২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্রিং ক্রিং ক্রিং

বোর্ড থেকে কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার সময় সদর্পে ঘোষণা করা হয়েছিল, উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত শুধু নয়, গ্রাহকদের সকল সমস্যার দ্রুত সমাধান করা হবে। কিন্তু হা হতোস্মি! ‘সকলি গরল ভেল’ যেন। সেবার মান এমনই হয়েছে যে, বাংলাদেশ টেলিফোন এ্যান্ড টেলিগ্রাম বোর্ড থেকে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডে রূপান্তরিত ও উন্নীতকরণের পরও গ্রাহকদের একটি বড় অংশ ল্যান্ডফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিচ্ছেন। নিম্নমানের সেবা, গ্রাহকদের অভিযোগ সময়মতো আমলে না নেয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সনাতনী মানসিকতার কারণে রাষ্ট্রীয় পরিচালনাধীন প্রতিষ্ঠানটির এই পতন ধারা। ২০০৯ সালে যেখানে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৯ লাখ ১৭ হাজার, সেখানে তা কমে গত মার্চ মাস পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজারে। গ্রাহকরা বলছেন, নিম্নমানের সেবাই তাদের ল্যান্ডফোন বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে। বাস্তবতা এই যে, বেশিরভাগ সময় ভাল সেবা পাওয়া যায় না। এছাড়া মাসে অন্তত দু’বার ফোনটি অচল হয়ে পড়ে। বার বার অভিযোগ দিয়েও সময়মতো সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অভিযোগের পর সেবা দিলেও অনেক সময় লাইনম্যানরা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দাবি করেন। বিদেশে কথা বলার সময় ভয়েস কোয়ালিটি খুবই নিম্নমানের পাওয়া যায়।

ল্যান্ডফোন গ্রাহক এ্যাসোসিয়েশনের মতে, গ্রাহকসেবা উন্নতির লক্ষ্যেই আগের টিএ্যান্ডটিকে সরকার তিনটি পৃথক কোম্পানিতে রূপান্তরিত করে। কোম্পানির লোকদের অদক্ষতা আর দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বিপাকে ফেলেছে। ফলে গ্রাহকরা ক্রমেই এখান থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য হচ্ছে, প্রকৌশলীর সংখ্যা কম থাকায় সঠিকভাবে সেবা দেয়া যাচ্ছে না। হাতেগোনা কয়েকজন প্রকৌশলী মেগাসিটি ঢাকার সেবা দিয়ে আসছেন। অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রেও একই দশা। নানাবিধ কারণে ল্যান্ডফোনের ব্যবহার হ্রাস পেয়ে সেলফোনের ব্যবহার সর্বত্র বেড়েছে ব্যাপকার্থে।

দিনে-রাতে যে কোন সময় বেজে উঠত রিংটোন ক্রিং ক্রিং ক্রিং। ঘরে, অফিসে, আদালতে, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে ল্যান্ডফোনের শব্দ ছড়িয়ে যেত ইথারে। নাটক, সিনেমা, গল্প, উপন্যাসে এর গুরুত্ব ছিল বেশ মধুময়, রোমাঞ্চকর কিংবা কখনও বিপজ্জনকও। ‘রং নাম্বার’, ‘ক্রস কানেকশন’, ‘ট্রাংকল’, ‘রিড়ায়াল’ শব্দগুলোও ক্রমশ লুপ্ত হয়ে আসছে ল্যান্ডফোন ব্যবহার হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গেই। সেই এক সময় ছিল; ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে মফস্বল শহরের সঙ্গে সংযোগ মিলত অর্থাৎ ‘ট্রাংকল’। বসার ঘরে, বেডরুমে, কিংবা দফতরে ঠাঁই পাওয়া ল্যান্ডফোনগুলোর সেট এখন জাদুঘরে ঠাঁই পাওয়ার অবস্থায় যেন। টেলিফোন শিল্প সংস্থার বেহাল অবস্থা কাটানোর জন্য যেন কেউ নেই আর। সর্বত্র তার অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতিবাজ আর অদক্ষদের ভিড়। অথচ সংস্থার নিজের স্বার্থেই প্রতিষ্ঠানটিকে সক্রিয়, সচল আর কার্যকর করে তোলা উচিত। এর সঙ্গে তাদের ভবিষ্যতও জড়িত। বিটিসিএল ল্যান্ডফোনে ত্রিমুখী সেবা চালু করেছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তা অকার্যকর হয়ে গেছে। গত বছরের শেষ দিকে ল্যান্ডফোনে ভয়েস, ডাটা ও ডিশ টিভি দেখার সুবিধা রেখে চালু করা সেবাটি গ্রাহকদের নজর কেড়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে এক লাখ ফোন এই সেবার আওতায় আনা হয়েছিল। নামকরণ করা হয়েছিল ‘ট্রিপল প্লে’। কিন্তু এই সেবা কারিগরি ত্রুটির জন্য গ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছানো যায়নি। অথচ ঢাকঢোল পিটিয়ে এই সেবার প্রচার করা হয়েছিল। এই সেবা দিতে রাজধানীর চারটি টেলিফোন এক্সচেঞ্জের ৭ ডিজিটের নম্বরগুলো ৮ ডিজিটে রূপান্তরিত করা হয়। তদুপরি ফিক্সড ফোন নীতিমালায় পরিবর্তন এনে সেবা সম্প্রসারণের কথা বলা হচ্ছে। টেলিফোন মন্ত্রণালয়ে নয়া মন্ত্রী যোগ দিয়েছেন। তরুণ এই মন্ত্রী যোগ দিয়েই বলেছেন, তিনি আধুনিকায়ন করবেন ফোন ব্যবস্থায়। আশা করা যায়, ল্যান্ডফোন সেবা সম্প্রসারণে অপারেটরদের আধুনিকায়ন, ব্যবসাবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। ভুয়া আইপিও ব্যবহার বন্ধ হবে। রাজস্ব আদায় বাড়বে। জনগণ সহজেই সেবা পাবেÑ এমন প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের।