১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজন হত্যাকারীর ফাঁসি চাই, সঙ্গে দায়ী পুলিশেরও

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

১৩ বছরের একটি কিশোর। ওকে শিশুও বলা যায়, বাচ্চাও বলা যায়। বাজারে শাকসবজি বেচাকেনা করে বাবা-মাকে সাহায্য করত। মানুষ নামের কতগুলো পশু ওকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। জীবন দিয়ে সে আজ বিশ্ব পরিচিতি লাভ করেছে। আমি সিলেটের রাজনের কথা বলছি। আমি রাজন হত্যাকারীর ফাঁসি চাই, ফাঁসির চেয়ে আরও কঠোর, আরও যন্ত্রণাদায়ক প্রতিশোধ চাই। পুলিশের ঘুষের রিপোর্ট, আইনজীবীর কৌশলী এবং বানোয়াট সওয়াল-জবাব নয়- একেবারে সরাসরি ফাঁসি। সঙ্গে দায়ী পুলিশেরও। প্রয়োজনে প্রকাশ্যে।

রাজন আজ আমার আপনার সবার রাজন। কয়েকটা লোক রাজনকে রড দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল। ৩০ মিনিট ধরে দুর্বৃত্তরা এই গরিব বাচ্চাটিকে থেমে থেকে দম নিয়ে পেটাল, উল্লাস করতে করতে, চারপাশের মানুষ নামের কীটেরা ওই দৃশ্য উপভোগ করল, কেউ এগিয়ে এলো না? পুলিশইবা কোথায় ছিল? রাজনের মৃত্যু ঠেকাল না, অথচ ঘুষ খেয়ে রিপোর্ট দিল, ও চুরি করেছে বলে মানুষ ওকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। শেষ নিঃশ্বাসের আগে রাজন পানি খেতে চেয়েছিল, দুর্বৃত্তরা বলেছে ‘তোর ঘাম খা’। তারা ঘটনাটির লাইভ ভিডিও করল এবং ফেসবুকে ছড়িয়ে ছিল। আমরা সেই ভিডিও ফুটেজ টেলিভিশনে দেখলাম, দেখলাম একটি অসহায় মিষ্টি চেহারার শিশুর বাঁচার আকুতি। কেউ এগিয়ে এলো না- প্রিয় পাঠক, এই দৃশ্যাবলী গত শতাব্দীর অত্যাচারী রাজা-মহারাজা-সম্রাটদের নির্যাতনকেও হার মানায় না-কি? না-কি শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডিকেও?

আসুন না, রাজনকে নিজের সন্তান ভাবি। আমার সন্তানটিকে ওরা মেরে ফেলল। কারা ওরা? দুর্বৃত্ত? নাকি কোন পলিটিক্যাল পা-া, সমাজে আতঙ্ক ছড়াবার জন্য এই নৃশংস হত্যাকা-টি ঘটিয়েছে। এর আগেও আমরা বিশ্বজিত হত্যার ঘটনা দেখেছি, দেখেছি (টেলিভিশন) কিভাবে বিশ্বজিতের মতো গরিব খেটে খাওয়া এক যুবককে কতিপয় যুবা বয়েসী দুর্বৃত্ত রাজপথ থেকে চাপাতি চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কোপাতে কোপাতে তাড়া করলে সে প্রাণ বাঁচাতে একটি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছে আর দুর্বৃত্তরা উল্লাস করতে করতে তাকে কোপাচ্ছে এবং গোটা ঘটনার লাইভ শ্যূট করছে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা। তাহলে কি ওই ক্যামেরাম্যানরা জানত এমন ঘটনা ঘটবে এবং তাই তারা আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিল? এই প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি।

তবে হ্যাঁ, একটি ঘটনার কিছু প্রশ্নের মীমাংসা দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল। ১৯৭৪ সাল। এমএ পরীক্ষা হয়ে গেছে। এলএলবি পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পাশাপাশি দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করছি, আমি এবং হলের বন্ধু জাহিদুজ্জামান ফারুক। তখন আবেদ খানও ইত্তেফাকে আর আরেক বন্ধু ইকবাল চৌধুরী টাইমসে। আমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, যা এখনও আছে। তখন পত্রিকা অফিসে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। একটা দেড়টার আগে কোনদিন অফিস ত্যাগ করতে পারতাম না। এক রাতে জাহিদুজ্জামান ফারুক এবং ইকবাল চৌধুরীর দুই চাকার বডবডিতে করে হলে ফিরলাম। আবেদ ও ইকবাল চলে গেলে আমরা নিজ কক্ষে গিয়ে কাপড় ছাড়ব, এমন সময় গুলির শব্দ। একটি, দুটি... আমি দৌড়ে পাশেই ফারুকের কক্ষে এসে দেখলাম, ও ভয়ে কাঁপছে। জানালা দিয়ে দেখলাম হলের গেটে কয়েকজন সশস্ত্র তরুণ। এরপরই ব্রাশ ফায়ার। মানুষের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের গোঙ্গানী। সারারাত আমরা দুই বন্ধু ঘুমাইনি। ভোর ৫টার দিকে নিচে উঁকি দিয়ে দেখি সিঁড়ির গোড়া, করিডর রক্তে ভাসছে, রক্ত গড়াতে গড়াতে লনের সবুজ দূর্বা ঘাস রাঙ্গিয়ে তুলেছে। সেই যে হল ছাড়লাম, আর ল’ পরীক্ষাটাও দেয়া হলো না। পরে দেখলাম, মামলা হয়েছে, শুনলাম জড়িতদের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে মিলিটারি জিয়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ওই খুনীদের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেন। তাদের কেউ এখন খালেদা জিয়ার পাশে বসে রাজনীতি করছেন, কেউ তথাকথিত সাংবাদিকও।

