১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেয়ালের শহরে

  • মিলু শামস

‘বার্লিনে বিকেল সাড়ে চারটা, লন্ডনে সাড়ে তিন, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে নিরেট হোটেল-প্রাসাদ, নির্জন গম্ভীর। হোটেলের ভেতরে আছেন বুড়ো এক ভদ্রলোক। এঙ্গুলেস, মার্সেলেস, ঘেন্ট এবং ডোভারের সবাই ভাবছেন : ভেতরে কি করছেন উনি? তিনটার বেশি বেজে গেল, বেরোচ্ছেন না কেন? তিনি লাউঞ্জে বসে আছেন। ঘরের দরজা জানালা ভেজানো। মোটা ভ্রুর নিচে উদাস চোখ, শূন্যদৃষ্টি, ঠোঁট একটুখানি ফাঁক করা, যেন প্রাচীন কোন স্মৃতির মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন। না, এখন উনি পড়ছেন না- হাতে, বার্ধক্যে রেখাজীর্ণ হাতে ধরে আছেন কতগুলো টাইপ করা কাগজ। কাগজগুলো ঝুলে পড়েছে হাঁটুর নিচে। হোরেস উইলসনের দিকে উনি ফিরে তাকালেন, বললেন, ‘কটা বাজে’? ‘প্রায় সাড়ে চারটা।’ হোরেস উইলসন বললেন। বুড়ো ভদ্রলোক বড় বড় চোখ মেলে তাকালেন, হাসলেন সহজ অন্তরঙ্গ হাসি, বললেন ‘ভীষণ গরম।’ সমস্ত ইউরোপে নেমে এসেছে রক্তিম অস্থির গুমোট গরম। গরম মানুষের হাতে, চোখের তারায়, কণ্ঠনালীতে এবং উত্তাপে ধুলোয় আর ভয়ে আধমরা অপেক্ষা করছে তারা। হোটেলের এক কামরায় অপেক্ষা করছেন সাংবাদিকরা।’

ফরাসী অস্তিত্ববাদী দার্শনিক-সাহিত্যিক জ্যাঁ পল সার্ত্র-এর তিন পর্বের বিখ্যাত ঊপন্যাস ‘রোডস টু ফ্রিডম’-এর দ্বিতীয় পর্ব ‘দ্যা রিপ্রাইভ’ শুরু হয়েছে এভাবে। ঊনিশ শ’ আটত্রিশ এর তেইশ সেপ্টেম্বর বিকেলের খ-চিত্র দিয়ে। গোটা ইউরোপ মিউনিখ সম্মেলনের ফল জানতে উদগ্রীব। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের থিম হিসেবে বিশ্বযুদ্ধ যেভাবে এসেছে, এককভাবে আর কোন বিষয় সম্ভবত এভাবে আসেনি। জ্যাঁ পল সার্ত্র, গুন্টার গ্রাসদের মতো সাহিত্যিকের লেখা, স্টিফেন স্পিলবার্গ কিংবা রোমান পোলানস্কির মতো চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এত বছর পরও সুস্থ চিন্তার যে কোন মানুষকে আলোড়িত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশেষ করে নাৎসি নৃশংসতা সম্পর্কে ভাবমূর্তি তৈরি করেছে মূলত চলচ্চিত্র। ওই ভাবমূর্তি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনাকারী দেশ জার্মানি- এ ঐতিহাসিক তথ্য মনে রেখেও ওদেশের মাটি স্পর্শ করে সচেতন মানুষের মনে পড়বে জার্মানি শুধু হিটলার আর নাৎসি বাহিনীর জন্মস্থান নয়। এদেশ জন্ম দিয়েছে গ্যেটে, শিলার, কান্ট, হেগেল, শোপেন হাওয়ার, কার্লমার্কস, আইনস্টাইনের মতো ব্যক্তিত্ব।

সার্ত্রের উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগমনীর যে গুমোট আবহের বর্ণনা রয়েছে এক বছর পর তা বিস্ফোরিত হয়ে ছ’বছর স্থায়ী হয়। উপন্যাসে শুধু নয়, বাস্তবেও। যুদ্ধ শেষে রাজধানী বার্লিনসহ গোটা জার্মানি বিধ্বস্ত, ল-ভ-। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সত্তর বছর পুরো হলো এ বছর আট মে। এর এক মাস দশ দিন পরের বার্লিনের আকাশ-বাতাস নিঃসন্দেহে অন্যরকম। জার্মানির ষোলটি স্টেটের মধ্যে সবচেয়ে বড় শান্ত সৌম্য অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সাজানো আজকের বার্লিন দেখে কল্পনা করাও অসম্ভবÑ দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধে দেউলে হয়েছিল এদেশ। আট শ’ একানব্বই দশমিক আট স্কয়ার কিলোমিটার আয়তনের রাজধানী শহরে জনসংখ্যা তিন দশমিক পাঁচ মিলিয়ন বা পঁয়ত্রিশ লাখ। শহরের ব্যস্ততম এলাকায় গিয়েও মনে হয় সবুজে ছাওয়া নির্জন গাঁয়ের পথে হাঁটছি। রাজধানী শহর যে এত সবুজ আর নির্জন হতে পারে জানা ছিল না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বড় গাছের বাগান, সাজানো জঙ্গল, পার্ক, লেক। সাড়ে চার লাখ গাছ আছে এ শহরে। প্রতিটিতে নম্বর সাঁটা। সযতœ মনোযোগের ছোঁয়া। শহরের তিন ভাগের এক ভাগ জুড়ে গাছপালা, পার্ক, লেক। এভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে। মানুষের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, ট্রাফিক জ্যাম, কালো ধোঁয়াÑ যা নিয়ে ঢাকায় আমাদের নিত্য বসবাস তার সঙ্গে এদের পরিচয় নেই। রাস্তায় মানুষের মতো গাড়িও প্রায় হাতে গোনা। এখন গরম। ঘর ছেড়ে বাইরে আসার সবচেয়ে ভাল সময়। তাতেই এরকম। আট শ’ একানব্বই দশমিক আট স্কয়ার কিলোমিটারে পঁয়ত্রিশ লাখ মানুষ বাস করলে চিত্রটা এমন হওয়াই স্বাভাবিক। ঢাকাবাসীর পক্ষে যা কল্পনা করাও কঠিন। ঢাকার আয়তন একশ’ পনের দশমিক আট স্কয়ার কিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় দু’কোটি। একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশের রাজধানীর সঙ্গে উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন দেশের রাজধানী শহরের কত পার্থক্য! সত্তর বছর আগে বিধ্বস্ত একটি দেশ ও তার ধুলোয় গুঁড়িয়ে যাওয়া রাজধানী মেরুদন্ড সোজা করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় পৌঁছে গেছে। আর তার দু’বছর পর প্রত্যক্ষ উপনিবেশমুক্ত ভারত, একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা লুটপাট, দখল-আধিপত্যে দীর্ণ। পরোক্ষ উপনিবেশের অদৃশ্য শৃংখলে আটকে ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে প্রভুর পদলেহন করছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানি ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে ভয়ঙ্কর রকম বিপর্যস্ত হয়েছিল। জনজীবনে নেমেছিল তীব্র সংকট। জার্মানিকে পঙ্গু করে রাখতে ফ্রান্স এক হাজার একশ বিশ কোটি পাউন্ডের বেয়াল্লিশটির বাৎসরিক কিস্তি ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল। পরে মিত্র দেশগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয় ছয় শ’ কোটি পাউন্ড। সময় মতো কিস্তি শোধ করতে না পারায় ফ্রান্স জার্মানির কয়লা, লোহা ও ইস্পাত উৎপাদনে শতকরা আশি ভাগ এলাকা দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছিল জার্মানির অর্থনীতি। সে অবস্থা থেকে আজকের অবস্থায় ফিরতে পারার মূল কারণ অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে তারা ছিল পুরোপুরি স্বাধীন। কোন প্রভুর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন দেশগুলোর