১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হুমকির মুখে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সাফল্য

  • তামাক চাষের দুষ্টচক্র এক

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদ মিলে যত সাফল্য তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন মেট্রিকটন। ওই অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন মেট্রিকটন (প্রায় ৪০ লাখ টন) চাল রফতানি করার যোগ্যতা ছিল বাংলাদেশের। এ হিসাব দিয়েছিল পরিকলল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি)। ইতোমধ্যেই চাল রফতানিও শুরু হয়েছে। কিন্তু অন্যতম এ সাফল্য আজ হুকির মুখে পড়েছে। দেশে হু হু করে বাড়ছে তামাকের চাষ। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে সরকারের এ অর্জন শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে কিনা। দেশের বিভিন্ন জেলায় এই বিষাক্ত ফসলের আবাদ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরের একটি বড় সময় (কার্তিক মাস থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত) এসব অঞ্চল থাকে তামাকের দখলে। গোটা অর্থনীতি বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, বনজসম্পদ, মৎস্যসম্পদ পরিবেশ-প্রতিবেশ, মাটির স্বাস্থ্য, নদীর নাব্যতা, শিশুশ্রম প্রভৃতি পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মৌসুমের একটি বড় সময়ে প্রায় সব জমিই থাকে তামাকের দখলে। এই জেলার মিরপুর উপজেলা মনে হয়েছিল তামাকের উপজেলা। যেদিকে দুচোখ যায় শুধুই তামাক আর তামাক।

এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা যে খুব বেশি হুমকিতে পড়বে তা নয়। কেননা আমরা তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যেই ভূমির ব্যবহার সংক্রান্ত নীতিমালা করা হয়েছে। সেটি এক্ষেত্রে কাজে লাগবে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন, তামাক চাষ নিয়ে কথাবার্তা তেমন হয় না বললেই চলে। অথচ বিষয়টি জরুরী ও জনগুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১২-১৩ অর্থবছরে যেখানে ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হতো, সেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ দেড় গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার হেক্টরে। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ কমছে। এছাড়া তামাক চাষের কারণে জমির প্রাকৃতিক উর্বরা শক্তি কমছে মারাত্মকভাবে। দেশের বৃক্ষ নিধনের ৩০ শতাংশ ঘটছে তামাক পাতা শুকানের কাজে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে। এতে দেশে মরুকরণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। তামাকের এত ক্ষতি হলেও কেন যেন তামাক চাষ বাড়ছে। এটি নিঃসন্দেহে একদিকে নয়া উপনিবেশবাদের খপ্পরে পড়ার লক্ষণ আর অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যত খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তারও কারণ।

কৃষি সস্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী দেশে ২০১৩-১৪ মৌসুমে ১ লাখ ৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে, ২০১২-১৩ মৌসুমে যা ছিল ৭০ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরেই তামাক চাষের জমির পরিমাণ বেড়েছে ৩৮ হাজার হেক্টর। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তামাক থেকে মোট রফতানি আয় ছিল মাত্র ৭০ লাখ ডলার, যেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে (জুলাই পর্যন্ত) এই আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। রফতানি আয় বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় দেশে তামাকচাষ বৃদ্ধির হার। সাময়িক মুনাফার প্রলোভনে পড়ে কৃষক ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠছেন তামাক চাষে। খাদ্য ও অর্থকরী ফসলের বিপুল পরিমাণ জমি চলে যাচ্ছে তামাকের দখলে। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরে পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায় ব্যাপকভাবে তামাক চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। তামাক চাষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ৭টি জেলা (রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ৪টি জেলায় (ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা) অব্যাহত রয়েছে তামাকের আগ্রাসন। এছাড়া নড়াইল, যশোর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও ফরিদপুরসহ বেশ কিছু জেলায় দিন দিন তামাক চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে আবুল বারকাত বলেন, বর্তমানে তামাক পাতার উপর ১০ শতাংশ হারে রফতানি শুল্ক ধার্য করা আছে। তামাকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতি বিবেচনা করে এই রফতানি শুল্ক হার নগণ্য। তামাক রফতানি নিরুৎসাহীত করতে কমপক্ষে ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করতে হবে।

সূত্র জানায়, দেশের ফসলি জমি তামাক কোম্পানির দখলে চলে যাচ্ছে। বিগত ৬ বছরের ব্যবধানে তামাক উৎপাদনের পরিমাণ ৪০ হাজার ২৪০ টন থেকে প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে ১ লাখ ৩ হাজার ৬৫০ টনে দাঁড়িয়েছে। দেশে মোট চাষযোগ্য (৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর) জমি থেকে নানা কারণে বছরে ৬৯ হাজার হেক্টর (খাদ্য মন্ত্রণালয় ও এফএও গবেষণা, ২০১৩) আবাদী জমি হারিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি। একইভাবে প্রতিবছর তামাকের দখলে চলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ জমি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে, ১ হেক্টর জমিতে ৩.৯ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব। সে হিসাবে গত ২০১৩-১৪ মৌসুমে ৪ লাখ ৮ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ না হলে ৪ লাখ ২১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত চাল দেশের খাদ্য ভা-ারে যোগ হতে পারত। তামাক চাষের কারণে বর্তমানে তা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের মোট চাল উৎপাদনের বিচারে এ পরিমাণটি বর্তমানে অনেক বড় না হলেও তামাক চাষ বৃদ্ধির এ প্রবণতা বজায় থাকলে অচিরেই চাল উৎপাদনের এ পরিমাণটি মোট উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে পরিণত হতে পারে। এভাবে তামাক চাষের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ অদূর ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো।