তখনও দূরদর্শন প্রযুক্তি এত ব্যাপক এবং উন্নত ছিল না, তাই বিশ্ববাসী দেখতে পায়নি। সেই দৈন্য আজ নেই। আজ যে ঘটনাই ঘটুক সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। রাজন হত্যাও বিশ্ববাঙালী (অন্য জাতির মানুষও) দেখেছে। আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া স্টেটের ডুকেইন ইউনিভার্সিটি অব ফারমাকোলজিতে গবেষণারত বাঙালী সিফাত মারিয়া তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, “Jotobar baccha cheeltar chobi dekhchi Nijeke mauush Vabte ghenna hocche ..... may good rest your (rajon) soul in peace little angel .... god will give you justice one day ... Inshallah.”

একই ইউনিভার্সিটিতে অপর গবেষক অনীক আলম ঢাকার কথ্য ভাষায় স্ট্যাটাস দিয়েছে- “এটাকে শুধু নিষ্ঠুরতা বা বর্বরতা বলা যাচ্ছে না, মানুষ মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে, বর্বরভাবে মাইরা ফেলতে পারে, সেটার শিকার যখন ১৩ বছরের বাচ্চা হয় এবং সেটাকে ভিডিও কইরা ছাইরা দেয়া হয়, এই কাজগুলো করার জন্যে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হইতে হয়। এখানে মৃত্যুর আলাদা আবেদন আছে ..... চিন্তা কইরা দেখেন, পেপারে এই মৃত্যুর খবর পড়লে আপনে এতটা ধাক্কা খাইতেন না। মনে রাখতে হবে এই বিকার একদিনে তৈরি হয় নাই, বিকারগ্রস্ত এই মানুষগুলো আমাদের চারপাশেই আছ, প্রেম করতেছে, বিয়ে করতেছে, ছেলেমেয়ে বড় করতেছে, শুধু সময় সুযোগ বুইঝা তাদের ভেতরের দানব বাহির হইয়া আসতেছে। এই হত্যাই হউক আমাদের মৃতপ্রায় মনুষ্যত্বের, জরাজীর্ণ চিন্তার, ঘুনে ধরা প্রতিবাদের প্রথম স্ফুলিঙ্গ... আর তারপর তা দাবানলের মতো ছড়াতে থাক..... শহরে, নগরে, বন্দরে, দেশের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে ......” (হুবহু কোট করলাম)।

