১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টংঘর টিনশেড বস্তিতে মানুষ মরে সর্বস্বান্ত হয়, কিন্তু প্রতিকার নেই

  • এসবের মালিক কারা, কেন তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে?

শংকর কুমার দে ॥ রাজধানীতে অপরিকল্পিত ঝিলের ওপর টিনশেড, টংঘর, বস্তিঘরের স্থাপনা নির্মাণ করার ঘটনায় একের পর এক দুর্ঘটনায় হতাহত, সম্পদহানির ঘটনা ঘটেই চলেছে। রাজউকের অনুমতি ব্যতীত রাজধানীতে এ ধরনের অপরিকল্পিত স্থাপনায় কখনও অগ্নিকা-, কখনও বা দেবে কিংবা হেলে পড়ার মতো দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ দিচ্ছে স্বল্প ভাড়ায় অল্প আয়ের কর্মজীবী মানুষরা। এভাবে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করার পর যত দুর্ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগই ঘটেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, সরকারী দলসহ নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণাধীন ঝিল বা জমিতে। রাজধানীর রামপুরায় যুবলীগ নেতার দখলকৃত ঝিলের ওপর নির্মিত টিনশেড ঘর দেবে গিয়ে ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার রেশ না কাটতেই আবার সোমবার রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন ঝিলের ওপর নির্মিত শতাধিক টংঘরে অগ্নিকা-ে ভস্মীভূত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ওসমান গনির মালিকানাধীন রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় ঝিলের ওপর নির্মিত শতাধিক টংঘর ভস্মীভূত হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী শতাধিক টংঘর, মেসবাড়ি, দোকানের সহস্রাধিক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যারা পথে বসেছেন তারা স্বল্প আয়ের নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষগুলো। আগুন লাগার পর ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ করে ঘর থেকে বের হয়ে আসায় সৌভাগ্যক্রমে তারা প্রাণে রক্ষা পান।

বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওসমান গনির ভাই মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পৈত্রিক সূত্রে তারা এ জমির মালিক। ভাওয়ালের রাজার প্রজা ছিলেন তার দাদা হাজী সিরাজউদ্দিন ও তদপুত্র নূরু মিয়া খাজনা দিতেন ভাওয়ালের রাজাকে। প্রায় ২০ বিঘার মতো ঝিল ও বসত বাড়ির পৈত্রিক সম্পত্তি যেখানে সেখানেই অগ্নিকা-ের ঘটনাটিকে তারা দুর্ঘটনা ও দুর্ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন। এই পৈত্রিক সম্পত্তির মালিকানায় আছেন তারা ৫ ভাই ও ৪ বোন। রাজউক কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইমারত বা দালান ঘর নির্মাণ করা হলে অনুমতি নিয়ে করতেন। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও কাউন্সিলর ওসমান গনি একজন সৎ রাজনীতিক।

অগ্নিকা-ের ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান বলেন, অগ্নিকা-ের ঘটনাস্থলের ঝিলের জমিতে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে এসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় সাংসদ একেএম রহমত উল্লাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, এখানে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। যাতে এখনে আর এভাবে স্থাপনা তৈরি না হয় সেই বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেন স্থানীয় সাংসদ।

এর আগে রাজধানীর রামপুরায় যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান চৌধুরী মনির রামপুরার পূর্ব হাজিপাড়ার ঝিলপাড়ে ঘর দেবে নারী-শিশুসহ ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। যুবলীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনির রামপুরা ২৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি এবং মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। টাকার বিনিময়েই তিনি যুবলীগ নেতা। তাঁরা জানান, জোট সরকারের আমলে মনির বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সরকার পরিবর্তন হলে যুবলীগে ভিড়েছেন যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার আশীর্বাদে। সংগঠনে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন এই যুবলীগ নেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর রায়েরবাজার বেড়িবাঁধের পাশে ‘সাদেক খান কলোনি’তে শতাধিক পরিবারের বসবাস। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাদেক খান কলোনির জমির মালিকানা দাবিদার। কিন্তু কাগজপত্রে তা সরকারী জলাভূমি। স্থানীয়রা নিশ্চিত করলেন, বেড়িবাঁধের পাশের প্রায় সব জমিই সরকারী। মাত্র ২৫ বছর আগেও এই খালে নৌকা চলত। পরে সাদেক খান ও তার ভাইয়েরা এসব জমি দখল করেন। তার ভাই মহানগর উত্তর যুবলীগের সহ-সভাপতি কাদের খান। বছরখানেক আগে জলাশয় ভরাট করে এখানে নির্মাণ করা হয় টিনের ছয়টি দোতলা ভবন। ‘ভবনের’ নেই ফাউন্ডেশন বা ভিত্তিমূল। জলাশয়ের নরম মাটিতে পোঁতা বাঁশের খুঁটি ও কাঠের পাটাতন। তার ওপর সিমেন্টের ঢালাই দেয়া মেঝে! শুধু এক তলায় নয়, দ্বিতীয় তলার পাকা মেঝেও বাঁশের খুঁটির ওপর। গ্যাস, পানি, বিদ্যুত সব কিছুর সংযোগ থাকলেও ‘ভবনে’ নেই কলাম কিংবা বিম। তার মধ্যেই থাকে দুই শতাধিক পরিবার। রায়েরবাজার কবরস্থানের ১ নম্বর গেটের ঠিক বিপরীতে বেড়িবাঁধের পাশ ঘেঁষে নিচু জমিতে কয়েক বছরে টিনের ঘর উঠেছে কয়েকশ’। দখলদারদের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে এসব ঘর তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তারাই ভাড়া আদায় করেন। সবগুলোই দাঁড়িয়ে আছে পানির ওপর কিংবা ভরাট করা জলাশয়ের নরম মাটিতে। বস্তিবাসী হাজার হাজার মানুষ বাস করে এখানে। মালিকরা বিত্তবান। প্রতি মাসে কমপক্ষে দুই হাজার ২শ’ টাকা ভাড়ায় থাকে একেকটি দরিদ্র পরিবার। দখলের অভিযোগ অস্বীকার করলেও সাদেক খানের গ্যাস-পানির সংযোগ এসেছে কিংবা বৈধতা আছে কিনা তার কোন উত্তর নেই। এই টাকার ভাগ পান দখলদার, রাজনৈতিক নেতা, সরকারী কর্মকর্তা-সহ সবাই।

