১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজন হত্যার দায় স্বীকার দুলাল ও নুর মিয়ার ॥ পুলিশের আচরণে অর্থমন্ত্রীর ক্ষো

সালাম মশরুর, সিলেট অফিস ॥ শিশু রাজন হত্যা মামলার আসামি মুহিত ও দুলাল মঙ্গলবার আদালতে স্বীকরোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। এর আগে চাঞ্চল্যকর এই মামলার অন্যতম আসামি চৌকিদার ময়না সোমবার আদালতে ১৬৪-এ জবানবন্দী প্রদান করেছে। মঙ্গলবার সিলেটের জেলা প্রশাসক রাজনের বাবা-মার সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে এই মামলার বিচার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে আসামিরা একে একে ঘটনার সঙ্গে তাদের নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। রাজন হত্যার এজাহার নামীয় সকল আসামিই আটক হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজন গত ১৪ জুলাই রাতে রাজন হত্যা মামলার আসামি চৌকিদার ময়নাকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পরদিন ময়নাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড চলাকালেই সোমবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয় ময়না মিয়া। পরে ময়নাকে জেলহাজতে প্রেরণ করেন আদালত। এর আগে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ আলী ও আছমত উল্লাহ ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। ঘটনা দেখার পরও পুলিশকে না জানানোর কারণে পুলিশ এ দুজনকে গ্রেফতার করে। পরে দুজনই আদালতে জবানবন্দী দেয়। হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত চৌকিদার ময়না নুর মিয়া, দুলাল আহমদ প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ ও আছমত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিলেন। বর্তমানে মুহিত, ইসমাইল হোসেন আবলুস, আলী হায়দার ও রহুল আমীন রিমান্ডে রয়েছে। জেলহাজতে রয়েছে মুহিত আলমের স্ত্রী লিপি বেগম। শিশু রাজন হত্যাকা-ের ঘটনায় এ পর্যন্ত এক নারীসহ ১০ জন গ্রেফতার রয়েছেন। এছাড়া হত্যাকা-ের মূল হোতা কামরুল সৌদি আরবে আটক রয়েছে। রাজন হত্যার ঘটনায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে মামলার দুই আসামি দুলাল আহমদ ও নুর মিয়া। মঙ্গলবার বেলা ৩টা থেকে ৬টা ১০ মিনিট পর্যন্ত তারা সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৩ আনোয়ারুল হকের খাস কামরায় জবানবন্দী দেয়। জবানবন্দী গ্রহণ শেষে একটি মাইক্রোবাসযোগে তাদের সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আসামিদের বহনকারী মাইক্রোবাসে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলার চেষ্টা চালায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তবে পুলিশী হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এসএমপির এসি (প্রসিকিউশন) আব্দুল আহাদ জানান, দুলাল ও নূর মিয়া হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তাদের এ স্বীকারোক্তি মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিহত শিশু রাজনের বাবা ও স্বজনের সঙ্গে পুলিশ দুর্ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শুক্রবার বাদজুমা সদর উপজেলার বাদেআলী গ্রামে রাজনের বাড়িতে মা-বাবাকে সমবেদনা জানানোর পর উপস্থিত সাংবাদিককের কাছে এ ক্ষোভের কথা জানান। তিনি বলেন, আমি শুনেছি কিছু পুলিশ সদস্য রাজনের বাবার দেয়া মামলা নেয়নি। উল্টো তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। এটা লজ্জার ব্যাপার। যারা রাজনের বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, একটা ছোট্ট বাচ্চাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না। যারা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত তারা খুবই খারাপ। রাজন হত্যাকারীদের জানোয়ার মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাদের বিচার খুব দ্রুত করা হবে। তিনি আরও বলেন, যারা এ কা- দেখে শিশুটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি এ জন্য তাদেরও বিচার করা উচিত। নিহত সামিউল আলম রাজনের একমাত্র ভাইয়ের লেখাপড়া ও তাদের পরিবার যাতে নির্বিঘেœ জীবনযাপন করতে পারে সেজন্য প্রাথমিকভাবে একটি ফান্ড গঠন করে সেখানে ৫ লাখ টাকা রাখার ঘোষণা দেন। তিনি রাজন নির্যাতনকারী কামরুলকে সৌদি আরবের প্রবাসীরা আটকে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান। মোবাইলের কললিস্ট থেকে রাজন নির্যাতনকারীদের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগাযোগের সূত্র খুঁজে পেয়েছে তদন্তকারী কমিটি। রাজনকে নির্যাতনের স্থানে ঘৃণা স্তম্ভ স্থাপনের জন্য সাংসদ কেয়া চৌধুরীর ২ লাখ টাকা প্রদান করেছেন। রাজন হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে দেশে-বিদেশে প্রতিবাদ মানববন্ধন অব্যাহত রয়েছে। শিশু রাজন হত্যাকা-ের ঘটনাটি এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত। নির্যাতনকারী কে, কোথায়, কখন আটক হচ্ছে, কারা কী স্বীকারোক্তি দিচ্ছে, বিচারকার্য কবে শুরু হচ্ছেÑ এই সকল বিষয় নিয়ে সচেতন সমাজের সজাগ দৃষ্টি। রাজন নির্যাতন ঘটনার সঙ্গে থানা পুলিশের নিন্দনীয় সম্পৃক্ততাও এখন আলোচনার অন্যতম বিষয়। রাজন নির্যাতনকারীদের রক্ষা করতে ও বিদেশ পালাতে সহায়তাকারী পুলিশের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির ফলাফল কী। কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে দোষীদের বিরুদ্ধে, সেই দিকেও দৃষ্টি রয়েছে জনগণের। রাজন নির্যাতনের ঘটনা এখন জনসমক্ষে খোলাসা হয়ে গেছে। তাই থানা পুলিশের এই নিন্দনীয় ভূমিকাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। শুরু থেকেই পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনের বাবা আজিজুর রহমানের অভিযোগ ছিল। রাজন হত্যা ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি ও আর্থিক লেনদেনের বিষয় বেশকিছু তথ্যপ্রমাণ তদন্ত কমিটির হাতে এসেছে। ঘটনার পর পরই নিজেদের রক্ষা করতে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করে কামরুল ও মুহিত ৬ লাখ টাকা থানা পুলিশের দুই কর্মকর্তার হাতে তুলে দেয়। সেই অটোরিকশা দুইটির রেজিস্ট্রেশন নাম্বারও তদন্ত কমিটি পেয়ে গেছে। অটোরিকশার একটির মালিক মুহিত এবং অপরটির মালিক তার বড় ভাই আলী আহমদ। রাজনের বাবা আজিজুর রহমান আলম ১৪ জুলাই সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, জালালাবাদ থানা পুলিশ ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার ছেলে রাজনের হত্যাকা-টি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। তিনি বলেন, রাজনকে হত্যার পর বুধবার রাতেই জালালাবাদ থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। আমার মামলার আগেই পুলিশ বাদী হয়ে মাত্র দুইজনকে আসামি করে মামলা রুজু করে এবং প্রধান আসামি কামরুলকে টাকার বিনিময়ে থানা থেকে ছেড়ে দেয়। রাজনের বাবা তার সন্তান হত্যায় সংশ্লিষ্ট সকল আসামির নাম উল্লেখ করে মামলা করতে চাইলে এসআই আমিনুল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে রাজনের বাবাকে গলাধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন। প্রশ্ন উঠেছে, এলাকাবাসী মাইক্রোবাসসহ রাজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশকে দিয়েছেÑ এটা জানার পর রাজনের বাবা সঙ্গে সঙ্গে থানায় গেলেও তিনি কেন পুলিশের কাছে ঘেঁষতে পারেননি। আর তিনি যদি লাশ উদ্ধারের পর থানায় গিয়ে থাকেন তবে জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ও এসআই আমিনুল ইসলাম রাজনের বাবাকে পাশ কাটিয়ে মামলা দায়েরে কেন এত তৎপর হলেন।