কুষ্টিয়া জেলা ধান, গম ও তরকারি উৎপাদনে সফল জেলা। বলা চলে খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। কিন্তু এ জেলার কৃষক যারা এক সময় ব্যাপক ধান চাষ করত তারা এখন আর ধান বা অন্য ফসল চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। মিরপুর উপজেলার অর্জুনগাছি গ্রামের কৃষক এমদাদুল হক জানান, তামাক চাষের অন্যান্য ক্ষতির সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকা-। কেননা কোম্পানির ফিল্ডম্যানরা এলাকার মস্তানদের টিবি অর্থাৎ তামাক বিক্রয়ের অনুমতিপত্র দেয়। ফলে কৃষকরা বঞ্চিত হওয়ায় বাধ্য হয়ে মস্তানদের কাছে তামাক বিক্রি করেন। কিন্তু ব্যাংকে টাকা নিতে গিয়ে শারীরিক, মানসিক এবং নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। এমনকি ব্যাপক সন্ত্রাসী ঘটনাও ঘটে। সিকির পাড়া গ্রামের রেজাউল করিম রেয়াজ বলেন, আগে ধান চাষ করতাম কিন্তু লাভ না হওয়ায় গত ১৫ বছর ধরে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর তালিকাভুক্ত হয়ে তামাক চাষ করছি। তার মতো আবু জাফর, আসাদুল হক, আমির হোসেন ও রেজাউল করিমসহ অনেক কৃষকই ধান ও অন্য ফসল চাষ বাদ দিয়ে বছরের একটি বড় সময় তামাকের পিছনে ব্যয় করছেন। তারা জানান, তামাক চাষ করলে অধিক সার দিতে হয় ফলে জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্য ফসল ভাল হতে চায় না। তাছাড়া কোম্পানিগুলোর ছলচাতুরিতো আছেই। তারপরও বাধ্য হয়েই এই চাষ করি। তামাক চাষ এবং কৃষকদের কাছ থেকে তামাক ক্রয়ের বিষয়ে ব্রিটিস আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের স্থানীয় দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে, তিনি এ প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি ছাড়া কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ সময় তিনি ঢাকায় যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করে দেন। কোম্পানির ঢাকার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল ফোনে বিজনেস সংক্রান্ত কোন প্রশ্নের উত্তর দেবেন না বলে জানান। পরবর্তীতে ই-মেইলের মাধ্যমে কোন প্রশ্ন থাকলে তা জানাতে বলেছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের এগ্রিকালচার স্ট্যাটিসটিকস বিভাগের প্রফেসর পরেশ চন্দ্র মোদক তামাক চাষ বিষয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, তামাক চাষ যত বাড়বে অন্য কৃষি ফসল ততই কমবে। ফলে অবশ্যই খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। মানবতার জন্য তামাক চাষ শুভকর নয়। কিন্তু মাল্টিন্যাশনাল টোব্যাকো কোম্পানিগুলো সিগারেট, বিড়ি, গুল, জর্দ্দা ইত্যাদি ক্ষতিকারক পণ্য তৈরির জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করছে। খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্যসহ এর সার্বিক ক্ষতির দিক বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

গবেষণা সংস্থা প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, তামাক চাষের আর্থ-সামাজিক, পরিবেশ, প্রতিবেশ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ নানাবিধ ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। কিছু খারাপ প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বা স্বল্পমেয়াদে চোখে পড়ে আবার এমন অনেক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে যেগুলো স্পষ্ট হতে দীর্ঘদিন সময় লাগে। বিদ্যমান তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে ক্রবর্ধমান তামাক চাষের ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি, জমির উর্বরতা নষ্ট, বন উজাড়, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিশুশ্রম, শিক্ষা সামাজিক কর্মকা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।

কুষ্টিয়া জেলায় এখনও ধানের উৎপাদন হচ্ছে, তবে এ অর্জন কতটা ধরে রাখা যাবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, তিন বছরে ধান ও গম উৎপাদনের চিত্র হচ্ছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ২৮৯ হেক্টর জমিতে এর বিপরীতে চাষ হয়েছে ৩৫ হাজার ৯২৬ হেক্টর জমিতে। এ সময়ে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৫৪৮ হেক্টর আর চাষ হয়েছে ১৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার ১১১ হেক্টর আর চাষ হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে এসময়ে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৭৩৮ হেক্টর আর চাষ হয়েছে ১৬ হাজার ৮৫০ হেক্টর। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার ৫৯৪ হেক্টর আর চাষ হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। অন্যদিকে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৯৮০ হেক্টর আর চাষ হয়েছে ১৬ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু এ অর্জন কতদিন টিকে থাকবে তামাক চাষের কারণে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।