২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্ষমা? কিসের ক্ষমা?

  • দাউদ হায়দার

দেখতে খুবই সুবেশ, মাথার চুল ধবধবে শাদা। শরীর-স্বাস্থ্যে এখনো টানটান, সটান হাঁটাচলা, কে বলবে অস্কার গ্র্যোয়েনিঙের বয়স চুরানব্বই। বার্ধক্যের ছাপ নেই, সবেমাত্র প্রৌঢ় যেন।

অস্কার গ্র্যোয়েনিঙ সুভদ্র মুখোশে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, প্রতিবেশীরা জানেন, অতিশয় অমায়িক মানুষ তিনি, কারোর সঙ্গে বিবাদ করেন না, বরং প্রত্যেকের জন্যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

পরোপকারী হিসেবেও সুনাম। এই অস্কার নাকি মারা গেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, মার্কিন বন্দিশিবিরে। অতএব, তাঁর তালাশ কে করে, বিশেষত নাতসি বাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিক।

বন্দিশিবিরে যে সৈনিক মারা যান, তাঁর নাম অস্কার গ্র্যোয়েলিংঙ। দুই অস্কারের পদবীর বানানে এন এবং এল-এর হেরফের। যেহেতু যুদ্ধের একমাস পরে মার্কিন বন্দিশিবিরে (মিউনিখে) মারা যান গ্র্যোয়েলিংঙ, কি করে, মার্কিন সেনা পাহারা থেকে গ্র্যোয়েনিঙ পলাতক, রহস্য বৈ কী। গ্র্যোয়েনিঙ চলে যান চিলির সান্তিয়াগোয়। সত্তর দশকে ফেরেন পশ্চিম জার্মানির ল্যুয়েনেবুর্গে, ভিন্ন নাম নিয়ে।

তাঁর আসল বাড়ি কাসেলে। ল্যুয়েনেবুর্গে ছিলেন বহালতবিয়তে। জাল নামে, জাল পাসপোর্টে। চাকরি করেছেন ব্যাঙ্কে, বড়ো পোস্টে। তিন বছর আগে (২০১২ ) ওই ব্যাঙ্কে টাকা (ইউরো ) তুলতে গিয়েছিলেন ফ্রাউ (মিসেস) হেডি ব্যোম, বয়স তাঁর ৮৭। তিনি ইহুদি। মূল বাড়ি হাঙ্গেরি। এখন ল্যুয়েনেবুর্গের বাসিন্দা, জার্মান নাগরিক। ছিলেন পোল্যান্ডের ভয়ঙ্কর নাতসি ক্যাম্পে, আউসভিতসে।

ফ্রাউ ব্যোম তখন কচি, অল্প বয়স্কা। দিব্যি মনে আছে তাঁর কার কি রকম চেহারা। অস্কার গ্র্যোয়েনিঙের পেছনে লাগেন, গোপনে গোয়েন্দাগিরি করেন। এমনকি, মায়ায় জড়িয়েছেন, ভাব দেখান। এতেও কাজ হয় না অবশ্য। কিন্তু হেডির মনে ছিল অস্কারের চালচলন, মেজাজ, চাহনি, চলাফেরার ভঙ্গি।

হেডি চ্যালেঞ্জ করেন অস্কারকে। কেসও ঠুকে দেন আদালতে। অতঃপর অস্কারের নাড়িসুদ্ধ টানাটানি।

বেরিয়ে আসে এই অস্কারই আউসভিতসের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে দারোয়ানগিরিই কেবল করেননি, হত্যায় সহায়তা করেছেন, কতজনকে হত্যা করা হতো প্রতিদিন, নথিপত্রে সংখ্যা কমিয়ে লিখতেন, এবং মৃতদেহ চালান করার দায়ও ছিল তাঁর। যদিও তিনি একজনকেও স্বহস্তে হত্যা করেননি, কিন্তু তাঁর মূল দায়িত্ব পালন করেননি, মিথ্যাচার করেছেন। যমের সাগরেদ।

আদালত বলছেন, ঠিক। অস্কার গ্র্যোয়েনিঙ অবশ্যই দোষী, হত্যাকারীর সহযোগী। ক্ষমা নেই। কিসের ক্ষমা? কেন ক্ষমা? কেন বাধা দেননি একজন হত্যাকারীকেও? তার মানে, তাঁরও সায় ছিল।

অতএব দোষী। শাস্তি পেতেই হবে। বয়স বিচার্য নয়। অপরাধ করেছেন ১৯৪২-৪৪ সালে, বিচার তখনকার। আজকের নয়। আউসভিতসে, হাঙ্গেরির সাড়ে তিন লাখের বেশি ইহুদি হত্যা করা হয়।

অস্কারের চোখের সামনেই। অস্কার চোখ বন্ধ করেননি, বাধা দেননি টু শব্দেও।

অস্কার গ্র্যোয়েনিঙ ছিলেন ব্যাঙ্কের হিসাবরক্ষক। ওই চাকরি বাদ দিয়ে আউসভিতসের হত্যাপুরী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যোগ দেন, স্বইচ্ছায়।

আদালত বলছেন, প্রত্যক্ষ হত্যাকারীর নীরব দর্শক, সমর্থকও ক্ষমার অযোগ্য, কেন ক্ষমা?

