২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিষয় গ্রীস

  • দাউদ হায়দার

না বাঁচাবে আমায় যদি মারবে কেন তবে?

কিসের তরে এই আয়োজন এমন কলরবে?

গ্রীস ইউরোপেই থাকছে, থাকতে বাধ্য করা হয়েছে কঠিন, কঠিনতর শর্তে। এমনই শর্ত, ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির চেয়ে কম নয়, বরং বেশি। যদি বেলআউট (আর্থিক পুনরুদ্ধার) পেতে চাও ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সংসদে পাস করিয়ে নিতে হবে আমাদের নির্দেশ। পেনশন আইন সংস্কার করো, কর বাড়াও, সরকারী খরচ কমাও, কৃচ্ছ্রসাধন করো। এখানেই চুপ নয় ট্রয়কা (ইউরোপিয়ান কমিশন, আন্তর্জাতিক অর্থ ভা-ার, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক)। এতদিন ধার করে (আন্তোনিস সামারাস, পাপান্দ্রুর আমলে) মাখন, ঘি খেয়েছ, এখন শোধ করো রাষ্ট্রের এ্যাসেটস্ বিক্রি করে (কম করেও ৫০ বিলিয়ন ইউরো দাম)। প্রয়োজনে গোটা কয়েকটি দ্বীপও বেচে দাও, যে সব দ্বীপ টুরিস্টের জন্য লোভনীয়, পর্যটন-বাণিজ্যে লাভবান।

৫ জুলাইয়ে ইয়েস-নো গণভোটে নো’র পক্ষে ৬১.০৭ রায়ে ট্রয়কার কর্তারা প্রকাশ্যে মহাক্ষিপ্ত, আড়ালে হেসেছেনও, কতদূর যাবে, মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, ফিরতেই হবে আমাদের কাছে, নতজানু হতেই হবে। নো ভোট মানি না। নো রায় দিয়েছে, নো নিয়েই থাকো। ইউরোজোন থেকে ভাগো, ফিরে যাও দ্রাকমায়। গেলেও রেহাই নেই। চারদিক থেকেই ঘিরে ধরা হবে। দেশ যাবে অতলে। এসব হুমকির মধ্যে গভীর বার্তাধ্বনি। নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে গ্রীসের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য সম্পর্ক ছেদ। গ্রীসের মানুষ ইউরোজোনের কোথাও চাকরি পাবে না, গ্রীকদের ভিসা লাগবে ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন)-এ (এই খবর বার্লিনের দৈনিক ডী টাতস্-এর)।

মূল কথা, ট্রয়কা এবং ইইউর অধিকাংশ দেশ, বিশেষত দুই মাতব্বর জার্মানি ও ফ্রান্স, সঙ্গে তো চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা মেরকেল এবং ফ্রঁাঁসোয়া ওঁলাদ আছেনই, গ্রীসের কমিউনিস্ট সরকার পতনে মরিয়া। কী করে সিপ্রাস সরকারকে পিষে মারা যায়। মারার জন্য জার্মানি, ফ্রান্স আদাজল খেয়ে ইয়েসের পক্ষে ওকালতি করে সারাক্ষণই। মিডিয়ায় প্রচারণাও চালায়, হুমকি-ধমকি দিতেও কসুর করে না। গ্রীসের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিস সামারাসকে ভার দেয়া হয়, ট্রয়কার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সামারাস বৈতরণী পার করিয়ে দেবেন। নো’র জয়ে সামারাসের পদত্যাগ, শঙ্কা প্রকাশ করেন, গ্রীস কমিউনিস্ট দেশের পথে, ভেনিজুয়েলার হুগো চাভেজের অনুসারী আলেক্সিস সিপ্রাস। ইউরোজোনের ১৯ রাষ্ট্রনেতার মধ্যে ১৫ দেশের কর্তারা গ্রীসের বেলআউটের পক্ষে সায় দিলেও চ্যান্সেলর মেরকেল বেঁকে বসেন, গোঁ ধরেন, সিপ্রাস সরকারকে শায়েস্তা করবেনই (প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ফেরুওয়াকিস জার্মানিকে উদ্দেশ করেই বলেছেন, তস্কর, টেররিস্ট দেশ। ফ্রাউ মেরকেল নিশ্চয়ই ভোলেননি)। সতেরো ঘণ্টা ম্যারাথন মিটিংয়ের পর ফ্রাউ মেরকেল বলেছেন, গ্রীসের সংসদে আমাদের প্রস্তাবিত শর্তমালা পাস করা হোক আগে (১৫ জুলাইয়ের মধ্যে), তারপর বেলআউট অনুমোদনের প্রশ্ন।

আলেক্সিস সিপ্রাস যদি মরার হিক্কাও তোলেন, সংসদে প্রস্তাব আনতে হবে, পাস করাতে হবে। যদিও তাঁর দলের একাংশ অরাজি, ঘোরতর আপত্তি। বিরোধী দল অবশ্য পাস করানোর পক্ষেই। জার্মান টিভিতেই দেখলুম, একজন সাধারণ গ্রীকের ইন্টারভিউ (এথেন্স থেকে), হিটলার গ্রীসও দখল করেছিলেন, পরাজিত হন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিচ্ছে জার্মানি, আর্থিক দম্ভে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ক্ষমতার গর্বে। আগামী তিন বছরে ৯৫ বিলিয়ন (৮৬ বিলিয়ন নয়) ইউরো দেবে বেলআউটে, আমাদের রক্ত চুষে হাড়েমজ্জায় মারবে। আসলে রাজনৈতিক খেলা, কার কত শক্তি দেখাচ্ছে ট্রয়কাসহ জার্মানি। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রধান ডোলান্ড টুস্ক শুনিয়েছেন : ‘ডব যধাব ধহ ধ-মৎববশ-সবহঃ.’ ইএসএম (European Stability Mechanism) বেলআউট শর্তে রীতিমতো উদ্বিগ্ন, বলেছে, Serious reforms. De-politicise.

