১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি বেলা দ্বিপ্রহর...

  • ঈদে আসা শহুরে মানুষের কোলাহলে ভরপুর গ্রাম ফাঁকা হচ্ছে

সমুদ্র হক ॥ ঈদ ফুরিয়ে যাওয়ার সঙ্গেই নগর মহানগর, জেলা শহর ও গ্রাম ছেড়ে গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার পালা চলছে এখন। কবিগুরুর কবিতার মতো সুর- দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি বেলা দ্বিপ্রহর’....। ঈদে রাজধানী ফাঁকা হয়ে গ্রাম ভরে উঠেছিল। এবার গ্রাম ফাঁকা হয়ে রাজধানী ঢাকা ফের পূরণ হতে চলেছে। ফেসবুকে যারা স্টেটাস দিয়েছিলেন ‘আহা ঢাকা যদি সব সময় এমন ফাঁকা হতো’ তারা এখন কি স্টেটাস দেবেন! ঈদের কয়েকটা দিন কী সুন্দর না কাটলো। ফের কোলাহল এমন! এবারের ঈদের বড় বৈশিষ্ট্য হলো- গ্রামে ঈদের আনন্দেরও পালাবদল ঘটছে। একটা সময় ঈদে গ্রামে তেমন কোলাহল ছিল না। বর্তমানে যারা নগর মহানগর ও রাজধানীতে চাকরি করেন তারা ঈদে ছুটে যান গ্রামে। যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে ফিরে পান সেই চিরচেনা শৈশবকে যে স্মৃতি রেখে এসেছেন নিজ গ্রামে। একটা সময় সেই স্মৃতির পাতা মেলতেও গ্রামে সহসা যাওয়া হতো না।

বর্তমানে গ্রামে পাকা সড়ক, যোগাযোগে উন্নত ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়িত হয়ে নগর জীবনের মতো আলোকিত পথঘাট, বিনোদনের সকল সুবিধা থাকায় নগরের সঙ্গে গ্রামের সমন্বয় ঘটেছে। যাদের মোটরগাড়ি আছে তারা তো স্বচ্ছন্দেই ঈদে গ্রামে চলে যান। সাধারণ মানুষ বাস, কোচ ও ট্রেনে চড়ে মনের টানে ছুটে যান নিজ গ্রামে। পাবলিক পরিবহনও উন্নত হয়েছে। বছর দুয়েক আগেও ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সময় মহাসড়কে কি ভোগান্তি। যানজটে নাকাল হওয়া মানুষ গন্তব্যে পৌঁছেই বলাবলি করত, আর নয়। তারা এখন বলে উল্টো কথা। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে স্বস্তি পায়। প্রতিটি ঈদ নিজ গ্রামে ও নিজ শহরে উদযাপনের কথা বলে। একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে তা হলোÑ সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্রুততর ব্যবস্থা নিলে সমস্যার সমাধানও দ্রুত হয়। যেমন ঈদের আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়নে ভোগান্তি হয়নি তেমন। কখনও সময় যেটুকু বেশি লেগেছে তা ছিল সহনীয় মাত্রায়। ঈদের আগেও কখনও কিছুটা সময় লেগে যায়।

গরমের এই সময়টায় গ্রামে থাকতেও তেমন অসুবিধা হয় না। যারা ফ্যান চালিয়ে থাকতে অভ্যস্ত তারা গ্রামেও তা পান। যারা এয়ার কন্ডিশনারে (এসি) থাকেন তারা গ্রামের প্রকৃতিতে গাছ-গাছালির বাতাস পান তা মোটেও কৃত্রিম নয়। নদী তীরের বাতাস তো এসির চেয়েও অনেক শীতল। যে শীতলতায় থাকে প্রাণের আচ্ছাদন। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে কেবল সংযোগসহ রঙিন টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ওভেনসহ ইলেকট্রনিক্স পণ্য আছে। ডেক্সটপ কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব সবই মেলে। গ্রামের তরুণ তরুণীদের হাতেও আছে স্মার্ট ফোন। গ্রামের বধূ এখন আর হেঁসেলে (মাটির চুলা) লতাপাতা খড়ি ও তুস দিয়ে রান্না করে না। তারাও এখন লিক্যুফাইড পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের চুলায় রান্নায় অভ্যস্ত হয়েছে। গ্রামের জীবন মান এখন অনেক পাল্টে গিয়েছে। গ্রামের এই উন্নয়নের মধ্যে আসে ঈদ। শহর থেকে আত্মীয়স্বজন অতিথি গ্রামে গেলে শহুরে জীবনের ছায়া পায়। যেখানে সবই মেলে।

শহরে ঈদের আনন্দের যে আমেজ বর্তমানে গ্রামেও প্রায় একই। বরং গ্রামে বাড়তি আনন্দ মেলে। ঈদের নামাজের পর শহরের মানুষ এখন অনেকটা সময় ঘরে বসে কাটায়। অতিথি আপ্যায়ন করে। কখনও সেই অতিথিরাও ঘরে বসে কাটায়। গ্রামে যে যার মতো আনন্দে মেতে ওঠে। নদী তীরবর্তী এলাকায় নৌকায় তরুণ-তরুণীরা ঘুরে বেড়ায় আপন মনে। ঈদের সাজে ঘুরতে যায় দূরে কোথাও কোন চরে। গ্রামে হাডুডু খেলাসহ গ্রামীণ খেলার আয়োজন করা হয়। গ্রামের কোন স্কুলের মাঠে বসে ঈদমেলা। শহরের আত্মীয়স্বজন অতিথিদের জন্য গৃহস্থ ও কৃষক বাড়ির উঠানে নিজস্ব আঙ্গিকে আয়োজন করা গ্রামীণ অনুষ্ঠান। গাঁয়ের বধূরা অতিথিদের নিয়ে গীত গেয়ে নাচে। কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এমন সব চিত্রই চোখে পড়ে এবার।

গ্রামের তরুণ-তরুণীরা নানা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছে । একটি গ্রামে দেখা গেল শহরের মতো স্টেরিও সাউন্ডে গান বাজছে। চটুল কোন গান নয়। ‘নেশা লাগিল রে বাঁকা দু’নয়নে নেশা লাগিল রে...’ হাছন রাজার এই গানের সঙ্গে কয়েক তরুণ-তরুণী উঠানে স্বজনদের আপ্যায়ন করল ঈদের সেমাই দিয়ে। ঈদের আনন্দের প্রান ও উচ্ছ্বাস যে গ্রামেও আছে তা মনে করিয়ে দেয় এসব দৃশ্য। মধ্যবয়সী যারা এবার ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়েছেন তারা ফিরে পেয়েছেন সেদিনের সেই স্মৃতিময় দিন। যা তাদের টেনে নিয়ে যাবে অনেকটা সময়। সেদিনের গ্রামে যে ঈদ দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে যেত আজ সেই গ্রামেও ঈদের বাদ্য বাজে অনেক রাত অবধি...। এবারের ঈদে আনন্দের পালা শেষ হয়েছে এভাবেই। যে অধ্যায়ে রয়ে গেল ঈদের অনেক স্মৃতি...।