১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমগ্র জাতির শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা

  • একে মোহাম্মদ আলী শিকদার

নাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী। পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ওরফে ফকা চৌধুরী। নিবাস চট্টগ্রাম জেলা, বাংলাদেশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাকা চৌধুরীকে ফাঁসির দ-ে দ-িত করেছে। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। জামায়াতের মশহুর যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে মিল আছে। ও! আরেকটু পরিচয় বাকি আছে। তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তানের সময় আইয়ুব খানের মুসলিম লীগ করেছেন। তাতে কোন দোষ নেই। ওই সময়ে এদেশের অনেক মানুষই মুসলিম লীগ করেছেন। কিন্তু ফকা ও সাকা চৌধুরী ভিন্ন চিজ।

পিতা-পুত্র মিলে একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী হয়ে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালীদের হত্যা করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছেন, হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়েছেন, অবাধে লুটতরাজ চালিয়েছেন। সুতরাং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাকা চৌধুরী ফাঁসির দ-ে দ-িত হয়েছেন। ফকা চৌধুরী অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছেন। পাকিস্তানের সময় বহুদিন তিনি আইয়ুব খানের মন্ত্রী ছিলেন।

ট্রাইব্যুনাল থেকে ফাঁসির আদেশের দিন সাকা চৌধুরীর পরিবারের লোকজন জামায়াতী স্টাইলে ভি-চিহ্ন দেখিয়েছেন। মানুষ যখন নির্লজ্জ হয় তখন নাকি ঔদ্ধত্য আচরণ করে। এই নির্লজ্জতার শিকড় কোথায় তা আমরা বুঝতে অক্ষম নই। তারা বোধ হয় এখনও ভাবছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আগ মুহূর্তে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাকিস্তানীদের উদ্ধারের জন্য যেমন বঙ্গোপসাগরে এসেছিল, তেমনি ২০১৫ সালেও হয়ত বাংলাদেশী চাদরে জড়ানো পাকিস্তানীদের বাঁচাবার জন্য শেষ মুহূর্তে সে রকম একটা কিছু হবে। কিন্তু পাকিস্তানপ্রীতিতে যারা অন্ধ তারা ভুলে যায় ২০১৫ সালের বাংলাদেশ অন্যরকম শক্তিতেও বলীয়ান। লাখো-কোটি তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্র বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে যুদ্ধাপরাধীমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য। লাল-সবুজের কাফনের কাপড় জড়িয়ে যে কোন কিছুর জন্য তারা সর্বদা প্রস্তুত। একাত্তরের মতো জয় বাংলা বলে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে প্রস্তুত, কিন্তু মাথা নোয়াবে না। যে কোন বিদেশীদের অযাচিত কথা উপেক্ষা করার মতো শক্তি বাংলাদেশ এতদিনে অর্জন করেছে।

জন কেরি ও বান কি মুনের টেলিফোন কাদের মোল্লা-কামারুজ্জামানকে রক্ষা করতে পারেনি। এই যুদ্ধাপরাধীদের কপাল ভাল বলতে হবে। তারা বিচার প্রক্রিয়ায় এত সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, যার উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সংক্ষিপ্ত বিচার করে সব নাজি যুদ্ধাপরাধীকে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হবে। এই কঠোর অবস্থানের পেছনে দুটো যুক্তি কাজ করেছিল। প্রথমত. নীতি-নৈতিকতা, আবেগ বা আইনের যুক্তিতর্কের ফাঁকফোকর দিয়ে এই অপরাধীদের কেউ পার পেয়ে গেলে সেটা হবে বিশ্ব মানবতার পরাজয়। আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা ভীতু, অযোগ্য, দূরদৃষ্টিহীন এবং ক্ষমতালোভী শাসক হিসেবে চিহ্নিত হব। দ্বিতীয়ত. যুদ্ধ চলাকালে লাখ লাখ নিরস্ত্র মানুষ ও নারী-শিশুকে নির্বিচারে তারা হত্যা করেছে। সামান্যতম আইনের কোন কথা তারা একবারের জন্যও ভাবেনি। এই ফ্যাসিস্ট মনোভাবাপন্ন দানবগণ বেঁচে থাকলে আবারও বিশ্বে এর থেকেও আরও বড় মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ফায়ারিং স্কোয়াডের ব্যাপারে জোসেফ স্ট্যালিনের বিরোধিতা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন সপ্তাহ আগে (১২ এপ্রিল-১৯৪৫) রুজভেল্টের আকস্মিক মৃত্যু এবং চার্চিল ব্রিটেনের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার কারণে ফায়ারিং স্কোয়াডের সিদ্ধান্ত আর কার্যকর হয়নি (সূত্র : দ্য নুরেমবার্গ ট্রায়াল-পল রোনাল্ড, লন্ডন ২০১০)। তবে ১৯৪৫ সালের ২০ নবেম্বর বিচার শুরুর মাত্র এক বছরের মাথায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১২ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিচারের সময় যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে স্বেচ্ছায় কোন আইনজীবী যোগ দেয় না। আর বাংলাদেশে জামায়াত-বিএনপির আইনজীবীরা দলেবলে কোমর বেঁধে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার জন্য এক প্রকার অঘোষিত যুদ্ধ চালাচ্ছে।