এএমডিআইএস (AMD Investor Services) পরিচালক মার্ক ওস্টভাল্ড অভিযোগ করেছেন : ‘Euroyone creditor countries wanted to completely destroy Greece.’ পল ক্রুগমান, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, শুরু থেকেই অস্টারিটির বিরুদ্ধে সোচ্চার, বেলআউটের ভয়ঙ্কর শর্তে রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাঁর হুঁশিয়ারি : ‘CreditorsÕ demands on Greece went beyond harsh into pure vindictiveness, (leading to the) complete destruction of national sovereignty (with) no hope of relief.’

বেলআউট শর্তে ভার্সাই চুক্তির সঙ্গে সাদৃশ্য, সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নের উত্তরে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রাউ এ্যাঙ্গেলা মেরকেল : ‘I never make historical comparisons.’ অতঃপর মৃদু হাসি। হাসবেনই, জয়ী তিনি। গ্রীসের নো-ভোটারদের, সিপ্রাস সরকারকে কষে থাপড় মেরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমরা ছাড়া তোমাদের উদ্ধার নেই। বাঁচাবো না, মারব কলরব করেই।

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ফেরুওয়াকিসের পদত্যাগ রহস্যময় নয় আর। নো-ভোট জয়ে কী ভয়াবহ চাপ আসবে, আলেক্সিস সিপ্রাস কতটা নতজানু হবেন, না হলে বেঘোরে মৃত্যু জানতেন। নিজের সম্মান রক্ষার্থে তড়িঘড়ি বিদায় নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সিপ্রাসের মাঠে মিটফিল্ডের খেলোয়াড় নন, আদর্শ বিসর্জন দিতে অরাজি। ঘাড়ে দোষ নিয়ে, দোষ স্বীকার করে সিপ্রাস সাফাই গাইছেন, নিজের দায়িত্বেই ডিসিশন নিয়েছেন ‘দেশকে বাঁচানোর জন্য, ডুবে যাওয়ার আগে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে মরণ থেকে উদ্ধারের আশায়।’ গ্রীসের পার্লামেন্টে বেলআউট পাস-ফেলের ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নেই। গোটা ইউরোপকেই মূল ধরে ঝাঁকি দিয়েছেন, একেবারে নড়বড়ে, তছনছ করেছেন। ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিকড় শুকাতে শুরু করবে, সন্দেহ নেই, বলছেন অনেক রাজনৈতিক প-িত। হেতু, ইউরো মুদ্রা এবং ইইউর ইন্টেগ্রিটি। ফাটল ধরতে বাধ্য। উপলক্ষ গ্রীস, গ্রীসের বেলআউট। ফুঁসছে বহু দেশই। লাটভিয়ার হাউকাউ অচিরেই শুনবো, আভাস ইতোমধ্যেই।

উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২৯ দেশের মধ্যে ইউরোজোনে দশটি দেশ নেই, এবং কোন ভয়েসও নেই। একে ছোট দেশ, উপরন্তু গরিব, নির্ভরশীল। ইউরোজোনের ১৯ দেশের দুই মোড়ল জার্মানি, ফ্রান্স। সবই নির্ভর করে এই দুই দেশের ছ্যাঁচড়ামোর ওপর।

লক্ষ্য করবেন, ইইউর সদস্য বটে, কিন্তু ইংল্যান্ড ইউরোজোনে নেই, গ্রীস নিয়েও মাথাব্যথা নেই। আমেরিকা আমাদের পাবনার দোহারপাড়া নিয়েও মাথা খামচায়, গ্রীসের বিষয়ে চুপ, মৌন।

কেন? ইউরোপ নিয়ে ঘিলু ওলোটপালট করতে নারাজ (স্পাইয়িং করবে ঠিকই), বেশি চেঁচামেচি

করবে না, দরকার হলে একটু-আধটু। ইউরোপের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে জার্মানিকে, অলিখিত।

পঞ্চায়েতের ফতোয়াবাজ হুজুর যা করে, জার্মানিও শুরু করেছে, রক্তনয়ন ঘোলা করে। মানতেই হবে, ইউরোপের মহাশক্তিধর জার্মানি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর কলামিস্ট রোজার কোহেন লিখছেন : ‘The German model is good for Germans (in EU). But imposing it in all Europeans will destroy the union that saved Germaû.Õ (The Nwe York Times. 14 July 2015.)

এ্যারিস্টোফানেসের একটি নাটকের নাম ব্যাঙের কেত্তন (ফ্রগস)। গ্রীসকে নিয়ে এই দৃশ্যকাব্য চলবে বহু রজনী। সিপ্রাস বলির পাঁঠা, ট্র্যাজিকমেডির নায়ক। বাঁচবে না, মারবে কলরবে। গ্রীক এপিক ধারাবাহিক।

লেখক : কবি, বার্লিন