১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মধ্যবাড্ডায় শতাধিক টংঘর আগুনে পুড়ে ছাই

মধ্যবাড্ডায় শতাধিক টংঘর আগুনে পুড়ে ছাই
  • নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষগুলো সর্বস্বান্ত

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ঈদের ছুটির আমেজের মধ্যে সোমবার রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এক ভয়াবহ অগ্নিকা-ে শতাধিক টংঘর ভস্মীভূত হয়েছে। শতাধিক টংঘর, মেসবাড়ি, দোকানের সহস্রাধিক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসেছে এবং অনেকেই খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই নিয়েছে। নিম্নআয়ের কর্মজীবী মানুষগুলোর স্বল্প ভাড়ায় মাথাগোঁজার স্থান টংঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেলে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে আর্তনাদ আহাজারি করেন। ঈদের ছুটিতে অনেকেই গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন, যারা এসে দেখবেন তাদের মাথাগোঁজার একমাত্র অবলম্বন আর অবশিষ্ট নেই। আগুন লাগার পর ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ করে ঘর থেকে বের হয়ে এসে অনেকেই প্রাণে রক্ষা পান।

সোমবার দুপুর প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত ঘটলে দমকল বাহিনীর ১৬ ইউনিট আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর দুপুর প্রায় আড়াইটার দিকে অগ্নিকা-ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনে দমকল বাহিনী। ততক্ষণে মধ্য বাড্ডার ঝিলের ওপর খুঁটি পুঁতে গড়ে তোলা মেসবাড়ি, দোকান, টংঘরের আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করে ভস্মীভূত হয়ে ছাই হয়ে যায়। আকাশমুখী ধাবমান আগুনের লেলিহান শিখা ও ধোঁয়ার কু-লী পাকানো দৃশ্যে আশপাশের ভবনের মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অগ্নিকা-ের ঘটনায় রামপুরা ব্রিজ থেকে বাড্ডা লিংক রোড পর্যন্ত পশ্চিমাংশে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। অগ্নিকা-ের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির সঠিক বিবরণ কেউ জানাতে পারেননি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দমকল বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বেলা প্রায় সাড়ে বারোটায় ব্যাংক এশিয়া ও সিডিসিএল সিএনজি স্টেশনের পাশের গলিতে মধ্যবাড্ডার পুকুরপাড়ে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনার স্থলটির রাস্তা খুবই সরু, যাতে দমকল বাহিনীর গাড়িগুলো যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল সিডিসিএল সিএনজি স্টেশন থেকে অনুমানিক পঞ্চাশ গজ গলির ভেতরে। সেখানে আছে ভাই ভাই বোর্র্ডিং হাউস নামে দোতলা টিনের ঘর। তার বাঁ দিকে একটি দোতলা মেসবাড়ি। ডান দিকের দোতলা ভবনের নিচতলায় কয়েকটি দোকান। তার উপরে বোডিংয়ের বর্ধিতাংশ। আর বোর্ডিংয়ের পেছনে ঝিলের ওপরে খুঁটির ওপর মাচায় তৈরি পাঁচটি দোতলা কাঠামোয় শতাধিক টিনের টংঘর, যা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মধ্যবাড্ডায় আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার ব্রিগেডের ১৬ ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর বেলা সোয়া ২টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে সর্বগ্রাসী আগুন শতাধিক টংঘর ভস্মীভূত করে মানুষজনকে সর্বস্বান্ত করে পথে বসিয়ে দেয়।

আগুনের সূত্রপাত ॥ প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বলেন, বস্তির সামনে থাকা ফুচকার দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ঘটনার সময় ওই দোকানে ফুচকা তৈরি করা হচ্ছিল। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বস্তিবাসীদের কেউ কেউ। বস্তিতে আগুন লাগার সঠিক কারণ কেউ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও অগ্নিকা-ের সূত্রপাতের বিষয়ে ফুচকার দোকানের কথাই বলাবলি হচ্ছে। আগুন লাগার কারণ বিষয়ে স্থানীয় এক বাড়িওয়ালা মেহেদী হাসান বলেন, বস্তির পাশের ফুচকার দোকানের চুলা থেকে আগুন লেগেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় একটি চারতলা ভবনের বাসিন্দা ইরফান সাংবাদিকদের বলেন, আমি ঝিলপাড়ে একটি ফুচকার দোকানে আগুন জ্বলতে দেখি। পরে সেই আগুন টংঘর আর বোর্ডিং ও আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আগুনের শিখা অনেক উঁচু পর্যন্ত উঠে যাওয়ায় চারপাশের আবাসিক ভবনগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রগতি সরণির এক পাশে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। আশপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ জড়ো হওয়ায় তাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পাশের ভেনাস কমপ্লেক্স নামের একটি বহুতল ভবন থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয়। আগুনের তাপে ভাই-ভাই বোর্ডিংয়ের উত্তর-পশ্চিম পাশের ভবনগুলোর দরজা-জানালার কাচ ফেটে যায়। টাইলসও উঠে যায়।

টংঘরের বাসিন্দা হেলেনা বেগম নামের এক নারী বলেছেন, তার মেয়ে শিল্পী, ২ বছরের ছেলে আদিব ও ২ মাসের ছেলে আতিক। তাদের নিয়ে থাকেন টংঘরে। মোবাইল ফোনে মেয়ের কাছ থেকে আগুন লাগার খবর পান তিনি। দিকবিদিক হারা হয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখেন তার সবকিছুই পুড়ে ছাই। টংঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় ভেতরে ঢুকতে না পেরে কান্নাকাটি করতে থাকেন হেলেনা বেগম। আগুন নেভানোর পর তারা জানতে পারেন, সবাই জীবিত ও অক্ষত আছেন। তবে অগ্নিকা-ের সময়ে গিয়াসউদ্দিন রানা নামের এক মাইক্রোবাস চালক তার দুই মেয়ে ও স্ত্রীর কোন খোঁজ না পাওয়ার কথা জানান।

