১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ ঈদ উত্তর আনন্দ ভাবনা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

এবার এই হিজরী ১৪৩৬ সন মোতাবেক ২০১৫ ইংরেজী সনে ঈদ-উল-ফিতর এসেছিল বৃষ্টিভেজা আনন্দ নিয়ে। ঢাকায় তো থেকে থেকে বর্ষণের মধ্যেও মসজিদে মসজিদে, ঈদগাহে ঈদের সালাত আদায়ে মানুষের সমাবেশে কোনরূপ কমতি ছিল না, ঈদ আনন্দ সর্বত্র সবখানে সমানভাবে বর্তমান ছিল।

সেকালে বর্ষা মৌসুমে বন্যাপ্লাবিত পল্লীগ্রামে ঈদের জামাত ভাসমান নৌকার উপর হওয়ার নজিরও রয়েছে। এখন সেই অবস্থা নেই। অনেক এলাকায় ঈদগাহ গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মসজিদের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।

মুঘল বাদশাহ্ শাহজাহানের আমলে সুবাহ বাংলার সুবাদার শাহজাদা শাহ্ সুজার নির্দেশক্রমে তাঁর দীউয়ান মীর আবুল কাসিম ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ঢাকার ধানম-িতে নির্মাণ করেন একটি ঈদগাহ, যা মুঘল স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন বহন করছে। এরশাদের আমলে হাইকোর্ট এলাকায় বিশাল পুকুর ভরাট করে জাতীয় ঈদগাহ নির্মিত হয়। যশোর শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি ঈদগাহ রয়েছে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ এপ্রিল এই বিশাল ঈদগাহ ময়দানে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী স্বাধীনতা উত্তরকালে সর্ববৃহৎ জনসভা করেছিলেন। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে মহিলাদের ঈদের জামাত হতো। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এমনি এক জামাতে ইমামতি করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

এই বছর (২০১৫ খ্রি:) সিয়াম শুরু হয়েছিল সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন এবং সিয়াম রাখার শেষ দিনও ছিল শুক্রবার। এই শুরু এবং শেষ শুক্রবার হওয়ায় রমাদানের তাৎপর্য এক অনন্য উচ্চতা লাভ করেছে।

ঈদের দিনে বৃষ্টি থাকায় আমি গাড়ি পাকিংয়ের সুবিধা বিবেচনা করে ইস্কাটনের সবজিবাগান মসজিদে সালাত আদায় করলাম। সালাত শেষে বর্ষণসিক্ত ফাঁকা ঢাকা মহানগরীর অন্য রকম সৌন্দর্য ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্রতি বছরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কার্জন হলের নিকটে মূসা মসজিদের পাশে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মাজার শরীফ জিয়ারত করলাম। উল্লেখ্য যে, গত ১৩ জুলাই ছিল এই মহামনীষীর মৃত্যুদিবস। তাঁকে স্মরণ করে বড় কোন আয়োজন হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। এই মাজার শরীফ এলাকাটাকে শহীদুল্লাহ্ স্কোয়ার রাখলে একটা বড় কাজ হবে বলে অনেকের মতো আমিও মনে করি। তিনি ছিলেন চলিষ্ণু বিদ্যা কল্পদ্রুম বা চলন্ত বিশ্বকোষ, তেমনি তিনি ছিলেন কামিল পীর এবং মহান সুফি। তাঁর নামের সঙ্গে সুফি শব্দটি ব্যবহার করা উচিত। তাঁর মাজার শরীফ জিয়ারত শেষে আমরা মেয়র হানিফ উড়ালসেতুর এপার থেকে ওপারে গেলাম আবার ফিরে এলাম। বাসায় ফিরলাম ১১টার দিকে অন্যকরম আনন্দ আমেজে।

একবার এক ঈদের দিনে সালাত আদায় করে ফিরে এসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হযরত আয়িশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হার হুজরা শরীফে একটা খাটিয়ার উপর শুয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। খাটিয়ার পাশে নিচে বসে একজন বালিকা আনমনে বুয়াস যুদ্ধের গীত মিষ্টি ইলহানে উচ্চারণ করছিলেন।

এমন সময় সেখানে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আন্হু এসে মেয়েটিকে ধমক দিলেন। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন : আবূ বকর! ওকে নিবৃত্ত করছেন কেন? প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ-উৎসব আছে, আমাদের আনন্দ-উৎস হচ্ছে এই ঈদ।

ঈদের দিন আসে বিজয়ের আনন্দ উল্লাস বহন করে। প্রথম ঈদ-উল-ফিতর পালিত হয় ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে। ঐ বছর ১৭ রমাদান তারিখে মদীনা মনওয়ারা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত বদর প্রান্তরে ৩১৩ জন সাহাবী সমন্বয়ে গঠিত মুজাহিদ বাহিনী কাফির-মুশরিক ১৩ শ’ জনের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সেনাপতি ছিলেন আল্লাহ্র রাসূল। যুদ্ধে ইসলামের বিজয় আসে। বদরের যুদ্ধ শেষে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বদরে তিন দিন অবস্থান করেন।

তিন দিন পর বিজয়ী বেশে মদীনা মনওয়ারায় প্রত্যাবর্তন করেন। ২৪ রমাদান মোতাবেক ২৪ মার্চ তিনি তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমাতুয যাহ্রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হার সঙ্গে হযরত আলী রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হুর বিয়ে দেন। এর কয়েক দিন পর শওয়ালের চাঁদ উদিত হয়। ১ শওয়াল পালিত হয় ঈদ-উল-ফিতর এক আনন্দঘন পরিবেশ।

রমাদান মাসে মাসব্যাপী সিয়াম পালনের মাধ্যমে নফ্সের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে নফ্সকে পরাজিত করে সায়িম, এ এক অনন্য বিজয়। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এক যুদ্ধাভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনকালে সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন : আমরা ছোট যুদ্ধ থেকে বড় যুদ্ধের দিকে ফিরছি। এই বড় যুদ্ধ হচ্ছে নফ্সের সঙ্গে যুদ্ধ।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ,

উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা),

সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।