২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ গাফ্ফার চৌধুরী এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কয়েকদিন

  • শিতাংশু গুহ

মুক্তবুদ্ধি চর্চার মহানায়ক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী নিউইয়র্ক এলেন, একাশি বছর বয়সে একাত্তরের মতো ফাইট করলেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে এবং তারপর চলেও গেলেন বিজয়ীর বেশে। পেছনে রেখে গেলেন একরাশ প্রশ্ন। এসেছিলেন হাসিখুশি প্রফুল্ল মনে, গেলেন কিছুটা চিন্তাক্লিষ্ট। এই চিন্তা নিজেকে নিয়ে নয়, দেশকে নিয়ে। বাংলাদেশ কি পারবে এর আবহমানকালের ঐতিহ্য মুক্তবুদ্ধির চর্চা অব্যাহত রাখতে? পরক্ষণে এর উত্তরও তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন। বলেছেন, ‘বাংলাদেশে তালেবানী পতাকা উড়বে না।’ যাওয়ার আগে শেষ সভায় তিনি বলে গেলেন, ‘আমি আশাবাদী, শত অপপ্রচার ও প্রতিরোধের মধ্যে আপনারা এই যে সভা আয়োজন করেছেন, তাতে মনে হয়, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিই বিজয়ী হবে।’

কী ঘটেছিল নিউইয়র্কে? ৩ জুলাই বাংলাদেশ মিশনে তিনি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। আমন্ত্রিত হলেও আমি উপস্থিত ছিলাম না। রাতেই দু’তিনজন অভিযোগ করলেন, ফটোসেশনের কারণে অনেকেই তাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব গাফ্ফার চৌধুরীর কাছে ঘেঁষতে পারেননি। তাৎক্ষণিক ইন্টারনেট ক্লিপিং, ছবি বা সংবাদে বোঝা গেল জমজমাট অনুষ্ঠান হয়েছে। পরদিন নেটে কিছু হেডিং দেখে ‘অশনিসংকেত’-এর আশঙ্কা করলাম। দু’একটি নিউজে উস্কানি দেখলাম। দু’একজনের সঙ্গে কথা বললাম, তারা আস্বস্ত করলেন, জানালেন, উনি এমন কিছু বলেননি যে সমস্যা হতে পারে।

সেদিনই বিকেলে এক ঘরোয়া আড্ডায় গাফ্ফার চৌধুরীর সঙ্গে দেখা। দেখেই তিনি এমন এক সম্বোধন করলেন যে, শুনলে হিন্দুরা ক্ষেপে যাবে! বললাম, গাফ্ফার ভাই মিশনে কী বলেছেন, মনে হয় আগুন তো প্রায় লাগছে। আড্ডায় যা হয়, সবাই সব কথা ঠিকমতো শোনে না। তাই কেউ পাত্তা দিলেন না। ড. নূরন নবীর বাসভবনে ওই আড্ডা ছোট হলেও শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু এ প্রসঙ্গ আর ওঠেনি। পরদিন রবিবার ঘুম থেকে উঠে দেখি, আগুন ইতোমধ্যে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিন সন্ধ্যায় একটি অনুষ্ঠান ছিল তা বাতিল হয়। স্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র সভা করার প্রচেষ্টাও ভেস্তে যায়। মৌলবাদীরা মিছিল করে।

এরই মধ্যে বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দেখি বা শুনি। আওয়ামী লীগের বড় নেতার একটি ভিডিও ক্লিপ শুনি। তাতে তিনি যা বলেন, তা অনেকটা এ রকম : ‘আওয়ামী লীগ ইসলামের বিরুদ্ধে কোন কথা সহ্য করে না; গাফ্ফার চৌধুরীর বক্তব্য ইসলামবিরোধী কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।’ অথচ মিশনের মিটিংয়ে ওনারা উপস্থিত ছিলেন, মিডিয়ায় গাফ্ফার চৌধুরীর দুই পাশে স্বামী-স্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি এসেছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, মিশনের সভায় গাফ্ফার চৌধুরীর বক্তব্যের সামান্য প্রতিবাদও হয়নি। তথায় উপস্থিত শ’দুই মানুষের পঁচানব্বই শতাংশই জ্ঞানীগুণী, প্রগতিশীল। সবাই বক্তৃতা শুনলেন, হাততালি দিলেন, ছবি তুললেন, কারও মনে আঁচড়ও লাগল না; অথচ আটচল্লিশ ঘণ্টার ব্যবধানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেল! কিন্তু কেন?

