১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কক্সবাজারে ফের দালাল চক্র প্রকাশ্যে, মানবপাচার শুরু!

  • মিয়ানমার থেকে ফিরেছে ১৫৫ জন

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাগরপথে মানবপাচার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বহু গণকবরের সন্ধান লাভ, কঙ্কাল-লাশসহ ওই দুই দেশে দালালদের বন্দীশিবির থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার এবং মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশীদের ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও ফের মানবপাচার শুরু করেছে দালাল চক্র। বুধবার মিয়ানমারে উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী ১৫৫ জনকে ফেরত আনা হয়েছে দেশে। ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দ ভ্রমণের নামে আসা উত্তরবঙ্গের শতাধিক ব্যক্তিকে চিহ্নিত দালাল চক্র বুধবার মধ্য রাতে ট্রলারে করে উখিয়ার ইনানী থেকে মালয়েশিয়ায় পাচার করে দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে অতীতের ন্যায় সেন্টমার্টিনের অদূরে মিয়ানমার অভ্যন্তরে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজ নেই। মাছ ধরার ফিশিং ট্রলারে করে ওই সব লোকদের সরাসরি সাগরপথে পৌঁছে দেয়া হবে থাইল্যান্ড সীমান্তে। বোটটি ফিরে আসার সময় মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসবে ইয়াবার চালান। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া আগের নির্ধারিত স্থান বাদ দিয়ে সেখানকার দালালরা ভিন্ন জায়গায় নিয়ে উঠাবে তাদের। উখিয়ার সোনাপরপাড়া অঞ্চলের গডফাদার ও দালাল চক্র গ্রেফতার এড়াতে প্রায় দুই মাস ধরে পালিয়ে থাকলেও ঈদ উপলক্ষে তারা ফের প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে উখিয়া পুলিশের কতিপয় লোভী কর্মকর্তার সঙ্গে দালালদের গ্রেফতার না করার জন্য মোটা অঙ্কের টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে মানবপাচারকারীরা ঈদ-উল-ফিতরের বাহনায় নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরেছে। এ সুযোগে তারা ফের মানবপাচার কাজটি সেরে অন্তত ৩ কোটি টাকা কামাই করে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ব্যক্তিদের দেশটির সরকার সেখানে হোটেল রেস্তরাঁ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় চাকরি দিচ্ছে। তারা নির্দ্বিধায় সেখানে বসবাস ও অধরা থেকে ভাল বেতনে চাকরি পেয়েছে। এ খবর প্রচার করে উত্তরবঙ্গের দালালদের মাধ্যমে লোকজন সংগ্রহ করে সোনাপরপাড়ার চিহ্নিত মানবপাচারকারী, সানাউল্লাহ, শামসুল আলম সোহাগ, নুরুল কবির, আবুল কালাম, কালা জমির, জালাল ও বেলাল মেম্বার প্রায় শতাধিক মানবের একটি চালান বুধবার মধ্য রাতে পাঠিয়েছে মালয়েশিয়ায়। গত দুই মাস ধরে প্রশাসন মানবপাচারকারীদের ধরপাকড় আরম্ভ করায় মানবপাচার কাজ আপাতত থমকে যায়। দালাল চক্র এলাকায় নেই বিধায় মানবপাচারের ঘাটে এতদিন ধরে যায়নি পুলিশ-বিজিবিসহ প্রশাসনের লোকজন। প্রায় ২ মাস একেবারে ফাঁকা ছিল মানবপাচারের একাধিক ঘাট। ঈদ উপলক্ষে বাড়িঘরে আসতে পেরে চিহ্নিত দালালরা ওই সুযোগ হাতছাড়া করেনি বলে সূত্র জানিয়েছে। সূত্র আরও জানায়, ঈদের পরদিন থেকে উত্তরাঞ্চলের লোকজনকে ইনানী পাথুরে বিচে বেড়ানোর নাম করে নিয়ে আসা হয়। সন্ধ্যার পর তাদের নিয়ে জমায়েত করা হয়েছিল জুম্মাপাড়ায় চিহ্নিত বড়মাপের দালাল সানাউল্লাহর বাড়িতে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে সোমবার তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় মাঝ সাগরে। মঙ্গলবার যোগাড় হওয়া লোকদের আরেকটি ট্রলারে করে পৌঁছানো হয় অপেক্ষমাণ ওই ট্রলারে। জানা গেছে, প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে দালালদের মানবপাচারের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে বর্তমানে। ইতোপূর্বে দুই লাখ টাকা পর্যন্তক ধার্য থাকলেও মালয়েশিয়ায় চাকরি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগের বাহনায় বর্তমানে তা বাড়িয়ে আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে বলে জানা গেছে।