দোষ কবুল করেছেন অস্কার, ক্ষমাও চেয়েছেন কৃতকর্মের। আদালতের বয়ান, ফালতু কথা ছাড়ো, তখন অপরাধ করার সময় এসব মনে হয়নি। শেষ বয়সে প্রায়শ্চিত্ত? —- না। চার বছরের জেল। জেলে যাও। ক্ষমা নেই। মানবতাবিরোধী অপরাধ আরো প্রমাণিত হলে আরো জেল। জেলে মরো।

(বিচার ও রায় ১৫ জুলাই ২০১৫। ফ্রাঙ্কফুর্টের আদালতে।)

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধীর বিচারে আদালতের বিচারকরা মাঝে মাঝেই কেন বিব্রতবোধ করেন, আল্লাহই জানেন। আমি নাপাক, জ্ঞানপাপী, বেশি বললে গুনাহ, হেজাবিদের ফতোয়ায়।

গত মাসে ফিলাডেলফিয়ায় বক্তৃতাশেষে কয়েকজন কৌতূহলী বাঙালি ঘিরে ধরেন, হলের বাইরে।

প্রশ্ন করেন নানাদেশে হালের ইসলামি জঙ্গিপনা নিয়ে। উস্কানিমূলক প্রশ্ন। সঠিক কিছু বললে ঝামেলা।

সত্যরে লও সহজে, কেউ নেবে না। তৈত্তরীয় উপনিষদে আছে, সত্যের শত্রু ঘরে-ঘরে। তো, জ্ঞানপাপী জানে, ধর্মান্ধরা যুক্তিটুক্তি মানে না, শোনে না। শোনার জ্ঞানবুদ্ধি নেই। বলি, আপনারা যাকে ইবলিশ বলেন, আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান দিয়েছেন, বুদ্ধি দিয়েছেন। ইবলিশ বোধহয় ভালোমন্দের বিচার জানেন। অতএব ঘাঁটাবেন না।

দুইজন খুব উত্তেজিত। ঘুরিয়েফিরিয়ে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন। দুয়েকজনের নিশ্চয় অজানা, মাতাল আর মোরগ (বা মুরগী ) কখনো গাড়ির নিচে চাপা পড়ে না, ঠিকই এঁকেবেঁকে, কায়দামতো বেরিয়ে যায়। গেলুম। অতঃপর প্রশ্ন, স্বাধীনতার চার দশক পরেও কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাম্য?

যদি অন্যায় করে থাকে, ইসলামের দৃষ্টিতে ক্ষমা করা উচিত নয় কী? রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ি।

ক্ষমা? কিসের ক্ষমা? কেন ক্ষমা? হত্যার ক্ষমা কোন ধর্মে? কে বিধান দিয়েছেন? যিনি দিয়েছেন তিনিও হত্যাকারী। ঘোরতর পাপী।

আরো যুক্তি ছিল, ইসলামসহ নানা ধর্মের যুক্তিতে। কিন্তু চোরা শোনে না ধর্মের কাহিনী।

যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধীদের বিচার নিয়ে হেজাবিরা, হেজাবির চ্যালা-শাগরেদরা, যারা হাড়েমজ্জায় খুনি, বদমাইশ, এখনো ঘোঁট পাকাচ্ছে, ফন্দি আঁটছে, দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্রে মশগুল, শ্যাখের বিটি হাসিনা কারোর চোখ রাঙানি, ধমকিধামকি, হুমকি পরোয়া করেন না। শ্যাখের বিটি আছেন বলেই বাংলাদেশ এখনো টিকে, মাথা উঁচু করে সটান। হেজাবিদের পাল্লায় পড়ুন, হেজাবিরা ক্ষমতায় আসুক, জানবেন কবরের মাটি দিয়ে কত তলা মসজিদ বানায়।

মানুষ হত্যা, মানবতাবিরোধীদের কোনো ছাড় নেই, রেহাই নেই। হিসেবে রাখুন জার্মানির বিচার।

সেই কবে, সাত দশক পেরিয়েছে, হিটলারের গেস্টাপো, নাতসিদের বিচার এখনো বহাল। ক্ষমা নেই।

কিসের ক্ষমা? কেন ক্ষমা? সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখুন।

লেখক : কবি, বার্লিন থেকে