১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ৬ জনের মৃত্যু

  • দুটি মামলা, গ্রেফতার ২

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে প্রবল বর্ষণে পাহাড় ও দেয়াল ধসে আবারও ঘটেছে মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা। রবিবার ভোরে নগরীর লালখান বাজার ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার আমিন কলোনিতে পাহাড়ের মাটি ও দেয়ালচাপায় নিহত হয়েছে ৫ শিশুসহ ৬ জন। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাঁচাঘর তৈরি করে ভাড়া আদায়ের ব্যবসার বলি হতে হলো তাদের। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২ জনকে।

রবিবার রাত ২টার দিকে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ট্যাংকির পাহাড়ে আমিন কলোনিতে ধসে পড়ে একটি পাহাড়ের অংশবিশেষ। এতে মারা যায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে বসবাসকারী একই পরিবারের ৩ শিশু। তারা হলো- পাইপ মিস্ত্রি মোঃ শাহজাহানের দেড় বছর বয়সী কন্যা বিবি মরিয়ম, সালমা ও পুত্র আরাফাত হোসেন ফরিদ। ঘটনার পর মাটিচাপা থেকে উদ্ধার করে তাদের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এই পরিবারের সদস্যদের বাড়ি নোয়াখালী সদরের কাশিমপুর এলাকায়। তারা বায়েজিদ এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা অবৈধ বস্তিতে ঘরভাড়া করে বসবাস করে আসছিলেন।

নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা পোড়া কলোনি এলাকায় রবিবার দেয়াল ধসে মারা গেছে মা-মেয়েসহ তিনজন। এ ঘটনাটি ঘটে রাত দেড়টার দিকে। প্রবল বর্ষণে দেয়ালের ওপর চাপ পড়ে পাহাড়ের মাটি এবং একপর্যায়ে দেয়াল ধসে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘরের ওপর। এতে প্রাণ হারান ওই ঘরে বসবাসকারী সদস্যরা। তাদের নাম মরিয়ম বেগম (২৯), সুরাইয়া আক্তার (২) এবং প্রতিবেশী মেয়ে আঁখি নুর (৫)। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীবাহিনী ও স্থানীয় লোকজন তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে।

ঘটনার পর প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল জলিল ম-ল ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ অকুস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি পাহাড়ের পাদদেশ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন। পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বলেন, কিছু মানুষ নিজেদের লাভের জন্য পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর তৈরি করে ভাড়া আদায় করে থাকে। স্বল্প আয়ের মানুষ সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করে। এদের সকলকে সরে যাওয়ার জন্য দফায় দফায় মাইকিং করা হয়েছে। অনেক ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর উচ্ছেদও করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও সেখানে বসবাস গড়ে উঠছে। ফলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটছে। তারা বলেন, পাহাড়ে কোন অবৈধ স্থাপনা রাখা হবে না। বসবাসকারী সকলকে সরিয়ে দেয়া হবে।

পুলিশের মামলা ॥ নগরীর লালখান বাজার ও বায়েজিদ থানা এলাকায় পাহাড় ও দেয়াল ধসে প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছেন। বায়েজিদ থানায় রবিবার রাতে মামলা দায়ের করেন এসআই আবদুল হালিম। আসামি করা হয় ৫ জনকে। আসামিরা হলেনÑ মোঃ মঈন উদ্দিন, মোঃ রাসেল, মোঃ সোহেল, জয়নাল আবেদীন ও সাহাব উদ্দিন। এর মধ্যে শেষোক্ত দু’জনকে রবিবার রাতেই গ্রেফতার করা হয়। পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়েছিলেন ওই আসামিরা। বায়েজিদ থানার এএসআই নাছির উদ্দিন জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিএমপির খুলশী থানায় অপর মামলাটি দায়ের করেন এসআই রাসেল মাহমুদ। এতে আসামি করা হয় খোকন মিয়া (৪০) নামের একজনকে। তার বিরুদ্ধেও অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে। খুলশী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুকান্ত চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় যেখানে দেয়াল ধসের ঘটনা ঘটেছে সে জায়গার মালিক ওই খোকন।

চট্টগ্রামে প্রবল বর্ষণে প্রতিবছর পাহাড় ধসের ঘটনা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রাণহানি ঘটছে নিম্নআয়ের মানুষের। সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৭ সালের জুন মাসে। সেবার নগরীর বেশ কিছু পাহাড়ে একসঙ্গে ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ হারান ১২৭ জন। সর্বশেষ রবিবারের ৬ জনসহ গত ৮ বছরে পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছে ১৮৫ জন। জেলা প্রশাসন ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির হিসাব মতে, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে বসবাস করছে ৬৬৬টি পরিবার। এদের সরিয়ে নিতে নানা উদ্যোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঘুরে ফিরে স্বল্প আয়ের মানুষগুলো আশ্রয় নিচ্ছে কোন না কোন পাহাড়ে। এলাকার ভূমিদস্যু প্রকৃতির কিছু মানুষ লাভের আশায় পাহাড় কেটে তৈরি করে যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাঁচাঘর। আর স্বল্প আয়ের মানুষগুলো কম ভাড়ার জন্য সেখানে বসবাস করছে।

চট্টগ্রামে প্রতিবছরই বর্ষার পূর্বে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে দেয়ার তোড়জোড় দেখা যায়। মাইকিংও করা হয়। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযানও শুরু করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে কার্যক্রম আর সম্পন্ন হয় না। ভারিবর্ষণ একটানা কয়েক দিন চলতে থাকলে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে। এতে মাটির নিচে চলে যায় কাঁচাঘরগুলো। ফলে প্রাণহানি ঘটে শ্রমজীবী পরিবারের সদস্যদের। এবারও বেশ হাঁকডাক ছিল। পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও বসবাসকারীদের সরিয়ে দেয়ার তৎপরতাও সংবাদমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এরপরও পাহাড়ে যে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ঠিকই ছিল এর প্রমাণ হলো ৬ জনের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, পাহাড় ও দেয়াল ধসের কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটির সদস্য করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ ইলিয়াছ হোসেনকে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সরিয়ে দিতে এক ধরনের অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এলাকাগুলোতে প্রশাসনের উদ্যোগে মাইকিং চলছে। নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা বসতঘরগুলো থেকে লোকজনদের সরিয়ে দিতে তৎপর হয়েছেন। তবে স্থায়ী কোন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় জীবন ঝুঁকি সত্ত্বেও বসবাসকারীরা পাহাড় থেকে সরতে চাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো থেকে ২শ’ পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঈদের সময় এ তৎপরতা সাময়িক বন্ধ থাকে। তিনিও পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা ঘরগুলো মালিকদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন।