১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘যেখানে পাইবে ছাই’

  • ওয়াহিদ নবি

বুজুর্গ ব্যক্তিরা বলেছেন, রোজার মাস ত্যাগব্রতে দীক্ষা নেয়ার মাস, সংযমের মাস। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ কী করেছেন? বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইফতার পার্টির আয়োজন করেছে; ভাল কথা। সেজেগুজে সেখানে সবাই গেছেন। তাদের সবার পোশাক যে ধর্ম অনুমোদিত সে কথাও বলা যাবে না। ভাষণ দিয়েছেন দলীয় নেতৃত্বের কেউকেটারা। বক্তৃতার বিষয়বস্তুগুলোর দিকে একটু নজর দেয়া যাক। একটি মহফিলে বেগম জিয়া বলেছিলেন, এই সরকারকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কারা এ ষড়যন্ত্র করছে সেটা অবশ্য তিনি বলেননি। অন্তত পত্রিকায় সেটি প্রকাশিত হয়নি। তবে ওই বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছিলেন, সীমান্তে প্রতিদিন বাংলাদেশীদের গুলি করে মারা হচ্ছে। তার বক্তৃতা দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকলে কাদের তিনি দায়ী করছেন তা বুঝে ওঠা কঠিন হবে না। মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় তার কথার সুর ছিল অন্যরকম। তিনি আরও বলেছিলেন, বিজিবি এখন দুর্বল। ‘আমাদের সময় শক্তিশালী ছিল।’ কিছু না বলাই ভাল।

আর একটি মহফিলে তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সরকার সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের দিকে সরকারের কোন নজর নাই। তবে কি তার মতে সরকারের উচিত ছিল সরকারী কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে দেয়া! এতে কি প্রমাণ হয় যে, সাধারণ মানুষের দিকে সরকারের নজর আছে!

আর একটি ইফতার পার্টিতে তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের পরিণতি হবে হীরক রাজার কাহিনীর মতোÑ ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’ তিনি আরও বলেছিলেন, সরকার ২০ দলের পেছনে লেগেই আছে। অপরাধ করছে তাদের দলের লোক, মামলা দেয়া হচ্ছে ২০ দলের নেতাকর্মীদের নামে।

ড্যাবের ইফতার পার্টিতে তিনি বলেছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান জালিম সরকারের পতন ঘটানো হবে। তিনি আরও বলেন যে, বর্তমান জালিম সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হবে। তার নেতৃত্বে পর পর দুই বছর ২০ দল দুটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেছে এবং তারা বিজয় অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের মনে এই দুটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের স্মৃতি জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। প্রথম আন্দোলনে মারা গেছেন সাড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ। কতজন আহত হয়েছেন কে জানে! বাস পুড়েছে, ট্রেন পুড়েছে, ট্রেনলাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে। হাজার হাজার গাছ কাটা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য আর লেখাপড়ার প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ আমরা এখনও জানি না। এ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে ২০ দল একই কৌশল অবলম্বন করে এ বছর আবার ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তথাকথিত ক্যাডারদের বহ্ন্যুৎসবে প্রাণ হারায় দেড় শ’ মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো নেতাদের ব্যবহার। তাদের কোথাও দেখা গেল না। আগের আন্দোলনের ব্যর্থতার জন্য ঢাকা শহরের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়েছিল। এবারে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। যার ফলে খোকাবাবু হলেন দেশান্তরিত। কিন্তু নতুন নেতৃত্ব নতুন কিছুই করতে পারল না। ব্যর্থতার বোঝা কাঁধে নিয়ে ‘ম্যাডাম স্বেচ্ছানির্বাসন ছেড়ে বাড়ি ফিরলেন।’

