১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গতানুগতিক চলচ্চিত্র ‘অগ্নি-২’

গৌতম পা-ে ॥ শুরুটা হয় খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের সমাধিস্থল দিয়ে। একান্ত ভালবাসার মানুষ শিশিরের সমাধি পাশে গিয়ে অগ্নির মনে পড়ে যায় অতীত স্মৃতি। নিজের চোখের সামনে মুখোশ পরিহিত পাইথন নামধারী নীলকণ্ঠ’র হাতে নৃশংসভাবে শিশিরের খুন হওয়ার ঘটনা ভুলতে পারে না সে। প্রতিহিংসার নেশায় পেয়ে বসে তাকে। এভাবেই এগিয়ে যায় এবার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘অগ্নি-২’। গতানুগতিক সিনেধারা থেকে যে বেরিয়ে আসতে পারেনি দেশীয় চলচ্চিত্র, ‘অগ্নি-২’ তার বাস্তব প্রমাণ। এছাড়া পোস্টারসহ ছোটখাটো অনুকরণের অভিযোগতো রয়েছেই। সোমবার সকাল থেকে ঝিরঝির বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা ছিল সিক্ত। অধিকাংশ মানুষ ঈদ শেষে ঢাকায় পৌঁছতে পারেনি বিধায় রাস্তাঘাট কিছুটা হলেও ছিল ফাঁকা। কিন্তু দুপুরে মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। তখনও হলের প্রধান ফটক খোলা হয়নি। সিনেমাপ্রেমীদের ভিড়ে গোটা এলাকা জনারণ্যে পরিণত। থেকে থেকে টিকেট কালোবাজারিদের চিৎকার, এই ডিসি, রিয়েল স্টল ইত্যাদি। উদ্দেশ্য একটাই, সবাই দেখতে এসেছে ঢাকাই চলচ্চিত্র ‘অগ্নি-২’। কয়েকমাস আগে থেকেই চলচ্চিত্রটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। মুক্তির আগেই নানান চমক দেখিয়ে এরইমধ্যে দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতেও চলে আসে চলচ্চিত্র। সর্বশেষ গত মাসে চলচ্চিত্রটির ‘ম্যাজিক মামনি’ শিরোনামের গানটি ইউটিউবে মুক্তির পর আলোচনা শুরু হয়। দুই বাংলার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই চলচ্চিত্রটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশের জাজ মাল্টিমিডিয়া ও ভারতের এসকে মুভিজ। এট পরিচালনাও করেছেন যৌথভাবে বাংলাদেশের ইফতেখার চৌধুরী এবং ভারতের হিমাংশু। মধুমিতা হলের ভেতরে ঢুকতে চোখে পড়ে ‘অগ্নি-২’ চলচ্চিত্রের একটি পোস্টার। যেখানে রয়েছে নায়ক ওম ও নায়িকা মাহির এ্যাকশনের দৃশ্য। পোস্টারটি দেখে মনে পড়ে যায় ‘দ্য ডাইভারজেন্ট সিরিজ : ইনসারজেন্ট’ নামে হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্রটির দৃশ্য। সিকাগো শহরের প্রেক্ষাপটে সাহসী হয়ে ওঠা এক তরুণী ট্রিসকে ঘিরে ‘ইনসারজেন্ট’ চলচ্চিত্রটির গল্প আবর্তিত। যেখানে যথারীতি তাকে সহযোগিতা করে যায় সাহসী তরুণ ফোর। ‘অগ্নি-২’ চলচ্চিত্রটির পোস্টারে প্রায় একই রকমের এ্যাকশনের দৃশ্য। অগ্নির মতো অগ্নি-টুতেও নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাহিয়া মাহি। বিপরীতে রয়েছে কলকাতার ওম। চলচ্চিত্রটিতে ভিন্নধারার এ্যাকশনে দেখা যায় মাহিকে। অগ্নি নামে সে এক সাহসী তরুণী। যে তার প্রেমিক শিশিরের হত্যাকারীকে খুঁজে বেড়ায় প্রতিশোধ নেয়ার আশায়। তাকে যথারীতি সহযোগিতা করে যায় সাহসী তরুণ ইশান। ইশানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কলকাতার ওম। হলের ভেতর অনেক দর্শককে বলতে শোনা গেলো, ঝকঝকে ছবি, স্পষ্ট শব্দ আর কিছু মারদাঙ্গা ফাইটিং হলেই চলে, গল্পের অত বেশি দরকার কি? বোঝা গেল এই শ্রেণীর দর্শককে যাচ্ছে তাই দেখাতে দেখাতে রুচিহীন করে ফেলা হয়েছে। হলে সপরিবারে ছবি দেখতে আসার দর্শক তেমন চোখে পড়ল না। দুই-একটা পরিবারকে দেখা গেলেও ছবির কোন কোন দৃশ্যে পরিবারের কর্তাকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখা গেছে। চলচ্চিত্রের গতানুগতিক অবস্থা জেনে তবুও বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের প্রতি আশাবাদী হয়ে এসেছেন অনেকে। চলচ্চিত্রের প্রধান খল চরিত্র নীলকণ্ঠ ওরফে পাইথনের ভূমিকায় রয়েছেন বলিউডের জনপ্রিয় খলনায়ক আশীষ বিদ্যার্থী। অসাধারণ অভিনয় ও এ্যাকশন আঙ্গিকে চলচ্চিত্রটিকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। এক পর্যায়ে শিশিরের হত্যাকারী পাইথনকে খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠে অগ্নি। কিন্তু ধরা পড়ে যায় পাইথন গ্রুপের কাছে। হঠাৎ করেই নায়ক ওমের আবির্ভাব ঘটান পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রেরর এটাই এক বৈশিষ্ট, নায়িকা বিপদে পড়লেই নায়কের উপস্থিতি, যথারীতি মারপিট। এখানে পরিচালক নায়িকাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি চুম্বনের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করেন, পরে বন্ধুত্ব। ইতিপূর্বে কলকাতায় ওমের দুটি ছবি রিলিজ হলেও তেমন সাড়া ফেলতে পারেননি। এবার কিন্তু তিনি উঠে পড়ে লেগেছেন, একজন এ্যাকশন হিরো হিসেবে। এতে ওমের বাচনশৈলী এক কথায় অসাধারণ। ইশানের কারণেই অগ্নির খোঁজ পায় পাইথন নামধারী নীলকণ্ঠ। কিন্তু ঘটনাচক্রে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। শর্তের মাধ্যমে অগ্নি ও ইশান এগুতে থাকে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে। পাইথন জানতে পারে তাদের বন্ধুত্বের ঘটনা। অবিশ্বাসের জালে পড়ে ইশান। দু’জনকে মারার পরিকল্পনা করে পাইথন। শেষ পর্যায়ে অগ্নির হাতেই মৃত্যু হয় পাইথন নামধারী নীলকণ্ঠের। বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের আর সব দশ পাঁচটা আইটেম গান থেকে ‘অগ্নি-২’ চলচ্চিত্রের ম্যাজিক মামনি গানটি কিছুটা হলেও আলাদা মনে হয়েছে। এই গানের মিউজিক কলকাতার সুরকার স্যাভির করা। আইটেম গানের বিট ও কম্পোজিশন কেমন হওয়া উচিত বুঝেই কাজটি করেছেন। যদিও ম্যাজিক মামনি কয়েকটা গানের সুর এদিক সেদিক করে করা তার পরেও এই গানের বিট আপনার মাথায় গেঁথে যাবে এবং আপনি বাংলা মুভির আরও ১০/১২ আইটেম গান থেকে আলাদা করতে পারবেন। গানের লিরিকও কলকাতার গীতিকারের। এতে কয়েকটা শব্দ আছে যেগুলো একবার শুনলে পরের বার মনে করার জন্য চুল ছিঁড়তে হবে না। ‘ম্যাজিক মামনি’ টাইটেলটাই গানটাকে হিট করার জন্য যথেষ্ট। এডিটিং কলকাতায় করা। মিউজিকের পরে আসে ভিজুয়্যালের ব্যাপার। গানের ভিজ্যুয়াল আমাদের দেশের অন্য আইটেম গান থেকে অনেক আলাদা। খেয়াল করলেই বুঝতে পারা যাবে পরিচালক ইফতেখার চৌধুরীর অন্য আইটেম গানগুলো থেকেও এটা আলাদা। এর প্রধান কারণ এডিটিং। করিওগ্রাফি ও কস্টিউম কলকাতার। গান অনুযায়ী করিওগ্রাফি যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। যদিও বেবিডল থেকে অনুপ্রাণীত তবে হুবহু না। গতানুগতিক ধারার ছবি হলেও এ্যাকশনের দিক থেকে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে চলচ্চিত্র ‘অগ্নি-২’। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকেই মান সম্মত তথা দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ি চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছেন না। এমন অভিযোগ দর্শক তথা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদেরও। বাংলাদেশের দর্শকদের অভিযোগ স্বাভাবিক সময়তো বটেই, ঈদ উৎসবেও নেই ভাল মানের চলচ্চিত্রের সংকট অনুভব করেছেন তারা। দর্শকের প্রত্যাশা অন্তত ঈদের মত বাৎসরিক আনন্দ উৎসবে ভাল চলচ্চিত্র মুক্তি দেবেন সংশ্লিষ্টরা।