২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আতঙ্কে ইরাকের লেখক-সাংবাদিকরা

  • অনুবাদ : এনামুল হক

সম্প্রতি ইরাকের লেখক ইউনিয়নের কার্যালয়সমূহে হামলা হয়েছে। প্রায় ৫০ জন কালো পোশাকধারী সশস্ত্র ব্যক্তি বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে লেখক ইউনিয়নের সদর দফতরের কয়েকটি কার্যালয়ে ঝটিকা হামলা চালায়। তারা কার্যালয়ের স্টাফ ও প্রহরীদের মারধর করে এবং ব্যাপক ভাংচুর চালায়। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক এ সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে সঙ্কীর্ণতাবাদ, উগ্রবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

এ হামলা ও তা-বে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ শুধু মর্মাহতই হয়নি, তাদের মধ্যে এমন আতঙ্কও দেখা দিয়েছে যে, দেশটা মৌলবাদী ও হিংসাশ্রয়ী ধর্মান্ধ মিলিশিয়াদের দ্বারা শাসিত একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে।

সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে সংগ্রামরত শিয়া সংগঠন পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের প্রতি জনসমর্থন দেখানোর জন্য মিডিয়ার ওপর সরকার ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টির সঙ্গে স্বঘোষিত ধর্মীয় চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ও হামলার সম্পর্ক আছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গত গ্রীষ্মে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাকের এক বিরাট অংশ দখল করে নেয়ার পর থেকে ইরাকের জনগণ সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে।

কয়েক ডজন সশস্ত্র লোক কালো রংয়ের সামরিক পোশাকে নম্বর-প্লেটহীন একটি মোটরযানে করে আসে। তারা ট্রাফিক অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য সাময়িক রোড ব্লক বসায়। তারপর অফিসে ঢুকে প্রহরী ও স্টাফদের কিছুক্ষণ জিম্মি করে রেখে আসবাবপত্র তছতছ করে। তারা স্টাফদের পরিচয়পত্র, টাকা-পয়সা, মোবাইল সব নিয়ে যায়।

ইউনিয়ন সভাপতি ফাদেল আমির এ হামলাকে ইরাক রাষ্ট্রটিকে তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের মতো একটি চরমপন্থী ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। সুপরিচিত সাহিত্য সমালোচক আমির হামলাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার করা এবং লেখকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে কাজ করে তাদের জীবনের নিরাপত্তা যে কত বিপন্ন, এ হামলার মধ্য দিয়ে তারই পরিচয় পাওয়া গেল।

হামলার দায়দায়িত্ব কেউ স্বীকার করেনি। তবে যে সামান্য তথ্যটুকু পাওয়া গেছে তাতে পর্যবেক্ষকদের মনে হয়েছে যে, একটা সুসংগঠিত শিয়া মৌলবাদী নেটওয়ার্ক এ হামলার পরিকল্পনা করেছে। ইরাকের ধর্মনিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থী বুদ্ধিজীবীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈরিতার প্রেক্ষাপটে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতি সম্পর্কে বৃহত্তর প্রশ্ন উঠেছে।

২০০৩ সালে মার্কিন হামলায় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ধর্মনিরপেক্ষ সরকার উৎখাত হওয়ার পর থেকে ইরাকী সমাজে ধর্মীয় ভাবধারা ও ক্রিয়াকলাপ বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর তরফ থেকে বাগদাদের নাইট ক্লাব, বার ও মদের দোকানে হামলা চালানো বিচিত্র কিছু নয়। এসব হামলা চালাতে গিয়ে কখনও কখনও তারা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করেই সেটা করেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, লেখক ইউনিয়ন অফিসে হামলাটি হয়েছিল পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার আগের দিন। এর আগেও বহুবার লেখক ইউনিয়নের সদস্যরা শিয়া মৌলবাদীদের হাতে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। সদাচরণ প্রসার ও পাপাচার রোধে নিয়োজিত বলে দাবিদার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের রাস্তায় বেশ দৌরাত্ম্য দেখা যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা তাদের দৃষ্টিতে পাপাচার বা অশোভন আচরণে লিপ্ত ব্যক্তিদের গায়ে হাত তুলেছে, মারধর করেছে, এমনকি গ্রেফতারও করেছে। গত জুলাই মাসে বাগদাদের একটি কথিত গণিকালয়ে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে দুই ডজন মহিলা ও দু’জন পুরুষকে হত্যা করে। প্রচলিত আচার-আচরণের পরিপন্থী আচরণের অভিযোগ তুলে গত কয়েক বছরে বহু তরুণকে হত্যা করা হয়েছিল। এসব হত্যাকা- এবং অন্য অনেক ঘটনার পেছনে কারা ছিল বা আছে তা নির্ণয়ের জন্য কখনই কোন তদন্ত চালানো হয়নি। তবে ইরাকীদের আনেকেই জানে, কারা দায়ী। তাদের মতে, এগুলো সবই স্থানীয় মিলিশিয়া ও ধর্মীয় গ্রুপগুলোর কাজ।