মামলার নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, নিহত রাজনের বাবা ঘটনার রাতেই ৪ জনকে আসামি করে জালালাবাদ থানায় লিখিত এজাহার দেন। কিন্তু পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়নি। নথিতে দেখা যায়, ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ৯ জুলাই ওই থানারই এক নারী এএসআই ‘জেবা’ নাম স্বাক্ষর করে এজাহারটি ‘গৃহীত’ বলে থানায় জমা রাখেন। সবচেয়ে বিস্ময় হচ্ছে, পুলিশের দায়ের করা মামলায় রাজন ‘অজ্ঞাতনামা (পুরুষ)’ হলেও জনতার হাতে আটকের পর পুলিশে সোপর্দ হওয়া মুহিত আলমকে আদালতে পাঠাতে ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন যে অগ্রবর্তী প্রতিবেদন লিখেন তাতে রাজনের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা সবই সঠিকভাবে উল্লেখ ছিল। তাই এক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠেছে, রাজনের বাবার এজাহার থেকেই পুলিশ এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছে অথচ রাজনের বাবার এজাহার থানা পুলিশ আমলে নেয়নি। শুধু আদালতে প্রেরিত আসামি অগ্রবর্তী প্রতিবেদনের সঙ্গে জালালাবাদ থানায় দেয়া রাজনের বাবার এজাহারটি গেঁথে দিয়েছে। এমনকি ৯ জুলাই মুহিত আলমকে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন আদালতে যে দরখাস্ত দেন তাতে এ মামলার আসামি হিসেবে শুধু মুহিত ও ময়নার কথা উল্লেখ আছে- রাজনের বাবার দায়েরকৃত এজাহারে আসামিদের কোন উল্লেখ সেখানেও নেই। স্পর্শকাতর এই ঘটনাটি এখন সবার চোখের সম্মুখে। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মামলার তদন্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদার। এদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটিও গোপনীয়তা রক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজন হত্যা ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে নিয়মিত খোঁজ নেয়া হচ্ছে।