ফিরে আসি সাকা চৌধুরীর কথায়। ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপীল শুনানি শেষ করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ের দিন ধার্য করেছে ২৯ জুলাই। ভেবেছিলাম রায়টা শোনার পর এ সম্পর্কে লিখব। কিন্তু কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের টেলিফোন পাচ্ছি। তাদের সবার কথা আমি যেন সাকা চৌধুরীর ঔদ্ধত্য আচরণ এবং কীর্তিকলাপ নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে একটা লেখা পত্রিকায় লিখি। আমি বলেছি সারাদেশের মানুষ সাকা চৌধুরীর কীর্তি সম্পর্কে জানে, নতুন করে তো আর কিছু লেখার নেই। কিন্তু একাত্তরের মতো দুঃসময়ের সতীর্থদের অনুরোধ বলে কথা, রাখতেই হবে। তাদের সঙ্গে আলাপে বুঝতে পারি সারাদেশের মানুষ জামায়াতী যুদ্ধাপরাধীদের রায় শোনার জন্য যতটুকু না আগ্রহী, তার থেকে শতগুণ আগ্রহী হয়ে আছে সাকা চৌধুরীর চূড়ান্ত রায় শোনার জন্য। সর্বত্রই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা, দেখা হলেই একজন আরেকজনকে বলছে, এই! ২৯ জুলাইয়ের কথা মনে আছে তো। ফাঁসির দ- থেকে সাকা চৌধুরী যদি বেঁচে যায়, তাহলে সেটা হবে বাংলাদেশের জন্য মহাদুর্যোগের পূর্বাভাস এবং লজ্জা ও অপমানের বিষয়। মানুষ তখন কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে সেটা বুঝতে পারলেও আগ বাড়িয়ে বলতে চাই না। সে কারণেই লেখাটা ২৯ জুলাইয়ের পরে লিখতে চেয়েছিলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের সাকা চৌধুরী বলতেন চুক্তিযোদ্ধা।

বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা, বাঙালী সংস্কৃতি, জাতীয় সঙ্গীতÑ এর সবকিছুকে হেয় ও ছোট করার জন্য এহেন কোন ঔদ্ধত্য আচরণ, অঙ্গভঙ্গি ও কথাবার্তা নেই যা সাকা চৌধুরী বলেনি বা করেনি। জামায়াতের সব যুদ্ধাপরাধী মিলে বাংলাদেশকে যত না অবমাননা ও অবজ্ঞা করেছেন, তার থেকে এক শ’ গুণ বেশি করেছেন সাকা চৌধুরী। সে কারণেই সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ এখন সাকা চৌধুরীর চূড়ান্ত রায় শোনার জন্য অধীর আগ্রহে একটা শ্বাসরুদ্ধকর দিন পার করছে। ২৯ জুলাইয়ের অপেক্ষায় আছে। সাকা চৌধুরীর পিতার পার্টি মুসলিম লীগ বাংলাদেশে এখন প্রায় বিলুপ্ত। অনেক বছর ধরে সাকা বিএনপির সর্বোচ্চ ফোরাম স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য। যোগ্য পিতার উপযুক্ত সন্তান সাকা চৌধুরী বিএনপির কাঁধে বসে একাই এক শ’ হয়ে মুসলিম লীগের সাচ্চা বান্দার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে জামায়াতও তার কাছে হার মেনেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য এবং অশালীন মন্তব্য করলেন সাকা চৌধুরী। বিএনপি থেকে বহিষ্কারও হলেন। মানুষ ভাবল তাহলে এবার বুঝি বিএনপি অন্তত একজন সাচ্চা পাকিস্তানীর কবল থেকে মুক্ত হলো। কিন্তু না, কয়েকদিন পর দেখা গেল বহিষ্কারাদেশ বাতিল, সাকা স্বমহিমায় স্বস্থানে ফিরে এসেছেন।