জমির মালিক কাউন্সিলর ॥ অগ্নিকা-ের পাশের খান মার্কেটের এক ব্যবসায়ী জানান, নিম্নআয়ের বহু কর্মজীবী মানুষ ওই সব টংঘরে থাকতেন স্বল্প ভাড়ায়। কয়েক বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা এসব স্থাপনার মালিকের দাবিদার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ওসমান গনি। কাঠ ও টিনের মেসবাড়ি ছাড়াও তৈরি করা হয়েছে টংঘরগুলো, যা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তবে কথা বলার জন্য ওসমান গনিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশও ওসমান গনিকে খুঁজছে বলে জানা গেছে।

বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, দেড় শতাধিক পরিবার টংঘরগুলোতে ভাড়া থাকতেন। ঈদে অনেকেই বাড়ি যাওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনাস্থলে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে এসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এ কারণে আগুন নেভাতে গিয়ে পানির যোগান পেতে সমস্যা হয়েছে। এখনও কোন হতাহতের খবর আমাদের জানা নেই।

ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে ॥ স্থানীয় সাংসদ একেএম রহমত উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, এখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে এখনে আর এভাবে স্থাপনা তৈরি না হয় সেই বিষয়টি দেখবেন তিনি। তিনি বলেন, এটি নিতান্তই একটি দুর্ঘটনা। কেন, কী জন্য হঠাৎ এতবড় একটি দুর্ঘটনা ঘটল তা বলা যাচ্ছে না। তবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা হবে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে রাস্তা বড় করা হবে। বিকেলে অগ্নিকা-ের স্থল পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

আহাজারি ॥ অগ্নিকা-ের ঘটনায় অনেকেই তাদের স্বজনদের খুঁজে না পেয়ে আর্তনাদ, আহাজারি, কান্না জুড়ে দেন টংঘরের বাসিন্দারা। তাদের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। আগুনের ভয়াবহতার মধ্যে অনেকেই তাদের স্বজনদের খুঁজে পাচ্ছেন না; এমনই অভিযোগকারী একজন হচ্ছেন হেলেনা বেগম। তিনি মধ্যবাড্ডার মোল্লাপাড়া এলাকায় থাকেন। ঘটনার পর থেকে তিনি তার মেয়ে শিল্পী ও দুই নাতিকে খুঁজে পাচ্ছেন না। তার বিলাপে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন উপস্থিত মানুষ। তবে অগ্নিকা- নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাপণের পর দেখা যায়, সবাই তাদের স্বজনদের খোঁজ পেয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছে কিংবা নিহত হয়েছেনÑ এমন অভিযোগ কেউ করেছেন বলে থানা, পুলিশ ও দমকল বাহিনীর কারও কাছেই নেই।

শিল্পীর স্বামী ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী। খবর পেয়ে তিনি হন্তদন্ত হয়ে বস্তিতে ছুটে এসেছেন। পাগলের মতো তার স্ত্রী শিল্পী ও দুই সন্তান আতিক (২ বছর) ও আবিরকে (২ মাস) খুঁজে ফিরছেন।

আরেক টংঘরের বাসিন্দা সায়রা বেগম (৫০)। তার দুই সন্তান শামীম (৬ বছর) ও রূপাকে (১ বছর) খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি। তিনি রামপুরা ব্রিজের ওখানে পান-সিগারেট বিক্রি করেন। ঘটনার সময় তিনি বস্তির ঘরে ঘুমিয়েছিলেন। আগুনের তাপে বস্তি থেকে দৌড়ে বের হয়ে এলেও তার মা সায়রা বেগম ও দুই সন্তানের খবর জানেন না। তিনি ঘটনার সময় ঘুমিয়েছিলেন। আগুনের তাপে ঘর থেকে বাইরে চলে এলেও অন্যদের খবর জানেন না। অগ্নিকা-ের পর তার মেয়ে শিল্পী ফোন করে বলেন, মা, আমাদের বস্তিতে আগুন ধরেছে। আমাদের ‘বাঁচাও-বাঁচাও’।

ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় করা হয়নি ॥ ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেছেন, কিভাবে আগুন লেগেছে সেটা এখনও আমরা নিশ্চিত নই। আগুনের ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি করা হবে। এখনও কেউ নিখোঁজ বা আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। অগ্নিকা-ের ঘটনায় এখনই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিকেল ৩টার দিকে অগ্নিকা-ের স্থল পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষ নিখোঁজের বিষয়ে যারা অভিযোগ করেছেন, তারা ফায়ার সার্ভিসের কাছে এ ধরনের অভিযোগ বা তথ্য দিলে আমরা তা খতিয়ে দেখব। আগুনের সূত্রপাত বিষয়ে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আগুনের সূত্রপাতের বিষয়ে বলা যাচ্ছে না।

ফায়ার ব্রিগেড কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী জানান, সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় ব্যাংক এশিয়া ও সিডিসিএল সিএনজি স্টেশনের পাশের গলিতে মধ্যবাড্ডা পুকুরপাড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার ব্রিগেডের ১৬ ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর দুপুর সোয়া ২টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।