সচেতন মহল জানায়, দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ না করলে মানবপাচার কাজ কখনও বন্ধ করা যাবে না। ইতোপূর্বে পুলিশ যাদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল, তারা একশ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে টাকার জোরে ওই পুলিশের দুর্বল রিপোর্টের কারণে বেরিয়ে গেছে জেলহাজত থেকে। এ ব্যাপারে উখিয়া থানার ওসি নতুন করে মানবপাচারের বিষয় অবগত নয় দাবি করে বলেন, মানবপাচারকারীদের পাওয়া মাত্রই গ্রেফতার করা হবে।

১৫৫ জন দেশে ফিরেছে ॥ সাগরের মিয়ানমার উপকূলে উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের মধ্যে থেকে তৃতীয় দফায় আরও ১৫৫ জন বাংলাদেশীকে ফেরত এনেছে বিজিবি। বুধবার দুপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি ও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের মধ্যে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠক শেষে ঘুমধুম সীমান্ত পয়েন্ট হয়ে এদের দেশে ফেরত আনা হয়েছে। দুই মাস পর দেশে ফিরে এসেছে মিয়ানমার সমুদ্র উপকূল থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার বাংলাদেশী ১৫৫ যুবক ও কিশোর। পতাকা বৈঠকের পর বিজিবির কাছে এসব বাংলাদেশীকে হস্তান্তর করে মিয়ানমারের ইমিগ্রেশন বিভাগ। তবে সেখানে থাকা আরও ৩৭৯ জন বাংলাদেশীকে প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণের কথা জানিয়েছে বিজিবি কর্তৃপক্ষ।

বুধবার বেলা পৌনে ১১টায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম জিরো পয়েন্টে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঢেকিবনিয়া বিজিপি ক্যাম্পে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের ১৬ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন কক্সবাজার বিজিবির ১৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোঃ রবিউল ইসলাম। অপরদিকে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমার ইমগ্রেশন ডিপুটি ডিরেক্টর ইউ স নাইং। প্রসঙ্গত ২১ মে সমুদ্র উপকূলে ভাসমান অবস্থায় ২০৮ অভিবাসীকে উদ্ধার করে মিয়ানমার কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। এদের মধ্যে যাচাইবাছাই শেষে বাংলাদেশী হিসেবে শনাক্ত ১৫০ জনকে ৮ জুন, ৩৭ জনকে ১৯ জুন ফেরত আনা হয়। ২৯ মে মিয়ানমার আরও ৭২৭ অভিবাসীকে উদ্ধার করে এদের অধিকাংশই বাংলাদেশী বলে তারা দাবি করে আসছিল। এদের মধ্য থেকে বুধবার ১৫৫ জনকে স্বদেশে ফেরত আনা হয়। এ নিয়ে ৩ দফায় বাংলাদেশ ৩৪২ জন নাগরিককে ফেরত এনেছে দেশে।

এর আগে বুধবার সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের সময় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম জিরো পয়েন্টে দিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যান বিজিবির ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। এরপর বেলা ১১টায় শুরু হয় পতাকা বৈঠক। প্রায় ৩ ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে আলোচনা হয়। এরপর চলে ১৫৫ বাংলাদেশীকে বুঝিয়ে নেয়ার কার্যক্রম। বৈঠক আর বুঝিয়ে নেয়ার কার্যক্রম শেষ করে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ১৫৫ বাংলাদেশী নাগরিককে নিয়ে দেশে ফেরত আসে বিজিবি প্রতিনিধি দল। মিয়ানমারের ঢেকিবনিয়া সীমান্তে বিজিপি ক্যাম্পে মিয়ানমার ইমিগ্রেশন এ্যান্ড ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে বিজিবির পতাকা বৈঠক শেষে ফেরত আসা ১৫৫ বাংলাদেশীর মধ্যে ১৩টি জেলার নাগরিক রয়েছে। এর মধ্যেÑ নারায়ণগঞ্জের ৪০ জন, ঝিনাইদহ জেলার ১৩, মাদারীপুরের ১৪, কুষ্টিয়ার ৪, মাগুরার ৬, পাবনার ১২, যশোরের ৮, সিরাজগঞ্জের ২৬, চুয়াডাঙ্গার ১১, কুমিল্লার ৬, জয়পুরহাটের ৫, সুনামগঞ্জের ৮ ও সাতক্ষীরার ২ জন রয়েছে।

ফেরত আনা ওই সব বাংলাদেশীদের কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় উপস্থিত থেকে ১৫৫ বাংলাদেশীকে বুঝে নেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ। সেখান থেকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ তাদের নিয়ে আসে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। ওই কেন্দ্রে তাদের সবকিছু দেখাশুনার দায়িত্ব দেয়া হয় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমকে। এদিকে মিয়ানমার থেকে বৈঠক শেষে ঘুমধুম সীমান্ত এলাকায় ফিরে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এমএম আনিসুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, মিয়ানমারে থাকা আরও ৩৭৯ জন বাংলাদেশীকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।