রাজনকে নির্যাতনের আরও একটি ভিডিও চিত্র ॥ শিশু সামিউল আলম রাজনকে নির্যাতনের ঘটনায় আরও একটি ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়েছে। ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের এই ভিডিওচিত্রে শিশুটিকে আরও বর্বরোচিত নির্যাতনের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। এর আগে রাজনকে নির্যাতনের ২৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের একটি ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভিডিওটি দেখেই আঁতকে উঠে সারাদেশের মানুষ। তোলপাড় শুরু হয় দেশজুড়ে। নতুন প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, নির্যাতনের দ্বিতীয় পর্যায়ে সামিউলকে একটি বিপণি বিতানের পেছনে গাড়ির গ্যারেজে নিয়ে বেঁধে রাখা হয়। সেখানে চলে আরেক দফা নির্যাতন। মোট ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিও দৃশ্যে চৌকিদার ময়না মিয়া ২১ সেকেন্ডে ১২টি চড় মারে সামিউলকে। ভিডিও দৃশ্যে দেখা গেছে, দুই হাত দিয়ে ময়নার চড় খেয়ে সামিউল চিৎকার করেও কাঁদছিল। তবু ক্ষান্ত হচ্ছিল না ময়না। তখন আশপাশে কামরুল ইসলাম ছাড়াও আরও তিনজন ছিলেন। ময়না তাদের উদ্দেশে বলছিল, ‘মারো, যে যেভাবে পার মারো, কম্পিটিশন করি মারো!’ নতুন এই ভিডিও দৃশ্যের শুরুতে কামরুল রোলার দিয়ে পেটায় রাজনকে। এরপর ময়না দুই হাতে চড় দিতে থাকে। কটূক্তি করতে করতে ভিডিওচিত্রের এক মিনিট তিন সেকেন্ড থেকে ২৪ সেকেন্ড পর্যন্ত থেমে থেমে সামিউলকে চড় দেয় ময়না। এরপর সামিউল পানি খাওয়ার আকুতি জানায়। সামিউলের সামনে তখন একটি পানির বোতল রেখে লোভ দেখানোও চলে কিছুক্ষণ। দূর থেকে বলা হয়, ‘হা কর!’। মুখে দূর থেকে পানি দেয়া হচ্ছিল, সামিউল খাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিল। এতে করে পানি মুখে না পড়ে পরনের গেঞ্জিতে গিয়ে পড়ায় একপর্যায়ে সামিউলকে অনেকটা আঁচল পাতার মতো করে গেঞ্জির মধ্যে পানি দেয়ার আকুতি জানাতে দেখা গেছে। প্রথম ভিডিওচিত্রে সামিউল ‘পানি খাওয়াও রে-বা!’ বলে আকুতি জানালে ‘পানির বদলা ঘাম খা’ বলে নির্যাতনকারীদের একজন।

কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আগামী সপ্তাহে শুরু ॥ রাজনকে পিটিয়ে হত্যার আসামি কামরুল ইসলামকে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আগামী সপ্তাহে শুরু করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ একথা জানিয়ে বলেন, ‘সৌদিতে সপ্তাহব্যাপী ঈদের ছুটি শেষে এখানকার বেশিরভাগ সরকারী অফিস খুলবে সামনের রবিবার থেকে। যেদিন অফিস খুলবে সেদিন থেকেই তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ গত ৮ জুলাই শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার পর বাংলাদেশ ছেড়ে যায় সৌদি প্রবাসী কামরুল। পরে দূতাবাস কর্মকর্তাদের তৎপরতায় তাকে জেদ্দায় আটক করা হয়। সে সেখানে পুলিশ হেফাজতে বন্দী রয়েছে। গোলাম মসীহ বলেন, ‘সৌদি প্রশাসন এই বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। তারা জানিয়েছে, কামরুলকে ফেরত দিতে তারা আন্তরিকভাবেই সহযোগিতা করবে।’