সাদ্দাম সরকারের পতনের পর ইরাকের লেখক, শিল্পী ও সাংবাদিকরা আশা করেছিল যে, নতুন শাসকরা অংশীদারিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য নয়া সংবিধানে পরিবর্তনের অঙ্গীকার রাখবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইরাকের বুদ্ধিজীবীরা সবচেয়ে বড় যে আশঙ্কাটি করেছিল সেটাই ফলেছে। শিয়া মৌলবাদী গ্রুপগুলো সাদ্দামের পতনের পর ক্ষমতায় এসেই তাদের ধর্মীয় মতাদর্শ ও রক্ষণশীল জীবনধারা চাপিয়ে দিতে শুরু করে। কট্টর রাজনৈতিক কোয়ালিশন সরকারের শাসনাধীন ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে বাক-স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিন্নমত মোটেও বরদাশত করা হয় না। আজকের ইরাকে জাতীয় সাংস্কৃতিক নীতি নেই, যেখানে বর্ণিত থাকবে সুস্পষ্ট মূল্যবোধ, থাকবে গণতন্ত্র ও বহুমত প্রসারের অগ্রাধিকার, থাকবে সৃজনশীল সমাজ টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা। ইরাক আজ পরিণত হয়েছে বিপজ্জনকভাবে অস্থিতিশীল একটি রাষ্ট্রে।

সাদ্দামপরবর্তী ইরাকে নিজের দফতরের ব্যাপারে আগ্রহী কোন সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিল না এবং এখনও নেই। সংস্কৃতি দফতরের সমস্ত পদ রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তদের কিংবা মোসায়েব-তোষামোদকারীদের দিয়ে ভরে আছে; যাদের সংস্কৃতি বিষয়ক কোন ক্রিয়াকলাপ নেই, এ সংক্রান্ত কোন পটভূমিও নেই। সযতেœ বাছাই করা হাজার হাজার লেখক, শিল্পী, সাংবাদিককে প্রতিবছর এ মন্ত্রণালয় থেকে পারিতোষিক হিসেবে আর্থিক সাহায্য দেয়া হয়। অথচ শিল্প-সংস্কৃতিকে ইরাকের জাতীয় সত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত করে কোন দর্শন নেই বা বিশেষিত লক্ষ্য নেই। জাতীয় ঐক্য জোরদার করে তুলতে শিল্প-সংস্কৃতির ভূমিকা সুনিশ্চিত করার কোন ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়নি। ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা সেখানে কদাচিত স্বীকৃত ও উৎসাহিত করা হয়।

বিপন্ন ও হতাশাগ্রস্ত ইরাকী বুদ্ধিজীবীরা সরকারের বিরোধিতা করার জন্য সংগঠিত হওয়া দূরে থাক, তাদের অনেকে সরকারের ভিতরকার বিভিন্ন চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে শাসকগোষ্ঠীর নীতির প্রতি সমর্থন জানায়। হয়রানির আশঙ্কায় কিংবা চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে অনেক ইরাকী লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী সারাজীবনের জন্য ইরাক ছেড়ে বাইরে পাড়ি জমিয়েছে। যারা ইরাকে থেকে গেছে কিংবা সেখানে থেকেই জীবিকা নির্বাহ করতে চায় তাদের হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে, নয়ত স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের আশ্রয় নিতে হবে।

মিডিয়াকে শ্বাসরুদ্ধ করতে কিংবা তাদের নীরবতা কিনে নিতে সরকার বা শাসক রাজনৈতিক শ্রেণীর পরিচালিত অভিযানেরও টার্গেট হয়েছে সাংবাদিকরা। ২০০৩ সাল থেকে শত শত মিডিয়াকর্মী সহিংসতায় নিহত হয়েছে। স্বাধীন মত ও পক্ষের অনুসারী এমনকি নিরপেক্ষ সাংবাদিকরাও ভয়ভীতি, হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছে।

গত ১২ বছরে ইরাকী মিডিয়া একটু একটু করে ক্ষমতার কাঠামো, বিশেষ করে সরকার ও শাসকচক্রের পুরোপুরি অনুগত হয়ে পড়েছে। ইরাকের সিংহভাগ মিডিয়া আউটলেট হয়ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সরকারের সঙ্গে যুক্ত, নয়ত শাসকগোষ্ঠীর অনুগত। প্রায় সকল মিডিয়া মালিক বা শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এমন ব্যক্তিÑ যাদের সাংবাদিকতার সঙ্গে কোন সংশ্রব নেই।

ইরাকের সাংবাদিকরা আজ তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের শিকার। তাদের মধ্যে ঝগড়া, বিবাদ ও কোন্দল আছে, অথচ পেশাদারিত্বের অভাব অতি লক্ষণীয়। ইরাকের মিডিয়ার মূলধারাটি আজ নখদন্তহীন। এদের কোন ক্ষমতা নেই। প্রভাব নেই। সাধারণ মানুষের কোন আস্থা মিডিয়ার ওপর নেই।

দেশের জাতীয় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ইরাকী মিডিয়া নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কারণ সাংবাদিকরা, যারা পার্টির প্রচারযন্ত্র চালাত তাদের সাংবাদিকতা সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা নেইÑ এমন অনুগত আমলাদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাবধানে বেছে নিয়ে সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিয়েছে।

ইরাকী সাংবাদিক সিন্ডিকেট নিরাপত্তা এবং আর্থিক পুরস্কার, পেনশন ও জমির মতো নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভের বিনিময়ে সরকার ও রাজনৈতিক এলিট শ্রেণীর সঙ্গে খায়খাতির জমিয়ে তাদের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ ও পেশাদারি সাংবাদিকতা না থাকায় সরকারের প্রচারণাই মিডিয়ায় ব্যাপক পরিসরে পরিবেশিত হচ্ছে। সাদ্দামের কয়েক দশকের শাসককাল থেকেই ইরাকীরা এমন অবস্থার সঙ্গে পরিচিত।

সূত্র : আল আহরাম উইকলি

নির্বাচিত সংবাদ