২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছিটমহলে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে ঈদ উৎসব পালন

রাজু মোস্তাফিজ, কুড়িগ্রাম থেকে ॥ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় মধ্য দিয়ে ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করেছে সদ্য বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত ভারতের ১১১টি ছিটমহলের অধিবাসীরা। এ ছিল অন্যরকম আনন্দ অনুভূতি। এতদিন তাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে অবরুদ্ধ জীবন-যাপন করতে হয়েছে। এই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিজের মতো করে, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয় ঈদ। কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে ঈদের দিন সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় সবার মাঝে ছিল আনন্দ-উল্লাস। ঈদ এবং স্বাধীনতা লাভের আনন্দ দুটি মিলে একাকার হয়ে গেছে। ছোট শিশু থেকে শুরু হরে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার মুখের হাসির ঝিলিক বলে দেয় এ আনন্দের শেষ নেই। এ ছিটমহলে ৯টি জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও বিশ্বের শান্তি কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয় ঈদের জামাতে।

অবরুদ্ধ জীবনের মুক্তির পর এই প্রথম ঈদ উদযাপন করল কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ১০টি, ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়াসহ বাংলাদেশের ১১১ ছিটমহলবাসী। ছিটমহল বিনিময়ের আনন্দের সঙ্গে ঈদ আনন্দ স্বপ্নে ভাসাচ্ছে তাদের। উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে সকালে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সীরা নতুন জামা কাপড় পরে আসে ঈদগাহ মাঠে। দাসিয়ারছড়ায় ৯টি ঈদগাহ মাঠে ৯টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ছিটমহলে ঈদ-উল-ফিতরের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৯টায় মধ্যপাড়ার মোস্তফার বাড়ি সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে। ভূরুঙ্গামারীতে অনুষ্ঠিত হয় ১০টি জামাত।

স্বামীর জেদের কাছে

হার স্ত্রীর

এ রহমান মুকুল, পঞ্চগড় থেকে জানান, অবশেষে স্বামীর জেদের কাছে হার মানল স্ত্রী লক্ষী রানী। বৃদ্ধ বাবা, ভাই আর স্ত্রীর শত আকুতি-মিনতির পরও পলাশ চন্দ্র তার সিদ্ধান্তেই অটল। জনগণনার শেষ দিনেও বৃদ্ধ বাবা বিজয় চন্দ্রের অনুরোধে জনগণনা প্রতিনিধি দল পলাশের বাড়িতে গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পলাশ সকলকেই সাফ জানিয়ে দেয় ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য পরিবারসহ যে আবেদন করেছে তার কোন পরিবর্তন হবে না। ছেলে, বউমা আর নাতি-নাতনি নিজের জন্মভূমি ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছে এমন কথা শুনে বৃদ্ধ বাবা নাওয়া-খাওয়াই বাদ দিয়েছেন। এখন শুধু চোখের জল ফেলছেন আর প্রলাপ বকছেন। পলাশ চন্দ্র ছাড়াও বিজয় চন্দ্রের আরও তিন ছেলে, দুই মেয়ে রয়েছে। মেয়ে দুটির বাংলাদেশেই বিয়ে দিয়েছেন। তারা কেউই ভারতে যাওয়ার জন্য আবেদন করেনি। সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত গারাতী ছিটমহলে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে এমনটাই দৃশ্য দেখা গেছে। বাড়ির উঠোনে বেঞ্চে বসা পলাশের বাবা বিজয় চন্দ্র সাংবাদিক পরিচয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পোলাডার মাথা খারাপ হইছে। কতো বোঝালাম কারও কোন কথা শুনলো না। বউটাও বিদেশ-বিভুয়ে (ভারতে) যেতে চায় না। শুধু কান্নাকাটি করছে। ছিটমহলের নাগরিক হলেও এদেশেই আত্মীয়-স্বজন সকলেই আছে। ওই দেশে (ভারতে) আমাদের কেউ নেই। কার বুদ্ধিতে পোলাডা বউমা আর দুই নাতি-নাতনিরে লইয়া ভারতে যাওয়ার ফরমে সই করলো ভগমান ছাড়া কেউ জানে না। বিজয়ের ছোট ছেলে আপন রায় জানায়, এখানেই জন্ম, বেড়ে ওঠা। এতদিন নাগরিকত্বহীন থেকেও ভারতে যাইনি। এখন বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারছি, কি করে ভারতে যাই আপনি বলুন। পলাশের আরেক ছোটভাই দুলাল জানায়, হিন্দু বলেই কি ভারতে যেতে হবে এটা কোন কথা, কই ভারতের ছিটমহলের একজন মুসলমানও তো এদেশে আসছে না। আমরা কেন যাব। বাংলাদেশটাত আমারও। জন্মগতভাবে ছিটবাসী ছিলাম এখন বাংলাদেশী।

জনগণনার শুরুতে পলাশসহ ১৮ জন ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন করলেও পরবর্তীতে ১০ জনই সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এদেশে থেকে যাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু পলাশ ও দ্বিজেন নামে দুজন তাদের স্ত্রী ও সন্তানসহ মোট আটজন এখন ভারতে যাচ্ছেন মর্মে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।