২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বোলিং দাপটে উজ্জ্বল দিন বাংলাদেশের

বোলিং দাপটে উজ্জ্বল দিন বাংলাদেশের

সাগরিকায় দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গেল ২৪৮ রানে, দিনশেষে বিনা উইকেটে ৭ রান তুলে ২৪১ রানে পিছিয়ে টাইগাররা

মোঃ মামুন রশীদ, চট্টগ্রাম থেকে ॥ স্বপ্ন মাঝে মাঝে বাস্তব হয়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশের জন্য কালেভদ্রেই এমনটা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে টেস্ট ম্যাচের প্রথমদিনেই গুটিয়ে দেয়ার স্বপ্নটাও দেখা যায়নি বরং উল্টোটাই ঘটে। অনেকবার প্রতিপক্ষের বোলিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে বাংলাদেশ দল মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিষন্ন একটি ড্রেসিং রুম অনেকবার দেখা গেছে টাইগার শিবিরে। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার প্রথম টেস্ট শুরুর দিনে বৃষ্টির বড় ধরনের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু উইকেট সম্পর্কে জানানো হয়েছিল রোদ থাকলেই একেবারে ফ্ল্যাট হয়ে যাবে উইকেট এবং টস জয়ী দল চোখ বুজে ব্যাটিং নিয়ে নেবে। দক্ষিণ আফ্রিকা টস জিতে যাওয়ার পরই শঙ্কাটা শুরু হয়েছিল। সে শঙ্কার কালো মেঘ আরও গাঢ় হলো যখন প্রথম সেশনেই ১ উইকেট হারিয়ে ১০৪ রান তুলে ফেলল তারা। কিন্তু দিনশেষে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলকে বিষন্ন একটি ড্রেসিং রুম উপহার দিল বাংলাদেশের বোলাররা। ১৪৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে প্রোটিয়াদের প্রথম ইনিংস গুড়িয়ে গেল ২৪৮ রানে। তখনও দিন শেষ হতে ৬.২ ওভার বাকি! টেস্টের প্রথম দিনে প্রতিপক্ষকে গুটিয়ে দেয়ার ঘটনাটি দ্বিতীয়বার ঘটাল বাংলাদেশ। সেটা সম্ভব হলো অভিষেক হওয়া পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের ভয়াল এক স্পেলের কারণে। দিনশেষে ২ ওভার ব্যাট করে বিনা উইকেটে ৭ রান তুলে নির্বিঘেœই পার করেছে বাংলাদেশ। এখনও ২৪১ রানে পিছিয়ে স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় দিন তাই প্রোটিয়াদের ত্রাসোদ্দীপক পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে আজ অগ্নিপরীক্ষা বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের।

আবহাওয়া পূর্বাভাস সঠিকভাবে কার্যকর হওয়াটা সবসময়ই অনিশ্চিত! এরপর সাগর পাড়ের কোন এলাকা নিয়ে আগাম কিছু বলে সেটা বাস্তব হিসেবে দেখাটা আরও কঠিন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ বলে জানানো হয়েছিল আবহাওয়া পূর্বাভাসে। তাই শঙ্কা ছিল বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম টেস্টের শুরু থেকেই ক্রিকেটের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বৃষ্টিকেই মনে করেছিলেন সবাই। কিন্তু সাগরিকায় সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ। চনমনে আবহাওয়ায় চট্টগ্রামের এ ভেন্যুতে ফ্ল্যাট উইকেট হবে সেটা জানিয়ে ছিলেন কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবু। তার কথা মতোই কাজ শুরু করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের উইকেট। টস জিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটিং নেয়ার পর প্রমাদ গোনতে শুরু করেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকরা। একে তো টেস্টের এক নম্বর দল, তারপর আবার দুর্ধর্ষ ব্যাটিং লাইনআপ এবং ফ্ল্যাট উইকেট। শুরুতেই দর্শকদের মনে শঙ্কা, রানের পাহাড়ে চাপা পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ আরেকবার! কারণ বাংলাদেশের টেস্ট পরিসংখ্যান এমনটাই বলে। কোন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশী বোলারদের থোড়াই পরোয়া করে বেপরোয়া ব্যাট চালিয়েছেন অতীতে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরা। দক্ষিণ আফ্রিকার শুরুটাও হলো তেমনই। এই উইকেটেই ৪১৫ রানের রেকর্ড জুটি গড়েছিলেন এই দক্ষিণ আফ্রিকার নিল ম্যাকেঞ্জি ও গ্রায়েম স্মিথ জুটি। এবার সেটা না হলেও প্রথম সেশনেই ১ উইকেটে ১০৪ রান তুলে বড় কিছুরই ইঙ্গিত দিচ্ছিল প্রোটিয়ারা। ৫৮ রান তোলার পরই প্রোটিয়া শিবিরে প্রথম আঘাত হেনেছিলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন স্টিয়ান ভ্যান জাইলকে (৩৪)। কিপিংয়ের জন্য পুরোপুরি ফিট না থাকায় অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমের বদলে উইকেটরক্ষকের দায়িত্বে থাকা লিটন দাস দারুণ ক্যাচটি লুফে নেয়।