মাঝে মাঝে পুলিশের ওপর ভীষণভাবে বিরক্তি ধরে যায়। অথচ কয়েকদিন আগে ‘আমিরে জামায়াত হেজাবি (হেফাজত-জামাত-বিএনপি) চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া যখন বললেন, ২০১৩ সালে ৯ মাস এবং ২০১৫ তে জানুয়ারি-মার্চ ৯২ দিনে যে সব পেট্রোলবোমা ছোড়া হয়েছে, পুড়িয়ে মানুষ হতাহত করা হয়েছে, তা সব নাকি করেছে পুলিশ। এ সব শুনে নীরব থাকিনি, বরং প্রতিবাদ করে দৈনিক জনকণ্ঠে কলাম লিখেছি। এই পুলিশই ওই পেট্রোলবোমাবাজদের খতম করার কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। সমাজের অন্যান্য অংশের মতো পুলিশের মধ্যেও খারাপ মানুষ আছে। একজন সাধারণ মানুষ খারাপ হলে একজন-দুইজন আক্রান্ত হয়। একজন পুলিশ খারাপ, ঘুষখোর হলে ব্যাপক জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ পুলিশের হাতে আইনের দ-। অথচ গত কয়েকদিনের কাগজে দেখলাম, রাজনকে যারা হত্যা করেছে সেই দুর্বৃত্তরা পুলিশকে ঘুষ দিয়ে কেউ দেশত্যাগ করেছে, কেউ আত্মগোপনে চলে গেছে। যদিও সৌদি আরবে গিয়েও বাঁচতে পারেনি, সেখানে বসবাসকারী বাঙালীরা প্রধান ঘাতক কামরুলকে ধরে আটক করেছে এবং সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী রাজনকে হত্যা করে ঘাতকরা পুলিশের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় কেসটা ধামাচাপা দেয়ার চুক্তি করে এবং নগদ ৬ লাখ টাকা দিয়ে দেয়। যার ফলশ্রুতিতে প্রধান ঘাতক দুদিনের মাথায় দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুলিশ ছড়িয়ে দেয়, ‘জনতার পিটুনিতে চোর মরেছে।’ আগেও কাগজে এসেছে রাজনের বাবা থানায় মামলা দিতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। নিজেরা নিজেদের মতো করে একটা এজাহার লিপিবদ্ধ করেছে, যাতে রাজনকে শিশু বা কিশোর না বলে বলেছে ‘চোর’। পুলিশের লেখা এজাহারটি লক্ষ্য করুন- “অজ্ঞাত ব্যক্তি স্থানীয় বড়গাঁও জামে মসজিদের বিপরীত দিকে আলী মিয়ার গ্যারেজ হইতে অদ্য ৮-৭-২০১৫ ভোর অনুমান ৬ ঘটিকায় ভ্যানগাড়ি চুরি করাকালে ওয়ার্কশপের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা প্রহরী ময়না মিয়াসহ (৪৫).... আশপাশে লোকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে মারপিট করিলে গুরুতর আহত হয়। পরবর্তীতে তার মৃত্যু হয়।” (যুগান্তর ১৫ জুলাই ২০১৫)।

বিভিন্ন সূত্র থেকে যে সব খবর এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, ৬টি লোক একটি ১৩ বছরের বাচ্চাকে পেটাল। এটি বিনা প্রতিবাদে যাচ্ছে না। ঘাতকদের একজনের স্ত্রী তার স্বামীর বিচার দাবি করেছে। ঘাতকদের পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিলেটবাসী। আইনজীবীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা ঘাতকদের পক্ষে কোর্টে দাঁড়াবেন না। দাবি উঠেছে ঘাতকদের জনতার মাঝে ছেড়ে দিতে। যদিও এটা আইনের শাসনের প্রতি হুমকি। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তখন উপায়ই বা কি?

কেন ছেলেটিকে ওরা হত্যা করল? এ প্রশ্নের কিনারা এখনও হয়নি। দৈনিক জনকণ্ঠের (১৫ জুলাই ২০১৫) রিপোর্টে যে কারণ বলা হয়েছে তা তো উচ্চারণ করা যাবে না, ‘সমকামিতায় রাজি না হওয়ায় ঘাতকরা এ কাজ করেছে।’ ছেলেটি শাক-সবজির ব্যবসা করতে খুব ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। পথিমধ্যে তারা তার ওপর চড়াও হয়। কারণ যাই হোক মানুষ এত নৃশংস কেন? পশ্চিমা উন্নত দুনিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, কোন এক তরুণ স্কুলে ঢুকে ব্রাশ ফায়ার করে শিশু হত্যা করছে বা কোন উপাসনালয়ে প্রার্থনারত মানুষকে হত্যা করছে। সে সব দেশে বিত্ত তরুণদের বিপথগামী করছে বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যারা এসব নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা তো বিত্তবান নয়, কেউ মাসোহারাভোগী শিবির, কেউ পলিটিক্যাল গুণ্ডা।

পলিটিক্যাল গু-াদের একটা টার্গেট থাকে। তারা এ ধরনের নৃশংস কাণ্ড ঘটিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে ক্ষমতাসীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। এ পর্যন্ত যে সব খবর এসেছে তাতে করে বলা যায়, রাজন হত্যার পেছনে কোন পলিটিক্যাল মোটিভের লক্ষণ ধরা পড়েনি। তবে কেন? তবে কি মানুষই অমানুষ হয়ে উঠেছে? ডুকেইন ইউনিভার্সিটির গবেষক ছাত্রছাত্রীর কথাই তবে সত্য? মানুষের ভেতরকার হায়ওয়ান (পশু) কি তবে ন্যায়নীতি সততা, মানুষে মানুষে মায়া, মমতা, সব কিছু কি তবে শেষ করে দিয়েছে? কোন কিছু কি আর অবশিষ্ট নেই? এই যেমন হত্যার পর টেলিভিশনে আরেকটি দৃশ্য (লাইভ) দেখা গেল, বরিশালে একটি শিশু সদনে দু’টি ৪-৫ বছরের শিশুকে (কন্যা) সদনের একজন কর্মচারী গাছের ডাল দিয়ে বেদম পেটাচ্ছে। তাদের অপরাধ, একজনের মা তার মেয়েকে দেখে ফিরে যাওয়ার সময় মেয়েও তার মার পিছু পিছু কিছু দূর যায়। তার সঙ্গে তার এক সতীর্থও ছিল। ব্যস, সদনের রক্ষকের কাছে এটা খুব বড় অপরাধ বলে মনে হয়েছে, তাই পিটিয়ে মানুষ করছিল (?)