ট্র্যাজেডি হলো তাদের স্বাধীনতা শুধু ভৌগোলিক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাও বিকৃত। বার্লিনের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিল তিল ভালবাসা ও মমতা দিয়ে নির্মিত এ শহর। আবাসিক এলাকার ভবনগুলো এক মাপের। একটার সঙ্গে অন্যটা লাগানো। দুই ভবনের মাঝখানে মেথর প্যাসেজ বা ফাঁকা জায়গা নেই। একটার দেয়াল থেকে পরেরটা শুরু। এভাবে টানা পঞ্চাশ-ষাটটি ভবন এক সারিতে। আবহাওয়ায় শীতের প্রাধান্যই সম্ভবত এর কারণ। প্রতিটি বাড়ির সামনের ছোট বারান্দাজুড়ে টবে সাজানো উজ্জ্বল রঙের ফুল। ফুলগুলোও মনে হয় একই মাপের, একই রঙের। পাঁচ ছয় তলার ওপরে আবাসিক ভবন চোখে পড়ে না। বাণিজ্যিক এলাকায় কিছু আছে তাও তেমন প্রকট নয়। শহরের মধ্যে বয়ে যাচ্ছে লেক। পানসি নৌকার ধাঁচে বড় নৌকা ভাসছে তাতে। এমনই এক লেকের পাড়ে গাছপালায় ছাওয়া ছোট পার্কে মার্কস-এঙ্গেলস-এর বিশাল ভাস্কর্য। মার্কস বসে আছেন, পাশে এঙ্গেলস দাঁড়িয়ে। এঁদের দর্শন ও তত্ত্বকে ভিত্তি করে রাশিয়ায় যে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হয়েছিল তার রেড ফোর্সের কাছে নাৎসি বাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছিল। যুদ্ধ শেষে পরাজিত জার্মানি পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ভাগ হয়। ভাগ হয় গোটা ইউরোপ পুব ও পশ্চিমে। পুবের অংশ সমাজতান্ত্রিক, পশ্চিম পুঁজিবাদী। এ বিভাজন বিভক্ত করে বার্লিনকেও। বিভাজনের সীমানা স্পষ্ট করতে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ পুব ও পশ্চিম বার্লিনের মাঝে যে দেয়াল তুলেছিলেন তাকে কেন্দ্র করে ঊনত্রিশ বছর দু’শিবিরে ঠা-া লড়াইয়ের পর ভেঙ্গে যায় বার্লিন দেয়াল। আবার এক হয় দুই জার্মানি, ঊনিশশ’ নব্বই সালে। বার্লিনকে নতুন সাজে পুনর্বিন্যাস করা হয় মূলত নব্বইয়ের পর। অখ- বার্লিনে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে জায়গায় জায়গায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালের খ-াংশ। উচ্চতা খুব বেশি নয়। দেয়ালের গায়ে গ্যালারির মতো সাঁটা আছে সে সময়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তের নানা ছবি ও লেখার কপি। কোথাও পেইন্টিং করে দেয়ালের খ-টিকেই দেয়া হয়েছে শিল্পিত রূপ। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের পদচারণায় ইতিহাস এখানে জীবন্তই থাকে মনে হয়।

ইতিহাস ধরে রাখা আছে এখানকার মিউজিয়ামগুলোতেও। স্প্রী নদীর উত্তরে পাঁচটি আন্তর্জাতিক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মিউজিয়াম নিয়ে বার্লিনের বিখ্যাত ‘মিউজিয়াম আইল্যান্ড’ কমপ্লেক্স। গ্রীক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, ওসমানিয়া সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের নানা নিদর্শন, ভাস্কর্য, পেইন্টিং ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ মিউজিয়াম আইল্যান্ড খুঁটিয়ে দেখতে লেগে যায় প্রায় পুরো দিন। যুদ্ধ জয়ের সূত্রে বা অন্যভাবে বিভিন্ন দেশের পুরাকীর্তি, ভাস্কর্য, স্থাপত্য