মৌলবাদীরা ঘোষণা দিল, গাফ্ফার চৌধুরীকে নিউইয়র্কে আর সভা করতে দেয়া হবে না। জামায়াতীরা মুসল্লিদের ক্ষেপিয়ে দিল। তারা তওবা করার আহ্বান জানাল। কেউ কেউ একধাপ এগিয়ে গাফ্ফার চৌধুরীকে ‘মুরতাদ’ ফতোয়া দিলেন। দায়িত্ব তখন এসে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির ওপর। তারা তাদের মহান দায়িত্ব পালন করে। পত্রিকা, মিডিয়া, নেটে শ’ শ’ স্টেটমেন্ট আসে গাফ্ফার চৌধুরী ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। সবাই তার পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ ধর্মান্ধ শক্তি পরিস্থিতি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার প্রয়াস নেয়। ফেসবুকে আমি একটি পোস্টিং দিই, জামায়াত-বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের কারণে গাফ্ফার চৌধুরীর সভা প- হয়েছে। দু’একজন এর বিরোধিতা করে লম্বা ফিরিস্তি দেন। যাহোক, এরমধ্যে তিনি বস্টন যান এবং সফল সভা করেন। ফিরে এলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি রবিবার বাঙালী জনাকীর্ণ জ্যাকসন হাইটস এলাকায় সভা দেয়, গাফ্ফার চৌধুরীর নাগরিক সংবর্ধনা। আওয়ামী লীরে নিচতলার নেতাকর্মীরা এবং সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে এই সভা সফল করতে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। বিএনপি-জামায়াত, মৌলবাদীরা বসেছিল না, তারাও সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। সভাস্থল কর্তৃপক্ষকে কে বা কারা হুমকি দেয়, পুলিশ আসে, নিরাপত্তার কারণে কর্তৃপক্ষ ভেন্যু বাতিল করে। আয়োজকরা সকাল ১০টায় একটি তিনতারা হোটেলের সভাকক্ষ ভাড়া করে বিকেল ৩টায় সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে গাফ্ফার চৌধুরীর নাগরিক সংবর্ধনার কাজ সমাপ্ত করে। যারা ঘোষণা করেছিল গাফ্ফার চৌধুরীর সভা করতে দেবে না, তাদের মুখে ছাই দিয়ে স্বাধীনতার সপক্ষশক্তি একুশের গানের প্রণেতাকে যথাযোগ্য সম্মান জানায়। সম্পন্ন হয় নাগরিক সংবর্ধনার কাজ।

যাওয়ার আগে ওটাই ছিল গাফ্ফার চৌধুরীর শেষ প্রকাশ্য সভা। সেখানে তিনি আশা-নিরাশার কথা বলেছেন। বলেছেন, ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কামাল আতাতুর্কের মতো বিপ্লবী সরকারের কথাও তিনি বলেছেন। বলেছেন শেখ হাসিনার পক্ষে একা এই দানব ধ্বংস করা সম্ভব নয়, সবাইকে একসঙ্গে এর বিরুদ্ধে সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে হবে। গাফ্্ফার চৌধুরী স্পষ্ট বলেছেন, মৌলবাদ বাংলাদেশের প্রধান অন্তরায়। বিভিন্ন সময়ে মুরতাদ ফতোয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, কাজী নজরুলকে এরা ‘কাফের’ উপাধি দিয়েছিল; এখন তারা তাকে বলে ‘মুসলিম জাগরণের কবি’। কবি ইকবালকেও এরা ‘কাফের’ ঘোষণা দিয়েছিল, এই কবি ইকবাল এখন পাকিস্তানের জাতীয় কবি এবং এরা এখন বলে ‘আল্লামা ইকবাল’। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনাকেও এরা বহুবার কাফের বলেছে এবং আওয়ামী লীগকে তো বলে ‘ভারতের দালাল’।

প্রশ্ন হলো, গাফ্ফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে যারা বিক্ষোভ করল, ফতোয়া দিল, এরা কারা? সমস্যাটা সেখানেই। সাধারণ মানুষ এর মধ্যে নেই। এরা সেই পুরনো চিহ্নিত মহল। মিশনের সভায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা কেউ বিক্ষোভে যোগ দেননি বরং অনেকেই গাফ্ফার চৌধুরীর পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন। এর মানে হলো, কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে একটি মহল এ থেকে ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসে ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে কেউ কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার প্রয়াস নিচ্ছে।

গাফ্ফার চৌধুরী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তার অসম্মান একুশের অসম্মান। একুশের পথ বেয়ে আমাদের স্বাধীনতা। একুশ মানে বাংলাভাষা। বাঙালী জাতীয়তাবাদ। যারা গাফ্ফার চৌধুরীর বিরোধিতা করেছেন তারা প্রায় সবাই একুশের বিরোধী, স্বাধীনতার বিরোধী; বাঙালী জাতীয়তাবাদ বা বাংলাভাষার বিরোধী। এরা গণতন্ত্র ও প্রগতির বিরোধী। এরা পাকিস্তানপন্থী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এদেরই পূর্বসূরিরা রাজাকার-আলবদর ছিল, এরাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না এবং এরাই বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বানাতে চায়। এরা কেউ থাকবে না। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীই থাকবেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন মহান একুশ থাকবে, ততদিন গাফ্ফার চৌধুরী থাকবেন।

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী