২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন প্রত্যয়ে উজ্জীবিত হওয়ার দিন

  • এম. নজরুল ইসলাম

রাজনীতির ইতিহাসে কিছু কিছু ঘটনা ঘুরে ঘুরে আসে। যদি বলা হয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধুকে কোনদিন মুছে ফেলা যাবে না। যদিও তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করার অনেক চেষ্টাই হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চরাই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতিতে অভিষেক যেমন তাঁর জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, তেমনি মসৃণ নয় তাঁর রাজনৈতিক চলার পথটিও। পায়ে পায়ে পাথর ঠেলে শেখ হাসিনাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। কিন্তু জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক কল্যাণের যে পথযাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর তা থেকে তাঁকে বিচ্যুত করা যায়নি। ১৯৮১ থেকে ২০১৫-এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাটি একেবারেই কুসুমাস্তীর্ণ বলা যাবে না। বরং কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। বাবার মতোই অনেক চরাই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন। দীর্ঘদিন কাটাতে হয়েছে নিঃসঙ্গ পরবাস। স্বামী-সন্তান নিয়েও গভীর বেদনার দিন পার করতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়েও স্বদেশে ফিরতে পারেননি তিনি। দেশের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পরও ছায়ার মতো তাঁকে অনুসরণ করেছে ঘাতক। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

এক সময় রাজনীতি থেকেই তাঁকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা করা হয়। সাল ২০০৭। সে এক দুঃসহ দিন। বাংলাদেশে তখন চলছে চেপে বসা অপশক্তির দুঃশাসন। দেশের রাজনীতিকে নতুন করে কলুষিত করার প্রয়াস হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে। ঐ বছর ১৬ জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশকে সত্যিকার অর্থেই দুর্যোগের মেঘ আচ্ছন্ন করেছিল। গণতন্ত্র নির্বাসনে পাঠিয়ে চেপে বসা শাসকগোষ্ঠী তখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননে ব্যস্ত। রাজনীতি তখন যেন গর্হিত অপরাধ। রাজনীতিক পরিচয়টিও যেন হানিকর। শাসনের নামে ত্রাসের রাজত্ব। ওয়ান-ইলেভেন নামের পটপরিবর্তনের পর চেপে বসা তত্ত্বাবধায়ক নামের অপব্যবস্থায় জনজীবনে নাভিশ্বাস। সেই দুর্বিষহ দিনে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়।

টেলিভিশনের পর্দায় সেই গ্রেফতার-নাটক চাক্ষুষ করেছে বাংলাদেশের মানুষ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরাপত্তারক্ষীদের অপ্রয়োজনীয় অথচ অতিনাটকীয়তায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের সেই বার্তা দেশ থেকে বিদেশে প্রচার হতেও সময় লাগেনি। ঢাকায় রাত পৌনে ৪টায় যৌথ বাহিনী ঘিরে ফেলে সুধা সদনÑজননেত্রী শেখ হাসিনার তখনকার বাসভবন। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় তখন মাঝরাত। সেল ফোনে ভেসে এলো আওয়ামী লীগের তৎকালীন পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কণ্ঠস্বর। বললেন, এইমাত্র আপাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছেÑ মাত্র একটি বাক্যেই কথা শেষ। সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ও অনুসারীদের ফোন করে ঘুম থেকে জাগিয়ে নেত্রীর গ্রেফতারের খবর দিই এবং সকাল ৮টায় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় স্টার্ড পার্কে শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ আহ্বান করি। ফোন করি লন্ডনে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানাকে। ফোনের ওপারে তাঁর কণ্ঠেও হতাশা। আমি আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাই তাঁকে। তিনি আমাদের উৎসাহ দেন। তাৎক্ষণিকভাবে ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের পরামর্শ দেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরদিন অস্ট্রিয়া সময় সকাল ৮টায় বিপুলসংখ্যক বাঙালী নারী-পুরুষ উপস্থিত হন বিক্ষোভ সমাবেশে। অস্ট্রিয়া প্রবাসী সর্বস্তরের বাঙালীদের নিয়ে ‘শেখ হাসিনা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।

তবে সবাইকে ছাপিয়ে যায় শেখ পরিবারের সদস্যদের প্রয়াস। প্রিয়জনের মুক্তির চেষ্টায় সম্ভাব্য সব পথে হেঁটেছেন এই পরিবারের প্রতিটি সদস্য। শেখ হাসিনার সৌভাগ্য, তিনি এমন এক পরিবারের সন্তান যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অটুট পারিবারিক বন্ধন পারস্পরিক নৈকট্য থেকে কাউকে বিচ্যুত হতে দেয় না। তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সদস্যরা হয়ত কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ইতোকর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি কেউই। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলে মুক্ত করতে তাঁর যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছোট বোন শেখ রেহানা এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় টেলিফোনে সব সময় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বিভিন্ন নির্দেশনা ও উপদেশ দিয়েছেন। তাঁরা ছিলেন প্রত্যয়দৃপ্ত। শেখ হাসিনার কানাডা প্রবাসী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ রেহানার দুই কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তি, ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি সবসময় শেখ হাসিনার মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করেছেন। তাঁর মুক্তির ব্যাপারে আইনী লড়াই করতে সুদূর কানাডা থেকে আন্তর্জাতিক আইনজীবী অধ্যাপক ড. পায়াম আকাভান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী উইলিয়াম স্লোন ঐ সময় বাংলাদেশে আসেন। এই দুই আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ ও তাঁদের দেশে পাঠানোর ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছিলেন শেখ রেহানার ছোট মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তি। এমন অটুট পারিবারিক বন্ধন সত্যিই বিরল। শেখ হাসিনাও জানতেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা সবসময় তাঁর সঙ্গেই আছেন। আর পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাস করতেন, সব ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে বাংলার মানুষের ভালবাসায় সিক্ত জননেত্রী শেখ হাসিনা একদিন ঠিকই ফিরে আসবেন তাঁর বিশ্বাসের মানুষের কাছে। ২০০৮ সালের জুন মাসে তিনি মুক্তি পান।

আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরিত্রের যে বিষয়টি সবার আগে দৃষ্টি কাড়ে তা হচ্ছে তাঁর গভীর প্রত্যয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণে তিনি সবসময় নিবেদিত। গভীর সঙ্কটেও তিনি জনগণের কল্যাণ চিন্তা করেন। তাঁর সেই চিন্তার প্রতিফলন বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সব অর্জনে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের তালিকায় নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। ২০০৭ সালে জেলখানায় বসেই এই উত্তরণের পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি এক বক্তৃতায় তিনি সে কথা উল্লেখ করেছেন। জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা তা সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে নিঃসঙ্গ দিনগুলোতেই তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত ছয় বছরে তাঁরই নেতৃত্বে অনেকটাই এগিয়েছে বর্তমান সরকার। বাকি সময়ের আগেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারেও তো আশাবাদী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতারের পর নিঃসঙ্গ কারাবাসে কেবল শুয়ে-বসেই দিন কাটেনি তাঁর। সৃজনশীল জননেত্রী সেই নিঃসঙ্গ-একাকিত্বের দিনগুলোতে দেশ ও জনগণের কল্যাণে ভবিষ্যত পথপরিক্রমার পরিকল্পনা করেছেন। সেই স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাকে সলিটারি কনফাইনমেন্টে রাখা হয়েছিল, একদম একা। আমি জানি আমার বিরুদ্ধে অনেক মামলা, আমি যাতে নির্বাচন করতে না পারি, আরও অনেক রকম পরিকল্পনা ছিল বা আমি যেন আর রাজনীতিতে থাকতে না পারি সে ধরনের অনেক ষড়যন্ত্র।...সেই সময় বসে বসে আমি লিখে রেখেছিলাম, ২০০৮-এর মধ্যে নির্বাচন হলে যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায় তাহলে দেশের জন্য কী করব? ...২০১১ সালে আমরা কী করব, ২০১২ সালের মধ্যে কী করব, ২০১৩ সালের মধ্যে কী করব, ২০১৪ সালের মধ্যে, ২০১৫ সালের মধ্যে কী করব, এভাবে আমি প্রত্যেকটা বিষয় লিখে রেখেছিলাম।’ সেদিনের বক্তৃতায় শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, কারাগারে যাওয়ার সময় একটি খাতা সঙ্গেই নিয়েছিলেন তিনি। পরে আরও কিছু খাতা কিনিয়ে নেন।

জরুরী অবস্থার অবসানের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। রাজনীতির জটিল পথে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় টানা দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার নিয়ে চলছেন তিনি। নিঃসঙ্গ কারাগারে বসে দিনের পর দিন যে উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছেন, দেশ ও জাতির অগ্রগতির যে চিন্তা করেছেন, তারই প্রতিফলন আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিটি স্তরে। সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ছয় বছরের আর্থ-সামাজিক ও মানব উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্ব মন্দার কারণে যখন উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্থর গতি, গত ছয় বছরে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যেখানে গড়ে চার শতাংশের কম, সেখানে বাংলাদেশ এই সময়ে গড়ে ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। গত ছয় বছরের দারিদ্র্যের হার অর্ধেকের মতো কমে নেমে এসেছে প্রায় ২৪ শতাংশে। এ সবই সরকারের কৃতিত্ব, যে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। গত ২ জুলাই বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশের কাতারে এনেছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৩১৪ ডলার। মাথাপিছু আয়ের এই হিসাবে (নমিনাল) বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ৫৮তম। ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের ৩৬তম। এই কৃতিত্ব অবশ্যই দেশের মানুষের। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই উন্নয়নের পথে অগ্রযাত্রায় যিনি নিয়ত নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি শেখ হাসিনা।

অনেকের ধারণা ছিল, ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতারের পর শেখ হাসিনা আঁতাতের পথে যাবেন। রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আবার মনোনিবেশ করবেন গৃহকর্মে। কিন্তু কল্যাণমন্ত্রে দীক্ষা যাঁর তাঁকে জনকল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত করা যায় না। জনকল্যাণকে ব্রত করে তাই পথ চলেছেন জনগণের নেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা।

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী, মানবাধিকারকর্মী

ও সাংবাদিক

nayrul@gmx.at

নির্বাচিত সংবাদ