কিন্তু পুলিশ? সে তো একেবারে গু-মূর্খ নয়। সাধারণ কনস্টেবল পদেও আজকাল এসএসসি, এইচএসসি এবং গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রীধারী ছেলেমেয়েরা ঢুকছে। চাকরি করছে। আর এসআই, সে তো মিনিমাম গ্র্যাজুয়েট। তারচেয়েও বড় কথা, তাকে রীতিমতো দুই বছরের ট্রেনিং করে, উত্তীর্ণ হয়ে তবেই পোস্টিং পেতে হয়। সে কি করে একটা বাচ্চা ছেলেকে পিটিয়ে মারার ঘটনাকে চুরি বলে চালিয়ে দিল, ৬ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে? আমি মনে করি মানুষের মধ্যে অর্থলোভ এত বেড়ে গেছে যে, উপার্জনের পথটি সঠিক না সঠিক নয়, নাকি দুর্নীতির পথে, কোন কিছুই এখন আর ভাবে না, হাতে মাল এলেই হলো। এমন কি ঘুষের মাল দিয়ে স্ত্রীর জন্যে দামী শাড়ি-গহনা এনে দিলে স্ত্রী খুশি হন। একবারও জিজ্ঞেস করেন না কত টাকা বেতন পাও? এত টাকা দিয়ে এগুলো কিনলে কি করে? স্ত্রী তো তবু ঘরের বউ। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, এতিমখানায় টাকা দিতে গেলে তারা বড় ধরনের একটা মোনাজাত দিয়ে দাতার আরও উন্নতি (ঘুষের টাকার) ও দীর্ঘায়ু কামনা করে টাকাটা পকেটে পুরে নেন। হুজুরও প্রশ্ন করেন না, ভাইসাব, তোমার বাবা তো ফুটপাথে বসে নুন-তেল-কেরোসিন বেচত, তুমি এত টাকা পেলে কোথায়? এত বিশাল গাড়িতে ঘুরছ, একাই একটা মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করে দিচ্ছ? অবশ্য আজকাল মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বাস জন্মেছে, টাকা টাকাই, কোন্টা ঘুষের টাকা, কোন্টা চুরি-ডাকাতির টাকা, কোন্টা জালিয়াতির টাকা, কোন্টা দুর্নীতির টাকা, কোন্টা গরিবের ত্রাণের চাল-গম চুরির টাকা, কোন্টা শরীর বেচা টাকা, কিংবা কোন্টা বেতনের টাকা, কোন্্টা হাওয়া ভবনের টাকা, কোন্্টা রাজাকারের টাকা, তা তো আর গায়ে লেখা থাকে না। যাকে কালো টাকা বলা হয় সেটার রংও কালো নয়। বস্তুত যে দেশে দীর্ঘদিন সামরিক শাসন চলে, তারা গড়হবু রং হড় ঢ়ৎড়নষবস বলে রাজনীতিকে যেমন ফরভভরপঁষঃ করে, তেমনি মানুষের চরিত্র, মানবিক মূল্যবোধকেও ফরভভরপঁষঃ করে দেয়।

জাপানে ছিলাম কিছুদিন। তখন একটা ঘটনার কথা শুনেছিলাম। একদল ব্যাংক ডাকাত ধরা পড়লে, ডাকাতদের মধ্যে একজন ছিল পুলিশ সদস্য। তার ছবি কাগজে ছাপা হলো। ওই পুলিশ সদস্য যে একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, সে একাডেমির প্রিন্সিয়াল তার ছবিটি দেখে তার ছাত্রকে চিনতে পেরে আত্মহত্যা করলেন। একটি চিরকুটে লিখে গেলেন, “আমার ট্রেনিংয়ে নিশ্চয়ই গলদ ছিল, নইলে আমার একাডেমির পুলিশ ডাকাতি করবে কেন?”

সর্বশেষ, আমার একটা বিশ্বাসের কথা বলে এ লেখা শেষ করছি। পুলিশ ইচ্ছে করলে সপ্তাহের মধ্যে গোটা বাংলাদেশ ক্রাইম ফ্রি করতে পারে। রাজনদেরও এভাবে নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হতে হবে না, শিক্ষকের দ্বারা বা অন্য কারও দ্বারা মেয়েদের ধর্ষণের শিকার হতে হবে না। কেবল একটি মাত্র লোভ সামলাতে হবে, কেউ ঘুষ খাবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক