে জামা-কাপড় দেবে কী ভাবে? তাই আল্লাহতায়ালার দরবারে ফরিয়াদ করে মনের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করছে। আর অসহায় স্বামী বিছানায় শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের অক্ষমতাকে প্রকাশ করছে নীরবে। মোহন মাস্টারের বুকের ভেতর হাহাকার করে ওঠে। মনে পড়ে ছোটবেলায় এক ঈদে তাঁর বাবা শহর থেকে আসতে পারেননি বলে নতুন পোশাক না পেয়ে কী কষ্টই না পেয়েছিলেন।

মোহন মাস্টার বাড়ি ফিরে সবাইকে পবিত্র কোরানে ‘মানুষের হক’ সম্পর্কে যে কথা উল্লেখ আছে তা মনে করিয়ে দিয়ে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা জানান। স্ত্রী প্রথমে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেও দপ করে নিভে যান। বড় মেয়ে শশী বাবার প্রস্তাব সমর্থন করে। ছোট দু’মেয়ে মায়ের কানে কানে বলেÑ ‘ঈদে নতুন পোশাক ছাড়া আনন্দ হবে কী করে?’ সিদ্ধান্ত হয় ছোট দু’মেয়ের জন্য এবং সেই পরিবারের সবার জন্য পোশাক কেনা হবে।

আজ ঈদ। সকালে ঈদগাহে নামাজ আদায় করে নিজে গিয়ে সেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসেন মোহন মাস্টার। অতিথিদের ঈদের পোশাক উপহার দিয়ে এক সঙ্গে সেমাই খেতে বসেন। ছোট ছেলেমেয়েদের মুখে স্বর্গীয় হাসি দেখে মন ভরে যায় মোহন মাস্টারের। খুশি ভাগাভাগি করে নেয়ার মধ্যে যে কি সুখ, কি আনন্দ, কি শান্তি তা বলে বোঝানো যায় না, শুধু উপলব্ধি করা যায়। ঈদ মানেই যেÑ ‘আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ।’ আহা! বিত্তবানদের ঘুমিয়ে থাকা বিবেক যদি জাগ্রত হতো!

অমলকান্তি সরকার

তেজগাঁও থেকে