১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কলেজে ভর্তি সঙ্কট কাটাতে ফের মেধাতালিকা

  • এতে জটিলতা কাটবে কিনা সন্দিহান অনেকেই

বিভাষ বাড়ৈ ॥ কলেজ ভর্তির সঙ্কট কাটাতে আজ আবার প্রকাশ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মেধাতালিকা। সঙ্কট কাটানোর চেষ্টায় এটি হবে টানা চতুর্থ তালিকা। একে সর্বশেষ তালিকা বলে বুয়েট ও শিক্ষা বোর্ড দাবি করলেও এ তালিকাতেও জটিলতা কাটবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। এদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দুই লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের নম্বরপত্র বা ট্রান্সক্রিপ্টে ভুল ধরা পড়ায় অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ভর্তি হতে কলেজে গিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বোর্ডের কম্পিউটার শাখার গাফিলতির কারণে কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে নতুন করে ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপানো হচ্ছে। এ নিয়ে তোলপাড় চলছে পুরো শিক্ষা প্রশাসনে। তবে অভিযুক্ত এক কর্মকর্তাকে রক্ষায় শিক্ষা প্রশাসনের প্রভাবশালীদের তদ্বিরের অভিযোগ উঠেছে। বোর্ড চেয়ারম্যান বলেছেন, এটা পরিষ্কার যে কম্পিউটার শাখার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। এর আগে কলেজ ভর্তি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত ১১ জুলাই এক লাখ আট হাজার ৬৩৯ শিক্ষার্থীকে মনোনীত করে তৃতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। তৃতীয় ওই তালিকা প্রকাশের পরেও কলেজ ভর্তির সুযোগ বঞ্চিত থেকে যায় প্রায় আড়াই লাখ এসএসসি পাস শিক্ষার্থী। ভুল হওয়ায় সঙ্কট তৈরি হয় দ্বিতীয় তালিকা নিয়েও। তাড়াহুড়ো করে গোঁজামিল দিয়ে তালিকা প্রকাশ করায় অনেক নামী দামী কলেজ শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়েছে। সারাদেশে তিন শাতাধিক কলেজে এখন পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীকেও মনোনয়ন না দেয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের উপক্রম। অথচ বিপরীতে অনেক শিক্ষা বাণিজ্যনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রহস্যজনকভাবে মনোনীত করা হয়েছে শত শত শিক্ষার্থী। বেশ কয়েকটি নামী কলেজের অধ্যক্ষরা ইতোমধ্যেই শিক্ষা বোর্ডকে জানিয়ে দিয়েছেন, এভাবে চলতে থাকলে কলেজ বন্ধ করে দিতে হবে। এমন অবস্থায় আজ আবার মেধা তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে অনলাইন ভর্তি কার্যক্রমের জন্য কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান বুয়েট। বুয়েটের কথা অনুসারে ঢাকা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, আজকের তালিকাই শেষ। এরপর আর কোন তালিকা প্রকাশ করা হবে না। অনলাইনে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য চতুর্থ দফায় আবেদন করেছে ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী। গত ১৩ জুলাই থেকে ২১ জুলাই রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত অনলাইন ও এসএমএসের মাধ্যমে এসব শিক্ষার্থী আবেদন করেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিকী বলেছেন, বৃহস্পতিবার যে কোন সময় চতুর্থ মেধাতালিকা প্রকাশ করা হবে। সব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হতে পারবে। কোন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির বাইরে থাকবে না। চতুর্থ তালিকা প্রকাশের পর আর বড় কোন সমস্যা থাকবে না বলে বুয়েটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন বলে জানান চেয়ারম্যান। আজকের তালিকায় যারা মনোনীত হবে তারা ২৫ ও ২৬ জুলাই ভর্তি হতে পারবে।

এদিকে কর্মকর্তারা দ্রুত তালিকায় ভুলের সঙ্কটের বিষয়ে আশার বাণী শোনালেও নতুন কেলেঙ্কারি জন্ম দিয়েছে ঢাকা বোর্ডের কম্পিউটার শাখা। এ বোর্ড থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দুই লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর নম্বরপত্র (ট্রান্সক্রিপ্ট) ভুল ছাপা হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেও তাল মেলাতে পারছে না বোর্ড। কারণ হিসেবে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, শিক্ষা প্রশাসনের দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার তদ্বির করছেন কম্পিউটার শাখার কর্মকর্তার জন্য। এ তদ্বিরকে চাপ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও তদন্ত কমিটির কেউ এ চাপের কথা স্বীকার করছেন না। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হচ্ছে ঢাকা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক এটিএম মইনুল হোসেনকে। বাকি দুই সদস্য হলেন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রসময় কীর্ত্তনীয়া ও সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল।

বোর্ড সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে চড়া দামে কিনে আনা সিকিউরিটি কাগজে এ ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপা হয়। এখন ছাপা হওয়া নম্বরপত্র ফেলে দিয়ে নতুন করে সব ছাপতে হবে। রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান জানান, পূর্বনির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী তারা তাদের শিক্ষকদের ঢাকা বোর্ড কার্যালয়ে নম্বরপত্র আনতে পাঠান। সেখানে গিয়ে শিক্ষকরা নম্বরপত্র তুলে নেয়ার পর দেখতে পান, তাতে অসংখ্য ভুল। পরিচিত ছাত্রছাত্রীদের রোল নম্বর নিয়ে মিলিয়ে দেখেন তারা। এতে ধরা পড়ে, বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর প্রাপ্ত জিপিএ ভুল ছাপা হয়েছে। জিপিএ ৫ প্রাপ্ত পরীক্ষার্থীর নম্বরপত্রে জিপিএ এসেছে ২। আবার ২ দশমিক ৪৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর নম্বরপত্রে জিপিএ ছাপা হয়েছে ৫। ইংরেজি, গণিত, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নসহ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জিপিএ প্রাপ্তিও ভুল ছাপা হয়েছে। গণিত বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া পরীক্ষার্থীর জিপিএ ছাপা হয়েছে ৩ দশমিক ৬৫। এ সব ভুল দেখার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ত্রুটিপূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্ট নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপরই বিষয়টি জানাজানি হয়ে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বোর্ডের কম্পিউটার শাখার কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি ও অবহেলার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। এ শাখার সিনিয়র এ্যানালিস্টসহ সংশ্লিষ্টদের অমনোযোগিতার কারণেই পরীক্ষার্থীরা নম্বরপত্র প্রাপ্তি থেকে এখন বঞ্চিত হচ্ছে। এ বছর নম্বরপত্র ছাপার দায়িত্বে ছিলেন বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এ্যানালিস্ট মনজুরুল কবীর।

ঢাকা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ঢাকা বোর্ডে কম্পিউটার শাখার কর্মকর্তারা একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ সব অনলাইনের কাজ তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ হয়। সর্বশেষ জেএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের কাজ করেছে তাদেরই একজনের নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান শিক্ষাঙ্গন ডট কম। ঢাকা বোর্ডে নিজস্ব সুপার সফটওয়্যার থাকার পরও অখ্যাত ও বেনামি এ প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় প্রায় ১৮ লাখ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণের কাজ। এ সব ঘটনা নিয়ে অসন্তোষ ক্রমশই বাড়ছে।

অনলাইন স্মার্ট এ্যাডমিশন সিস্টেমে আবেদন ও ফলাফলের ভোগান্তির মধ্যে এখন তাই কলেজ ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা মার্কশীট বা নম্বরপত্র বিড়ম্বনায় পড়েছেন। সত্বর নতুন মার্কশীট ছাপানো শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে যথাসময়ে মার্কশীট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন একাদশে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা। বোর্ড মার্কশীট না দিলেও অনেকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে শিক্ষার্থীদের বলছে, মার্কশিট না হলে ভর্তি নয়। অথচ বোর্ড জানিয়েছে, মার্কশীট না হওয়ায় ওয়েবসাইট থেকে ফলাফলের প্রিন্ট কপি নিলেই ভর্তি নিতে হবে। অনেক কলেজ বলছে, বোর্ডের নির্দেশ তারা পায়নি। এ অবস্থায় হয়রানির শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।