নকশা ইত্যাদি এনে এরা নিজেদের মিউজিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। পাঁচটি মিউজিয়ামের মধ্যে ‘পারগামন’-এর নাম বেশি শোনা যায়। এখানে একটি কর্ণারে রয়েছে ব্যাবিলনের ‘ইশতার গেট’। লম্বা কিউতে দাঁড়িয়ে দশ-বারো জনের গ্রুপ করে ভেতরে ঢুকতে হয়। এক গ্রুপ মিউজিয়াম থেকে বেরুলেই কেবল আরেক গ্রুপ প্রবেশাধিকার পায়। যে জন্য মিউজিয়ামের ভেতরটা থাকে ফাঁকা ফাঁকা। দর্শকের দেখার সুবিধার জন্য এ ব্যবস্থা।

মিউজিয়াম আইল্যান্ড ছাড়াও ছোট ছোট আরও অনেক মিউজিয়াম কমপ্লেক্স রয়েছে এ শহরে। বার্লিনকে সিটি অব মিউজিয়ামও বলে। সিটি অব কালচার, সিটি অব পলিটিক্স, সিটি অব মিডিয়া এ্যান্ড সায়েন্সÑনানা অভিধা রয়েছে এ শহরের। সবখানে দর্শকের সরব উপস্থিতি। কিন্তু কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই।

সবচেয়ে বেশি মুখর সম্ভবত ব্রান্ডেনবুর্গ গেট। নিওক্লাসিক্যাল ঘরানার আর্কিটেকচারে নির্মিত ব্রান্ডেনবুর্গ গেট জার্মানির সবচেয়ে পরিচিত ল্যান্ডমার্ক। অতীতের নগর দ্বার হিসেবে সতের শ’ আটাশি সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। শেষ হয় সতের শ’ একানব্বইয়ে। ব্রান্ডেনবুর্গ পড়েছে পশ্চিম বার্লিনে। বার্লিন দেয়াল তোলা হলে গেটটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দেয়ালের কারণে গেটে লোক চলাচল বন্ধ ছিল। নব্বই এ দেয়াল ভেঙ্গে ফেললে এটি মিডিয়া প্রচারের কেন্দ্রে চলে আসে। দু’হাজার থেকে দু’হাজার দুই সাল পর্যন্ত সংস্কার ও সজ্জায় এখনকার রূপ পেয়েছে। ঊনিশ শ’ সাতাশি সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিগ্যান এখানে এক ভাষণে সোভিয়েত ইউনিয়নের সে সময়ের প্রেসিডেন্ট গরবাচভের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘মি গরবাচভ টিয়ার ডাউন দিজ ওয়াল।’ ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের উল্টো দিকের ফুটপাথে ম্যানহোলের ঢাকনার মতো বড় গোল চকচকে ধাতব পাতে রিগ্যানের বক্তব্যের পুরোটা লেখা রয়েছে। উদাসীন পথচারী ওই লেখা মাড়িয়ে হেঁটে গেলেও কেউ কেউ থমকে দাঁড়ান। তাদের মনে পড়ে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্র পতনের ষড়যন্ত্রে মার্কিন এই প্রেসিডেন্টের প্রত্যক্ষ তৎপরতার কথা। ব্রান্ডেনবুর্গ গেটে ভাষণ দেয়ার পাঁচ বছর আগে ঊনিশ শ’ বিরাশি সালের সাত জুন ভ্যাটিকান সিটিতে পোপের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন রিগ্যান। সেই প্রথম দুজনার দেখা। পোপের পাঠাগারে সেদিন তারা পঞ্চাশ মিনিট একান্তে কথা বলেছিলেন। ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের চব্বিশ ফেব্রুয়ারি ঊনিশ শ’ বিরানব্বই সংখ্যায় এ তথ্য রয়েছে। পোপ-রিগ্যান গোপন আঁতাত নিয়ে ‘হোলি এলায়েন্স’ নামে ওই প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলÑ “তাদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল দুজনারই অন্তরের খুব কাছাকাছি প্রসঙ্গ : পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত আধিপত্য। এ বৈঠকে রিগ্যান এবং পোপ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কমিউনিস্ট দুনিয়ার ভাঙন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে গোপনে প্রচার চালানো হবে। পোপ আর প্রেসিডেন্টের এ বৈঠক সম্পর্কে রিগ্যানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রিচার্ড এ্যালেন বলেন, ‘সর্বকালের সেরা আঁতাতগুলোর একটি হলো এই আঁতাত।’ পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ব্লকের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং পোপ জন দ্বিতীয় পলের জন্মভূমিকেই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করা হয়।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডেই নাৎসি তান্ডব চলেছে সবচেয়ে বেশি। এখানেই ছিল সবচেয়ে বড় কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ‘আউৎসুইৎজ’ ও ‘বার্কিনাও’। এখন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটন এলাকা। শত শত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদীদের ওপর কি ধরনের অমানবিক আচরণ ও নির্যাতন চলেছে তার কিছুটা বোঝা যায় স্টিফেন স্পিলবার্গের চলচ্চিত্র ‘সিন্ডলার লিস্ট’ দেখলে। জার্মান ব্যবসায়ী অস্কার সিন্ডলার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অত্যাচার ও নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে এক হাজার পোলিশ ইহুদী ও রিফিউজিকে বাঁচিয়েছিলেন। মিউনিখের ‘ডাচাও’ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সামনে দাঁড়ালে মূর্ত হয়ে ওঠে চলচ্চিত্রের সেসব দৃশ্য। বার্লিন থেকে পাঁচ শ’ চুরাশি দশমিক আট কিলোমিটার দূরে মিউনিখের ‘ডাচাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ ছিল জার্মানির প্রথম কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এটি চালু হয় উনিশ শ’ তেতাল্লিশ সালে। অনেক গবেষক এখন বলছেন হিটলারের ইহুদী বিদ্বেষের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে আঠারশ’ সাতাত্তর সালে আমেরিকায় প্রণীত ‘জিম ক্রো’ আইন- যা আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। এ আইন লংঘন করলে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রকাশ্যে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। আর শ্বেতাঙ্গ নারী পুরুষ জড়ো হয়ে পোড়ানোর সে দৃশ্য উপভোগ করতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জঘন্যতম ইতিহাস ভুলতে চায় এখনকার জার্মানী। সে কথা বলছিল গাইড মাইকেল। বার্লিন সম্পর্কে বলছিল সে। হিটলারের প্রসঙ্গ উঠলে কেমন ম্লান, দুঃখী ও অপরাধ বোধে আক্রান্ত অবয়বে শুধু বলছিল-‘ ইতিহাসের ওই অধ্যায় আমরা ভুলতে চাই’। এ বিষয়ে আর একটি কথাও বলেনি সে।

বিশ্ব অর্থনীতির দাপুটে এদেশের চ্যান্সেলর থাকেন সাধারণ একটি রাস্তার পাশে সাদামাটা বাড়িতে। অন্য সব বাড়ি থেকে পার্থক্য, দুজন নিরাপত্তা রক্ষী এর সামনে টার্ন এ্যাবাউট টার্ন করছে। মাইকেল বলে এটা তাদের ‘মা’-এর বাড়ি। এ্যাঞ্জেলা মেরকেল নিঃসন্তান। আট কোটি ছাব্বিশ লাখ জার্মান তাঁর সন্তান। তারা সবাই তাঁকে মা বলে জানে।