প্রবাসীদের সহায়তা ॥ নির্মমভাবে খুন হওয়া সিলেটের শিশু সামিউল আলম রাজনের পরিবারকে অনুদান দিয়েছেন কয়েকজন লন্ডন প্রবাসী। লন্ডনের কেমডেনের বাসিন্দা কুনু মিয়ার উদ্যোগে এ অনুদান প্রদান করা হয়। এতে সহযোগিতা করেন- লন্ডন প্রবাসী কাজী সায়েম ইসলাম, আব্দুল হামিদ, হায়দর আলীসহ আরও অনেকেই। শুক্রবার বিকেলে লন্ডন প্রবাসীদের পক্ষ থেকে রাজনের পরিবারকে ৪০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেছেন নজরুল ইসলাম ও পিনাক কর। যুক্তরাজ্য প্রবাসী তানিয়া বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় প্রবাসী তানিয়া বড় ভাই মোঃ জাহিদুর রহমান (নাহিদ)-এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য প্রবাসী তানিয়া চৌধুরীর পক্ষ থেকে রাজনের পরিবারকে ৮ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিটি ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ ইলিয়াছুর রহমান ইলিয়াছ, সাহেদ আহমদ, নুরুল ইসলাম নুর, মন্টু পাল, সাংবাদিক শাহীন আহমদ প্রমুখ।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ স্তম্ভ ॥ শিশু সামিউল আলম রাজনকে বর্বরোচিত নির্যাতন করে হত্যার স্থানে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ স্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্তম্ভ নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে সিলেটর নারী সাংসদ কেয়া চৌধুরী ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। সাংসদ কেয়া চৌধুরী বলেন, রাজনকে হত্যার পর দেশে-বিদেশে মানুষ প্রতিবাদ করছে। এই স্পিরিটটা আমরা ধরে রাখতে চাই। যাতে আর একটি শিশুও নির্যাতিত না হয়। সে লক্ষ্যেই শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ স্তম্ভ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। যাতে এই স্তম্ভ দেখে মানুষ শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আমি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। এখন স্থানীয় প্রশাসনকেই এটি নির্মাণ করতে হবে। কুমারগাঁওয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিশু রাজনকে। নির্যাতনের সময় ভিডিও করে তা ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। এই ভিডিও দেখে আঁতকে ওঠে সারাদেশের মানুষ। দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দাবি ওঠে খুনীদের সর্বোচ্চ শাস্তির। এর আগে ছাত্র ইউনিয়নসহ কয়েকটি সংগঠন রাজন হত্যার স্থানে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ মঞ্চ স্থাপনের দাবি জানায়।

বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে এই মামলার বিচার কাজ -জেলা প্রশাসক ॥ রাজন হত্যার ঘটনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে এই মামলার বিচার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্নের আশ্বাস দিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন। মঙ্গলবার সকালে কান্দিগাঁওয়ে রাজনের বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ আশ্বাস দেন। এ সময় সিলেটের পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসানসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা রাজনের বাবা-মাকে সান্ত¡না দেন ও বিচারের আশ্বাস প্রদান করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক রাজনের বাবার হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন বলেন, রাজন হত্যা মামলাকে চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অভিহিত করা হবে। পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকেই এই মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলার তালিকাভুক্ত করা হবে। এছাড়া বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে এই মামলার বিচার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।

আসামি ময়না সিলেটের শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যার ঘটনায় আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে হত্যার জন্য কামরুল ও মুহিতকেই বেশি দায়ী করেছে। নিজে রাজনকে বেঁধে রেখে সেই কামরুল ও মুহিতকে খবর দেয় বলে জানায় ময়না। জবানবন্দীতে ময়না বলে, আলী হায়দারের একটি ভ্যানগাড়ি ঘটনার দিন টুকেরবাজার তেমুখী সংলগ্ন খান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের সামনে রাখা ছিল। ঘটনার দিন সকাল ছয়টার দিকে রাজনসহ কয়েকজন শিশু খেলার ছলে ভ্যানগাড়িতে ওঠে। অপর এক ব্যক্তি ময়নাকে ডেকে বলে, তার ভ্যানগাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় ময়না শিশুদের তাড়া করলে অন্য শিশুরা দূরে সরে যায়। রাজন পালাতে পারেনি। এ সময় রাজনকে জাপটে ধরে বেঁধে রাখে। বাঁধার পর ‘চোর’ ধরেছে বলে আলী হায়দারের বাড়িতে খবর দেয়। এরপর কামরুল, আলী হায়দার, মুহিত আলম, পাভেলসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে এসে শিশু রাজনের ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে রাজনের মৃত্যু হয়।

প্রথম দফায় নিজেও রাজনকে মারধরের কথা উল্লেখ করে ময়না জানায়, তার মারধরে রাজনের মৃত্যু হয়নি। স্বীকারোক্তিতে ময়না বলে, কামরুল, তার ভাই মুহিদুল ও পাভেল নামের এক যুবক এসে রাজনকে বেধড়ক মারপিট করে। তাদের মারপিটেই রাজন মারা যায়। তবে সে কামরুলদের মারধর করার সময় সহযোগিতা করেছে বলে আদালতকে জানায়। সোমবার সিলেট মহানগর হাকিম তৃতীয় আমলি আদালতে হত্যাকা-ের স্বীকারোক্তি দেয় ময়না। আদালতের বিচারক আনোয়ারুল হক জবানবন্দী রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) সুরঞ্জিত তালুকদার আরও বলেন, রাজনসহ শিশুরা ভ্যানগাড়িটি চালানোর চেষ্টা করছিল। তবে চুরির উদ্দেশ্যে নয়। ময়নার বক্তব্যেই বোঝা গেছে তারা খেলা করার জন্য গাড়িটি চালাচ্ছিল। হত্যাকা-ের ঘটনায় ময়না গ্রেফতার আসামিসহ জড়িত আরও কয়েকজনের নাম বলেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা। গত ১৪ জুলাই রাতে রাজন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ময়না চৌকিদারকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশে দেয়। ১৫ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডের সময় শেষ হওয়ার আগেই ময়না আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে রাজি হওয়ায় সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এই হত্যাকা-ে জড়িত ঘাতকদের স্থানীয় লোকজন পুলিশের কাছে তুলে দেন। এর বাইরে প্রত্যক্ষদর্শী দু’ব্যক্তি ও এক নারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সৌদি আরবে আটক হন কামরুল। সব মিলিয়ে পুলিশের কাছে বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন ১০ জন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে এই ১০ জনের বাইরে আরও ৪ জনের নাম উল্লেখ করেছে চৌকিদার ময়না। এই ৪ জনের মধ্যে পাবেল আহমদসহ স্থানীয় আরও ৪ জনের নাম ওঠে এসেছে জবানবন্দীতে। এই ৪ জনকে গ্রেফতার করতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে ওয়ার্কশপের চৌকিদার হিসেবে ময়না চাকরি করছিলেন। হত্যাকা-ের পর দিরাইয়ের শ্যামাচরে আত্মগোপনে চলে যায় ময়না। এরপর তার মায়ের সহায়তায় স্থানীয় জনতা ময়নাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।

রাজন হত্যার দায় স্বীকার ॥ স্বীকারোক্তি- নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর মিয়া ও নির্যাতনকারী দুলাল আহমদ।

নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন নতুন আরও ৪-৫ জনের নাম প্রকাশ পেয়েছে তাদের জবানবন্দীতে। তবে তদন্তের স্বার্থে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা তা এখন প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদার আদালতের বরাত দিয়ে জানান, দুলাল তার জবানবন্দীতে বলেছে, কামরুল ও ময়না চৌকিদার ফোন দিয়ে তাকে ডেকে আনে। ফোনে তাকে বলা হয় চোর ধরা হয়েছে, চোরকে দেখে যেতে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দুলাল দেখতে পায় শিশু রাজনকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কামরুল ও ময়নাসহ অন্যরা মারধর করছে। চোরকে বেঁধে রাখা হয়েছে শুনে সেও রাজনকে সামান্য মারধর করে। ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর আহমদের জবানবন্দীর বরাত দিয়ে সুরঞ্জিত তালুকদার জানান, কামরুলের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় নূর। এরপর কামরুল মারধরের ভিডিওচিত্র ধারণ করতে বললে সে তার নোকিয়া ই-৬৩ মডেলের ফোন সেট দিয়ে ভিডিও করে। পরে ভিডিওটি তার ফেসবুকে আপলোড করে।

সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) আব্দুল আহাদ জানান, দুলাল মিয়া ও নূর আহমদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। তারা দুইজনই নির্যাতনের সঙ্গে নিজেদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে।