২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নতুন রোস্টার, হাসপাতালে ছুটির দিনে নিশ্চিত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা

নিখিল মানখিন ॥ এবার ঈদের ছুটিতেও স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা পেয়েছে রোগীরা। ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসাসেবায় তৈরি করা হয় বিশেষ মেডিক্যাল টিম। বহির্বিভাগেও সীমিত পরিসরে রোগী দেখার ব্যবস্থা ছিল। খোলা ছিল জরুরী বিভাগ ও অপারেশন থিয়েটার। ভর্তি করানো হয় নতুন রোগী। প্রতিটি বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক রোস্টার তৈরি করা হয়। চিকিৎসাসেবা তদারকি করে বিশেষ টিম। আর গত মঙ্গলবার থেকে সারাদেশের সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সাধারণ রুটিন অনুযায়ী শুরু হয়েছে।

সরকারী হাসপাতালে রোগী সেবা নির্বিঘœ রাখতে চিকিৎসকদের ঈদের আগেই নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ঈদের ছুটিতে রোগী সেবা নিয়ে কোন গাফিলতি সহ্য করা হবে না। রোস্টার পদ্ধতিতে সব হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ঈদের ছুটিতে হাসপাতালে রোগী সেবার দুর্বিষহ চিত্র দেখা যায়। চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একযোগে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যান। এতে রোগীরা হাসপাতালের স্বাভাবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে, এসব থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে রোগী সেবা নিয়ে কোন অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে চিকিৎসকদের হুশিয়ার করে দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে এবার নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেননি সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ঈদের পরপরই আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনে বের হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

ঈদের ছুটির দিলগুলোতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর সরকারী হাসপাতালগুলোতে ব্যতিক্রম ও স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা পেয়েছে রোগীরা। প্রতিবছরই ছুটির দিনগুলোতে সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। চিকিৎসক ও নার্সের অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। রাজধানীর বিভিন্ন সরকারী হাসপাতাল ঘুরে এবার দেখা গেছে ব্যতিক্রম চিত্র। নগরীর সব হাসপাতালেই পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা ছিল সীমিত পরিসরে। ঈদের ছুটিতেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নতুন নতুন রোগী চিকিৎসা নিতে যায়। তাদের একজন হলেন মোঃ বেলাল। টঙ্গীতে থাকেন তিনি। তার ডান পা ভেঙ্গে গেছে। গত রবিবার জরুরী বিভাগে সেবা নিচ্ছেন তিনি। ইতোমধ্যে ভর্তি হওয়ার অনুমতি পেয়েছেন। তার ভাই আব্দুল জলিল জনকণ্ঠকে জানান, চিকিৎসাসেবা পেতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরই ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানান আব্দুল জলিল। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়েও চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে বর্হিবিভাগে বেশি রোগী দেখা যায়নি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মিজানুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় সামান্য পরিবর্তন আসে। তবে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকে। স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক রোস্টার তৈরি করা হয়। অপারেশন থিয়েটার চালু থাকে। বিশেষ টিম চিকিৎসাসেবা তদারকি করে। তিনি স্বীকার করেন, ঈদে কিছুসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী ছুটিতে যেতে পারেন। কিন্তু এমন অবস্থার প্রেক্ষিতেই চিকিৎসাসেবার কৌশল সাজানো হয়েছে বলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মিজানুর রহমান জানান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকে। তবে হাসপাতালে আগত নতুন রোগীর সংখ্যা ছিল কম। ঈদের আগেই চিকিৎসাধীন অনেক রোগীকে ছাড় দেয়া হয়। ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর সংখ্যাও কম ছিল। চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতি ছিল বেশ লক্ষণীয়। তবে ছুটির দিনগুলোতে অপারেশনের তালিকা সীমিত করা হয়। ডি ব্লকের ১৬ তলায় মেডিসিন বিভাগে পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার নুরুল ইসলাম (৪৩)। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, চিকিৎসক ও নার্সরা সেবা দিচ্ছেন। তবে হাসপাতালে প্যাথলজিসহ অন্যান্য মেডিক্যাল পরীক্ষাগুলো বন্ধ থাকায় একটু অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান নুরুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ব্লকে গিয়েও চিকিৎসাসেবার সন্তোষজনক চিত্র পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান জনকণ্ঠকে জানান, স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা চালু রাখার সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিছুসংখ্যক চিকিৎসক ছুটিতে গেলেও চিকিৎসাসেবায় এর প্রভাব পড়েনি। ছুটির দিনে দুই-এক দিনের জন্য বহির্বিভাগ বন্ধ থাকে। অপারেশন থিয়েটার সর্বক্ষণিক খোলা ছিল বলে জানান অধ্যাপক কামরুল হাসান খান। শেরেবাংলা নগরের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেও ঈদের আগে চিকিৎসাধীন অনেক রোগীকে ছুটি দেয়া হয়। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও কম ছিল। বহির্বিভাগে ভিড় ছিল না বললেই চলে। জরুরী বিভাগে রোগী আসতে দেখা গেছে। চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের অভিভাবকরা জানান, ছুটিতে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা কম থাকে। তবে চিকিৎসাসেবা তেমন ব্যাহত হয় না। পরিচালক অধ্যাপক উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, ঈদে ভর্তি হওয়ার রোগীর সংখ্যা কমে যায়। চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা একটু কম হলেও রোস্টার তৈরি করার কারণে চিকিৎসাধীন রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়নি। তবে বহির্বিভাগে বেশি রোগী দেখা হয়নি। এছাড়া হাসপাতালের অন্য সব কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল বলে জানান অধ্যাপক উত্তম কুমার বড়ুয়া। ঈদের ছুটিতে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়। খোলা ছিল জরুরী বিভাগ। চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ছিল কম। তাই সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স দিয়েও চিকিৎসাসেবা সচল রাখা সম্ভব হয়েছিল বলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মোঃ রাশিদুল হাসান জানান। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এ সময়ে এমনিতেই এ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কম থাকে। ওয়ার্ডগুলোতে অনেক বেড খালি ছিল। কিছুসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স ছুটিতে গেলেও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়নি। আর গত মঙ্গলবার থেকে হাসপাতালের সবকিছুই সাধারণ রুটিন অনুযায়ীই চলছে বলে জানান অধ্যাপক মোঃ রাশিদুল হাসান। রাজধানীর অন্য সব সরকারী হাসপাতালেও স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা চালু থাকে বলে জানা গেছে।

ঈদের ছুটিতে এবার রাজধানীর সরকারী হাসপাতালগুলোতে সন্তোষজনক চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) অধ্যাপক ডাঃ মোঃ সামিউল ইসলাম সাদি জনকণ্ঠকে জানান, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সরকারী চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতির হার অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন সময় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও শক্তিশালী মনিটরিং টিম সচল থাকায় কাজে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ থাকছে না। ঈদের ছুটিতেও সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতোমধ্যে দেশের প্রত্যেক সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এছাড়া প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী রোস্টার তৈরি করতে দেয়া হয় বিশেষ নির্দেশনা। ঈদের আগের ৩ দিন এবং ঈদসহ পরের ৪ দিন জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ডাক্তার, নার্স ও সুসজ্জিত এ্যাম্বুলেন্স এবং মেডিক্যাল টিম নিয়োজিতকরণসহ প্রাথমিক চিকিৎসার পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে ঈদের ছুটিতে অন্যান্য বছরের তুলনায় ব্যতিক্রম ও প্রত্যাশিত ভাল চিকিৎসাসেবা লক্ষ্য করা গেছে বলে জানান অধ্যাপক ডাঃ মোঃ সামিউল ইসলাম সাদি।

এদিকে চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে একের পর এক উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথমে দেশের কিছুসংখ্যক সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছিল। তখন চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিতে বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থাপিত বায়োমেট্রিক মেশিন নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছিল খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতর। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ৮ জুলাই সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ ইহতেশামুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত আদেশ পাঠানো হয়েছে সিভিল সার্জন এবং সব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের কাছে। এতে বলা হয়Ñ সম্প্রতি দেশের সব সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক আদেশে নিজ নিজ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে হাজিরা মনিটরিংয়ের জন্য স্থাপিত বায়োমেট্রিক মেশিন নষ্ট করার বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে তিন কর্মদিবসের মধ্যে অধিদফতরকে অবহিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় আরও দুই কর্মদিবস সময় বেঁধে দিয়ে ওই সব যন্ত্র নষ্টের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া এবং আগের নির্দেশ কেন কার্যকর হয়নি তা ব্যাখ্যাসহ জানাতে বলা হয়। তা না হলে যে কর্মকর্তারা তথ্য পাঠাননি, তাদের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়েছিল ওই চিঠিতে। কিন্তু তাতেও সাড়া না পেয়ে দেশের সব সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বায়োমেট্রিক স্থাপন এবং তা সংরক্ষণে পরিপত্র জারি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এবার উপস্থিতির হার বাড়াতে সর্বশেষ টেলিফোনে মনিটরিং ও সরেজমিন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এখন থেকে আবশ্যিকভাবে ল্যান্ডফোনে প্রতিমাসে দুইবার দায়িত্বপ্রাপ্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের উপস্থিতি পরিবীক্ষণ করবেন। এছাড়াও প্রতি দুই মাসে একবার সেখানে সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রতিবেদন দাখিল করবেন। বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়ার ক্ষেত্রে মনিটরিং ও সরেজমিন পরিদর্শনের পারফর্মেন্স পরীক্ষা করে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।