১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ইঙ্গিত নতুন মুদ্রানীতিতে

  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব;###;আগামী সপ্তাহে নয়া মুদ্রানীতি ঘোষণা

রহিম শেখ ॥ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মেয়াদে নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে নয়া মুদ্রানীতিতে। এছাড়া ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং সরকারী চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতি যাতে না বাড়ে সেদিক বিশেষ বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দেয়া হবে। যদিও ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবারও মুদ্রানীতিকে সংকোচনশীল বা সম্প্রসারণমুখী নয়, বরং সতর্ক মুদ্রানীতি বলা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ইতোমধ্যে এ মুদ্রানীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গবর্নর, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেয়া হয়েছে। মতামত নেয়া হচ্ছে সর্বসাধারণেরও। এ জন্য জুনের শুরুতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মন্তব্য নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে নতুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই নীতি ঘোষণা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাজারে ঋণের চাহিদা বাড়াতে ঋণের সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। ঋণের চাহিদা সৃষ্টিতে এসএমইর মতো আরও কিছু খাতকে এবার বেছে নেয়া হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিময় হারের প্রণোদনা দেয়া হবে। এবারের বাজেটে মোট দেশজ আয়ের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে এবারের মুদ্রানীতিতে এর প্রতিফলন আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, গতানুগতিক ধারায় এবারও মুদ্রানীতিকে সংকোচনশীল বা সম্প্রসারণমুখী কোনটাই বলা হবে না। বেসরকারী ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ গতিশীল করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল নেয়া হয়েছে। মূলত মুদ্রানীতির ভঙ্গি হবে অনেকটা ভারসাম্যমূলক। তিনি জানান, ইতোমধ্যে মুদ্রানীতির সবকিছু প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে চলতি অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই নীতি ঘোষণা করা হচ্ছে। বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর নানামুখী যে সব প্রস্তাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে অর্থপ্রবাহের মাধ্যমে এগুলো উৎসাহিত করা হবে।

বাংলাদেশ সূত্র বলছে, এবারের মুদ্রানীতির ভঙ্গি বিগত মুদ্রানীতির মতোই সতর্ক। নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য এ মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রেখে রফতানি খাতসহ উৎপাদনমুখী কর্মকা-ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন প্রবৃদ্ধিতে গতিশীলতা আনবে। এতে পুঁজিবাজারে স্বস্তি, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নে আস্থা ও উৎসাহ যোগানে অবদান রাখবে। ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ব্যবসায়ীরা ঋণের সুদের হার কমানোর কথা বলছে। তাদের দাবি, সুদের হার বিনিয়োগে বড় বাধা।

সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার কমানো হলেও বর্তমানে ঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের চেয়ে কমেছে। ফলে তাদের দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। মুদ্রানীতির ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল জনকণ্ঠকে বলেন, এবারের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ঋণ প্রবাহ বাড়ানো এবং শেয়ারবাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশেষ করে বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, মুদ্রানীতি বিনিয়োগের একটি উপাদান। অন্যান্য উপাদানগুলো ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন জরুরী। অন্যদিকে মুদ্রানীতির ঘোষণায় মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে হবে।

জানা গেছে, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে বাড়ানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন ও সাপ্তাহিক ভিত্তিতে রক্ষিত নগদ জমার হার। পাশাপাশি বর্তমান ও আগামীর পূর্বাভাস মাথায় রেখে মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারী ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ। কিন্তু প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে চায় না। ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে বেসরকারী খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ১৫ শতাংশ নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু সূত্র বলছে, ১৩ শতাংশের বেশি অর্জন হবে না। ফলে আগামী ৬ মাসেও ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকছে। প্রসঙ্গত কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিবছর দুই দফায় আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। অর্থবছরের শুরুতে প্রথম ছয় মাসের জন্য। এই ছয় মাস শেষ হলে পরবর্তী ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। প্রথম ছয় মাসের অবস্থা দেখে পরবর্তী ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে কিছু সংশোধনী আনা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতি এমন এক সময় ঘোষণা করতে যাচ্ছে, যখন বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড় জমেছে।