শুধু তাই নয়, ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর সাকা চৌধুরীর প্রমোশন হলো। তিনি এক লম্ফে কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হলেন। এখানেই শেষ নয়, আরও উর্ধারোহণ অব্যাহত থাকল। বাংলাদেশের সব মানুষের প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে ওআইসির (অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স) মহাসচিব পদের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রার্থী করা হলো সাকা চৌধুরীকে। সারাদেশের মানুষের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা হতভম্ভ, বাকরুদ্ধ। একজন যুদ্ধাপরাধী, মানুষ হত্যাকারী, একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মনোনীত হলেন। ওআইসিসহ বিশ্বের মানুষের কাছে কী বার্তা গেল।

ওআইসিতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রার্থী হলেন এমন একজন মানুষ, যার কিনা বাংলাদেশের প্রতি সামান্যতম আনুগত্য নেই। বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন আপোসহীন (!) নেত্রী কেন নিজের সকল অপমান হজম করে সাকা চৌধুরীকে একের পর এক প্রমোশন দিচ্ছেন। মানুষের মনে প্রশ্নের শেষ নেই। তবে তখনকার বিএনপি-জামায়াত সরকার বাংলাদেশের মান-মর্যাদার কথা না ভাবলেও ওআইসির বিবেকবান সদস্যগণ ঠিকই এ যাত্রায় বাংলাদেশের মান রক্ষা করলেন। সাকা চৌধুরীকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করলেন। সেবার ওআইসির মহাসচিব হিসেবে তারা নির্বাচিত করলেন তুরস্কের প্রার্থীকে।

বিদেশের মাটিতে ক্যানভাস করার জন্য রাষ্ট্রের তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করার পর কয়টা ভোট পেয়েছিলেন সে কথা না বলাই শ্রেয়, যাই হোক না কেন সাকা চৌধুরী বাংলাদেশের সাইনবোর্ড বুকে ঝুলিয়ে ভোট ভিক্ষায় নেমেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে সাকা চৌধুরীর এত প্রভাব ও ঔদ্ধত্যের শিকড় কোথায়? ১৯৯৯ সালে ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার ইরফান রাজা একবার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছিলেন। সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। হাজার হাজার মানুষ ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস ঘেরাও করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ইরফান রাজাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেয়।

সাকা চৌধুরী ইরফান রাজার বাসায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সলাপরামর্শ করেন এবং বহিষ্কারাদেশ বাতিলের জন্য ঢাকার কূটনীতিকপাড়ায় দৌড়াদৌড়ি করেন। এহেন সাকা চৌধুরী এখনও বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য পদে বহাল আছেন। তার অগস্ত্যযাত্রা ঠেকানোর জন্য বিএনপির বাঘা বাঘা ব্যারিস্টার নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন আসে, কিন্তু কেন? সাকা চৌধুরীর কাছে বিএনপির এত দায় কিসের। এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর বাইরের লোকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী গত ৪ জুন ইত্তেফাকে একটি লেখার মধ্যে মন্তব্য করেছেনÑ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সুবিদিত। তাই যদি ঠিক হয়, তাহলে কিছুটা বোঝা যায় কেন সাকা চৌধুরী বিএনপির কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান চায় এখানে বাংলাদেশের খোলসে আরেকটি পাকিস্তান, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের কোন চিহ্ন থাকবে না। খোলসে থাকলেও অন্তরে থাকবে না। এই দুরাশা পূরণের জন্য পাকিস্তান ব্যবহার করে সাকা ও জামায়াতীদের মতো যুদ্ধাপরাধীদের। আর সে জন্যই সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় অপেক্ষা করছে ২৯ জুলাইয়ের জন্য। এখন বাংলাদেশের মানুষের সামনে বিশাল প্রশ্ন হলোÑ টু বি, অর নট টু বি!

লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা, ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

এই মাত্রা পাওয়া