ম্যাডাম আবার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের কথা বলছেন। প্রথম আন্দোলন থেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে তিনি দ্বিতীয় আন্দোলনে নেমেছিলেন। ইফতার পার্টিতে তার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে যে, দুটি ব্যর্থ আন্দোলন থেকে তিনি কোন শিক্ষা নিতে অনিচ্ছুক। কিছু কথা মনে করার চেষ্টা করা যাক। দুটি আন্দোলনে জনগণ সাড়া দেয়নি। এর অনেক কারণ রয়েছে। এর একটি হচ্ছে বিএনপি সরকারের শাসনামলের বেদনাময় অভিজ্ঞতা। সাফল্যের অনুপস্থিতি। এসবের বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন নেই। মানুষ কেন সেই ব্যর্থ দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য আন্দোলনে নামবে? প্রথম আন্দোলনে নেতাদের সুবিধাবাদী আচরণ মানুষের দৃষ্টি এড়ায়নি। ম্যাডাম যে এদের আচরণে কোন পরিবর্তন আনতে পারবেন, এটা মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনি। এরা তার মুখের সামনে যতই ‘ম্যডাম’ ‘ম্যডাম’ করুন না কেন, আন্দোলনে নেমে অর্জিত সম্পদ ঝুঁকির মধ্যে ফেলার ব্যাপারে এদের কোনই উৎসাহ নেই।

ম্যাডামের চেয়ে একধাপ এগিয়ে গেছেন দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট নোমান সাহেব। তিনি বলেছেন, ‘লাঠি ও পাথর’ দিয়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল। তিনি নিজে লাঠি ধরবেন কিনা, কিংবা পাথর ছুড়বেন কিনা জানি না, তবে অনুসারীদের বিপদের মধ্যে ফেলে দেবেন। তাকে মনে রাখতে হবে যে, বিরোধীপক্ষ আত্মরক্ষা করবে। এমন অবস্থায় নিজেদের ব্যর্থতার জন্য সরকারের জেল-জুলুমকে দায়ী করে কোন লাভ হবে না।

ম্যাডাম অভিযোগ করেছেন, তাদের আন্দোলনের সময় পুলিশ বাস পুড়িয়েছে এবং বোমা ছুড়েছে। তিনি দাবি করেছেন, পুলিশের এসব কাজের জন্যই তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তিনি কোন প্রমাণ দেননি। আইজিপি তার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ম্যাডাম বিচার বিভাগকে ব্যর্থ বলেছেন। বিচার বিভাগ কিছু বলেনি এ সম্পর্কে। আমাদের দুটি আইনী ধারণা সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। সে দুটি হচ্ছেÑ ‘আদালত অবমাননা’ ও ‘কমন ল’। আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত ও বিচারকদের সম্বন্ধে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উক্তি দুঃখজনক। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আমাদের দেশে অনেক কিছুর উন্নতি সাধন প্রয়োজন। কিন্তু এজন্য নৈরাজ্য সৃষ্টি কারও জন্য মঙ্গলজনক নয়। ইফতার পার্টিকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করার বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলতে শুরু করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক এ সম্পর্কে বক্তব্য রেখেছেন।

পণ্ডিত ব্যক্তিরা বলেছেন, ‘যেখানে পাইবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’ আমরা বিভিন্নজনের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করলাম। কিন্তু সব কথা ছাপিয়ে যে কথাটিÑ ‘ছাই উড়াইয়া দেখার’ মতো সেটি হচ্ছে বেগম জিয়ার ‘হীরক রাজার’ উল্লেখ। কত অমূল্য রতন পাওয়া যায় এ কথা চিন্তা করলেÑ উপেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরীর ‘গোপী গায়েন বাঘা বায়েন’, যার অগ্রযাত্রা তার নাতি সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার কাহিনী’। আরও এগিয়ে নিয়ে গেছেন সত্যজিৎ তনয় সন্দীপ রায়। সত্যজিতের পিতা সুকুমার রায়। তুলনাহীন। বোম্বাগড়ের রাজার ফটোর ফ্রেমে আমসত্ত্ব ভাজা বেঁধে রাখা। চার পুরুষ ধরে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আমাদের এমনি সব চিন্তার খোরাক দিন সেটা আমরা চাই। হীরক রাজা পরিবর্তিত হয়েছিলেন গোপীর গানে গবেষণাগারে। বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানচর্চা আমাদের নেতাদের পরিবর্তন ঘটাবে, সেটাই আশা করি।

লেখক : রয়াল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টের

একজন ফেলো