রাজউকের একজন কর্মকর্তা বলেন, শুধু রায়েরবাজার কেন? কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, রামপুরায় আছে এ ধরনের শত শত বাড়ি, যারা অবৈধভাবে জমির মালিক হয়েছে এবং অবৈধভাবে বিদ্যুত, গ্যাস, পানির লাইন নিয়ে জমজমাট অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছেন। মূলত তাদের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না।

রাজধানীর কড়াইলে আরেক জমির মালিক রবিউল ইসলাম। বরিশাল থেকে এসে ১৯৯১ সালে ঘর করেন কড়াইলে। স্থানীয়রা জানান, প্রথমে কড়াইলে ঘর তোলা নিয়ে কোন বাধা-নিষেধ ছিল না। ভূমিহীন ছিন্নমূল মানুষ ঝিলের পাড়ে ঘর তোলেন। পরে দখলদাররা সব জমি দখল করে নেয়। জমি শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন বাঁশ পুঁতে ঘর তুলছে লেকের ওপর। কারও কারও ঘরের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০। এক মাওলানার মালিকানাধীন ঘর আছে ১১০টি। মাসে ভাড়া পান তিন লাখ টাকা। ম্যানেজার মাসে মাসে ভাড়া নিয়ে যান। এসব ঘরে গ্যাস-বিদ্যুত-পানি সংযোগ আছে। ম্যানেজার বলেন, গ্যাসের চুলাপ্রতি ৩০০ টাকা দিতে হয় এক বাস্তুহারা লীগ নেতাকে। পানির জন্য দিতে হয় ৫০ টাকা। এক বাসিন্দা বলেন, এই বস্তির প্রায় ৬ হাজার ঘর থেকে মাসে ভাড়া ওঠে দেড় কোটি টাকা। টিএ্যান্ডটি, রাজউক ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারী নেতারাও ঘরের মালিক। এ টাকার ভাগ নেন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অনেকে। যে দল যখন ক্ষমতায় ঘর মালিকদের তাদের মাসিক চাঁদা দিতে হয়।

গুলশানের লেকের পাড়ের বস্তিটি এতই বড় যে এখানে নাকি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকারী খাস জমিতে গড়ে ওঠা বস্তি উচ্ছেদ করতে কার সাধ্য? লেকের পানির ওপর বাঁশের খুঁটি পুঁতে তৈরি ঘরে থাকেন অনেকেই।

শুধু তাই নয়, রাজধানীর গুলশান, শাহবাগ ও তেজগাঁওয়ে রাস্তার পাশে সরকারী জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে সরকারী দলের অফিস। এসব জমি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার। কিন্তু এই রাষ্ট্রের জমি দখল করেই নিজেদের কার্যালয় নির্মাণ করছে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো। দখলদারিত্বে পিছিয়ে নেই নামে-বেনামে গজিয়ে ওঠা অখ্যাত প্রতিষ্ঠানও। অথচ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নিতে পারছে না।

রাজউক ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সোনার খনির মতো সরকারী জমিতে যারা দখলদারিত্বের মধ্যে আছে তারা কোন না কোনভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মদদ পাচ্ছেন সরকারী দলের প্রভাবশালী নেতাদের কাছ থেকেই। এলাকার এমপির তারা খুবই কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর বারিধারায় মার্কিন দূতাবাসের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে যুবলীগ অফিস। সেখানে ব্যানারে লেখা, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ অফিস। অভিজাত এলাকা গুলশান-২ নম্বর মোড়ে ফুটপাথ দখল করে উঠেছে আওয়ামী লীগ অফিস। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি রয়েছে জাতীয় পার্টির অফিসও। আগে এসব এলাকায় দেখা গেছে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের অফিস। তবে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব অফিসের সাইনবোর্ডও বদলে যায়, নতুন দখলদার আসে, দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলছে।