২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিচারের বাণী কাঁদে...

ঘাতকের তপ্ত বুলেটে স্তব্ধ হয়ে গেছে তাঁর কলম। শুধু কলম নয়, সেই সঙ্গে নির্বাসিত করেছে তার জীবন প্রদীপও পনেরো বছর আগে। অকুতোভয়, সাহসী, কর্মনিষ্ঠ কলমযোদ্ধাটিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে যারা, তাদের দাঁড়াতে হয় না বিচারের কাঠগড়ায়। এমনকি সঠিক অভিযুক্তদের নাম চাপা দিয়ে আসামিদের করা হয়েছে সাক্ষী। আর বিচারের বাণী কেঁদে ফেরে নীরবে নিভৃতে। ছিলেন তিনি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংবাদিকতার জগতে চলমান কম্পিউটার, জীবন্ত কোষ। মেধা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে তিনি মফস্বলের একটি জেলা শহরে থেকেও জাতীয় ধারার সাংবাদিকতায় নিজেকে যেমন অধিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, তেমনি সাফল্য অর্জনও করেছিলেন। অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি ও সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সদা সর্বদা সোচ্চার। আর এই সাহসী প্রত্যয় যারা সহ্য করতে পারেনি, সেই দুর্বৃত্তরা তাঁকে এবং তাঁর ক্ষুরধার লেখনী মেনে নিতে পারেনি। আর তা পারেনি বলেই তাঁকে বুলেটের ঘায়ে স্তব্ধ করে দিয়েছে চিরতরে। ঘাতকরা এতই শক্তিধর ও প্রভাবশালী যে, তাদের টিকিটিও কেউ স্পর্শ করতে চায় না। বরং তাদের রক্ষা করাই যেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববানদের ব্রত। থেমে আছে কিংবা থমকে আছে দৈনিক জনকণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবলের নির্মম হত্যার বিচার। ১৫ বছর আগে ২০০০ সালের ১৬ জুলাইয়ের রাতে যশোরে জনকণ্ঠ অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় অর্থাৎ প্রতিবেদন লেখার মুহূর্তে ঘাতকদের বুলেট ঝাঁঝরা করে দেয় তার দেহ। আইনের মারপ্যাঁচে গত দশ বছর ধরে ঝুলে আছে মামলার বিচার প্রক্রিয়া। পরিবার এবং সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সরকারপ্রধান, স্পীকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে স্মারকলিপিও পেশ করা হয়েছে। আশ্বাসও মিলেছে। কিন্তু কাজের কাজ যে হচ্ছে, তা নয়। বরং এখানেও সেই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে ফেরে।

খুন হওয়ার প্রায় এক বছর পর ২০০১ সালে সিআইডি পুলিশ এই মামলায় ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এলে কয়েক আসামির আগ্রহে মামলার বর্ধিত তদন্ত করে নিহতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এক সাংবাদিককে নতুন করে আসামি করা হয়। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে বাদ দিয়ে সাক্ষী করা হয় আসামিদের ঘনিষ্ঠজনদের। এতে বিলম্বিত হতে থাকে বিচারের প্রক্রিয়া। অন্যদিকে দুর্বল হয়ে যায় চার্জশীট। এরপর বিতর্কিত ওই বর্ধিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০০৫ সালের জুন মাসে যশোরের স্পেশাল জজ আদালতে মামলার চার্জ গঠন করা হয়। ওই বছরের জুলাই মাসে বাদীর মতামত ছাড়াই মামলাটি পুনরায় দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এ অবস্থায় বাদী নিহতের স্ত্রী বিচারিক আদালত পরিবর্তন করে খুলনায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টে আবেদন করেন। যাতে বলা হয়েছিল, মামলার অন্যতম আসামি খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পলাতক। সেসহ মামলার অন্যান্য আসামির সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সখ্য রয়েছে। ফলে খুলনায় গিয়ে সাক্ষী দেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মামলাটি কেন যশোরে ফিরিয়ে দেয়া হবে না, সেজন্য সরকারের ওপর রুলনিশি জারি করে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে রুলনিশির জবাব না দেয়ায় সেই থেকে মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে। মামলায় চার্জশীটভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে প্রধান আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী হিরক পলাতক। অপর আসামি খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার ক্রসফায়ারে, কোটচাঁদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কালু হৃদরোগে এবং যশোর সদরের সন্ত্রাসী আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় মারা গেছে। বাকিরা জামিনে রয়েছে।

আইনজ্ঞদের মতে, উচ্চ আদালতের রুলনিশির কারণে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। সরকারের তথা এ্যাটর্নি জেনারেলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল রুল নিষ্পত্তি করে মূল বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। গত দুই যুগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১৮ সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনের হত্যার বিচার হয়েছে। বাকি হত্যাযজ্ঞের খুনীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। জনগণ প্রত্যাশা করে অচিরেই শামছুর রহমানসহ সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার করে আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখা হোক।