বাংলাদেশের জন্য ম্যাড়ম্যাড়ে একটি প্রথম সেশন যাওয়ার পর যেন দিনশেষে ভবিষ্যতটা দেখতে পাচ্ছিলেন সবাই। কারণ এ উইকেটে প্রথম যারাই ব্যাটিং করেছেন রানের পাহাড় গড়েছেন, সে দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। অন্তত যে কোন টেস্টের প্রথম সেশন নিয়ে সবার মধ্যে যে শঙ্কা থাকে ব্যাটিং সমস্যার সেটা কাটিয়ে তাদের দারুণ গোড়াপত্তন। তবে দ্বিতীয় সেশনে দারুণভাবেই ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশী বোলাররা। প্রথম এক ঘণ্টায় ২৬ এবং সেশন শেষে ২৯ ওভারে ৬১ রান তোলে প্রোটিয়ারা। তবে চাপ তৈরি করলেও দুই উইকেটের বেশি তুলে নিতে পারেননি বাংলাদেশের কোন বোলাার। প্রথম দিনটা যেন রান করার চেয়ে উইকেট জিইয়ে রাখার দিকেই মনোযোগী ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ওপেনার ডিন এলগারকে স্পিনার তাইজুল ইসলাম এবং ফাফ ডু প্লেসিসকে সাকিব আল হাসান ফিরিয়ে দিলেন সাজঘরে।

কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার পরিকল্পনাটা আর ঠিকভাবে কার্যকর থাকল না চা বিরতির পর। ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন মুস্তাফিজ। চা বিরতির পর তৃতীয় ওভারেই তার অফকাটারে পরাস্ত হয়ে উপমহাদেশে ব্যাট হাতে দারুণ সফল আমলা আত্মাহুতি দিলেন। এবার সফরে দারুণ ব্যর্থ বিশ্বের তিন নম্বর এ টেস্ট ব্যাটসম্যান ফিরে গেলেন ১৩ রানে। পরের বলেই এলবিডব্লিউ জেপি ডুমিনি। যদিও মুস্তাফিজের জোরালো আবেদন নাকচ হয়েছিল ক্যারিবীয় আম্পায়ার জোয়েল উইলসনের দৃষ্টিতে। কিন্তু এবার রিভিউ নিয়ে আর বিফল হতে হয়নি টাইগারদের। টিভি আম্পায়ার ডিআরএস পদ্ধতি ব্যবহার করে জানিয়ে দিলেন শূন্য রানেই সাজঘরে ফিরতে হবে ডুমিনিকে। অভিষেক টেস্টেই হ্যাটট্রিকের সুযোগ মুস্তাফিজের, যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে ফিল্ডিংয়ে দাঁড়ালেন বাংলাদেশী ক্রিকেটাররা। তবে ভয়ঙ্কর ইয়র্কারটা ফিরিয়ে দিলেন কুইন্টন ডি কক। কিন্তু পরের বলটি ঠেকাতে পারলেন না। ১৩৯.৮ কিলোমিটার গতিতে বল ছুড়ে তার অফস্ট্যাম্প উড়িয়ে দিলেন মুস্তাফিজ। মুহূর্তেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। ৩ উইকেটে ১৭৩ থেকে মুহূর্তেই ৬ উইকেটে ১৭৩! বিপর্যয়ে প্রোটিয়ারা। মুস্তাফিজের বোলিং তা-বে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপের ভেঙ্গে যাওয়া পাঁজর আর জোড়া লাগল না। কিছুটা চেষ্টা করে গেছেন তরুণ টেমবা বাভুমা। তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক হাঁকানোর পরই মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। দুটি জীবন ফিরে পেয়েও আর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। তাকে ফিরিয়ে দিয়ে মুস্তাফিজ দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস শেষ করে দেন। এর আগেই তরুণ লেগস্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন ঘূর্ণি বলের জাদুতে প্রোটিয়া ইনিংসের লেজ মুড়িয়ে দেয়া শুরু করেছিলেন। বার বার বঞ্চনার শিকার হওয়া এ তরুণ অবশেষে দলে নিজের অন্তর্র্ভুক্তির উপযুক্ততা প্রমাণ করলেন। ভারনন ফিল্যান্ডার, সাইমন হারমার এবং ডেল স্টেইনকে সাজঘরে ফিরিয়ে তিনি শেষ করেন ৫৩ রানে তিন উইকেট শিকার করে। ৭৫ রানেই শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যস্ত দক্ষিণ আফ্রিকা অলআউট ২৪৮ রানে! এর আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ১৭০ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল তারা। এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ইনিংস তাদের বাংলাদেশের বিপক্ষে। এছাড়া আর কখনই ৩০০ রানের নিচে টাইগারদের বিপক্ষে গুটিয়ে যায়নি তারা।

এই প্রথম কোন বড় টেস্ট খেলুড়ে দলকে টেস্টের প্রথমদিনেই গুটিয়ে দিতে পারল বাংলাদেশের বোলাররা। যদিও গত বছর অক্টোবরে প্রথমবারের মতো জিম্বাবুইয়েকে টেস্টের প্রথমদিনেই অলআউট করে দিয়েছিল বাংলাদেশী বোলাররা ঢাকা টেস্টে। দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকাকে সেই বিস্বাদ উপহার দিল টাইগাররা। দিনটার শেষটুকু বাংলাদেশের দুই ওপেনার ইমরুল কায়েস ও তামিম ইকবাল বিপদ ছাড়াই পার করেছেন। বিশ্বের এক নম্বর বোলার ভয়ঙ্কর ডেল স্টেইন ও ফিল্যান্ডারের করা দুই ওভার থেকে তারা ৭ রান তুলেছেন বিনা উইকেটে। তবে আসল চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আজ। যদিও মঙ্গলবার বৃষ্টি হয়নি। শঙ্কাটা আজও আছে। ২৪১ রানে এগিয়ে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তাদের বিশ্বসেরা ও আতঙ্কের পেস বোলিং বিভাগের বিপক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ আজ বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের।