২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুরুতে মুস্তাফিজ ঝড়

শুরুতে মুস্তাফিজ ঝড়
  • ২৪৮ রানেই থেমে গেল প্রোটিয়াদের প্রথম ইনিংস

মোঃ মামুন রশীদ ॥ রোদ না বৃষ্টি, বেহাল বাংলাদেশ না কি বদলে যাওয়া টাইগার ক্রিকেট দল? এই দুটি প্রশ্নই ছিল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া সাগরিকা টেস্ট ঘিরে। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট পরাশক্তি হিসেবে ব্যাঘ্র গর্জন দিতে থাকা উজ্জীবিত, পরিণত এবং রূপান্তরিত বাংলাদেশকেই দেখল টেস্ট ক্রিকেটের এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকা। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অভিষেকেই আতঙ্ক ছড়ালেন তরুণ পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। তার চার বলে তিন উইকেট দখলের এক ভয়ানক স্পেলের আঘাতে ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার বড় একটি সংগ্রহ গড়ে স্বাগতিক বাংলাদেশকে চাপে ফেলার। অভিষেকেই চার উইকেট শিকার করে প্রোটিয়া শিবিরে যে ত্রাস ছড়ালেন তাতেই পাঁজর ভেঙ্গে যাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা ধুঁকতে ধুঁকতে মুখ থুবড়ে পড়ল ২৪৮ রানে। টেস্টের প্রথম দিনে ওয়েস্ট

ইন্ডিজ ও জিম্বাবুইয়ের পর এই প্রথম আবার কোন দলকে একদিনেই অলআউট করেছে বাংলাদেশ। সাত ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলার পরিকল্পনাটা সেখানেই সফলতা দেখল। আর বিশ্ববাসী আরেকবার অবাক তাকিয়ে দেখল টেস্ট ক্রিকেটেও বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে। টেস্ট ম্যাচ পাঁচদিনের বলেই প্রথম দিনের সাফল্যটা নিয়ে মেতে ওঠার সুযোগ নেই। দিনশেষে প্রথম ইনিংসে বিনা উইকেটে ৭ রান তুলে এখনও ২৪১ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ। পেস বোলিংয়ে বর্তমান বিশ্বসেরা বোলিং বিভাগের বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ এখন টাইগার ব্যাটসম্যানদের।

শুরুটা কিন্তু যুতসই বা পছন্দসই হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। বৃষ্টির বদলে যখন সাগরিকায় সকাল থেকেই সূর্য হেসে উঠল তখন থেকেই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে টসজয়ী দল বিনা বাক্য ব্যয় কিংবা চিন্তা ছাড়াই ব্যাটিং বেছে নেবে। কারণ প্রথমে ব্যাট করতে নামা দল অতীতে এ মাঠে রানের ফুলঝুরি ছুটিয়েছে। প্রোটিয়াদের অতীতটাও দারুণ ভাল। তাছাড়া কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবুও বলেছিলেন সামান্য রোদেই ফ্ল্যাট উইকেটে পরিণত হবে সাগরিকার উইকেট। তাই ব্যাটিংটাকেই বেছে নিলেন প্রোটিয়া অধিনায়ক হাশিম আমলা। ৫৮ রানে প্রথম উইকেট হারালেও প্রথম সেশনে ২৮ ওভারে ১০৪ রান তুলে মহাদর্পেই এগিয়ে যাচ্ছিল প্রোটিয়ারা। সাফল্যটা বরাবরের মতো একজন স্পিনারই এনে দিয়েছিলেন। তাইজুল ইসলাম ফিরিয়ে দেন ওপেনার স্টিয়ান ভ্যান জাইলকে। টেস্ট ক্রিকেটে এমনিতেই কাগুজে বাঘ বাংলাদেশ যেটুকু সাফল্য অতীত সময়গুলোতে বোলিংয়ে পেয়েছে তার সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবিই ছিল সমৃদ্ধ স্পিন বিভাগের। আর গত ৭-৮ বছরে এর অধিকাংশই করে দিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। এবারও শুরুটা দুই পেসার মোহাম্মদ শহীদ ও মুস্তাফিজ যেভাবে করেছিলেন এবং তাইজুল উইকেট নিলেন তখন মনে হচ্ছিল চিরাচরিত খাতেই প্রবাহিত হচ্ছে বাংলাদেশের বোলিং। চা বিরতি পর্যন্ত বাংলাদেশের অকেজো পেস বোলিং কিছুই করতে পারেনি। তিন উইকেটই শিকার করেছিলেন তিন স্পিনার তাইজুল, সাকিব ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ।

টেস্ট ক্রিকেট সেশন বাই সেশন খেলা। মুহূর্তেই চিত্রনাট্য যেভাবে পাল্টে যায় সেটাকে ট্র্যাজেডি বলে আখ্যা দিলেও ভুল হবে না। ক্রিকেট বোদ্ধারাও বারবার বলেন একটি সেশনের ভাল-মন্দ দেখে কোন দলের পরিসমাপ্তিটা বিবেচনা করা যাবে না। সেটাই যেন কার্যকর হলো দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর! আর এক্ষেত্রে শেষ সেশনে বদলে গেল বাংলাদেশ। নায়ক অভিষেক ঘটা পেসার মুস্তাফিজ। ততক্ষণে তিনি করে ফেলেছিলেন ১২ ওভার। ৩০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। কিন্তু নিজেকে ত্রাস হিসেবে পরিণত করলেন টানা চার বলে তিন গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে। ফিরিয়ে দিলেন আমলা (১৩), ডুমিনি (০) ও ডি কক (০)। এরপর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি প্রোটিয়া শিবির। বাকি কাজটা করে দিয়েছেন তরুণ লেগস্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন টানা তিন উইকেট শিকার করে। শেষ পেরেকটা ঠুকলেন মূর্তমান আতঙ্ক হয়ে ওঠা মুস্তাফিজই। দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তরুণ টেমবা বাভুমা। ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক আদায়ও করে নিয়েছিলেন। তবে এরপর মনোযোগ হারিয়ে ফেলা বাভুমা দুটি জীবনও ফিরে পেলেন দিনের শেষভাগে বাংলাদেশী ফিল্ডারদের ব্যর্থতায়! কিন্তু তাকেও ফিরিয়ে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২৪৮ রানেই আটকে দেন মুস্তাফিজ। তখনও দিনের ৬.২ ওভার বাকি! এমন সাফল্য এর আগে ২০০৯ সালে ভাঙ্গাচোরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে দেখিয়েছিল বাংলাদেশ গ্রানাডায় এবং গত বছর অক্টোবরে ঢাকায় নিজেদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে। কোন টেস্টের প্রথমদিনে এছাড়া আর কোন দলকেই গুটিয়ে দিতে পারেনি বাংলাদেশ। অভিষেক ওয়ানডেতে বিশ্ব কাঁপানো পেসার মুস্তাফিজ টেস্ট পদার্পণেও জ্বলে উঠলেন। যদিও তিনি সাফল্যের পেছনে বাংলাদেশের পরিকল্পনা নিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল যতটা সম্ভব ডট বল করা। তাহলেই উইকেট আসবে। সে কারণেই সফল হয়েছি। উইকেট বদলায়নি।’ জাহিদ বাবু আরেকটি কথাও বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘রোদ উঠলে মুশফিক যেমন উইকেট চেয়েছেন তেমনটাই হয়ে যাবে সাগরিকার উইকেট!’ কিন্তু মুশফিক কেমন উইকেট চেয়েছেন সেটা বলেননি সে সময়। তবে কি এমন রহস্য ঘেরা উইকেটই চেয়েছিলেন মুশফিক! দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংসের প্রথম ও শেষে স্পিন বিষ এবং মাঝে গতির ঝড় গোলক ধাঁধায় ফেলবে ব্যাটিং করা দলকে? সময়ই বলে দেবে আরও কি লুকিয়ে আছে সাগরিকায়। আর প্রথমদিন বৃষ্টির সব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে রোদ চকচকে আবহাওয়ায় খেলা হলেও শঙ্কাটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে! আজ থেকে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের লড়াই শুরু। কারণ সৌম্য সরকারকে বাদ রেখে ৭ ব্যাটসম্যান নিয়ে একাদশ সাজিয়েছে বাংলাদেশ! নিয়েছে ৫ বোলার! এখন পর্যন্ত সেটা সফলতার মুখ দেখেছে এবং সাকিব নির্ভরতা কাটিয়ে অন্য বোলারদের সাফল্যে হাসবে বাংলাদেশ! এবার লড়াই সাত ব্যাটসম্যানের। প্রতিপক্ষ বিশ্বের এক নম্বর বোলার ডেল স্টেইন, সাত নম্বর ভারনন ফিল্যান্ডার ও নয় নম্বর মরনে মরকেলদের মতো ভয়ঙ্কর পেসারদের নিয়ে গড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং বিভাগ!