১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খালেদার আইনজীবীর বক্তব্যে উত্তেজনা ৩ আগস্ট ফের শুনানি

খালেদার আইনজীবীর বক্তব্যে উত্তেজনা ৩ আগস্ট ফের শুনানি
  • দুই দুর্নীতি মামলা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের অর্থ সংগ্রহ করেছেন, এর দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। এ ধরনের লিখিত অভিযোগ আসার পরেই তদন্ত করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বাদী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদ খালেদার আইনজীবীর জেরার জবাবে এ সব কথা বলেন। পুরান ঢাকার বক্শিবাজারে কারা কর্তৃপক্ষের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আবু আহমেদ জমাদারের আদালতে বাদীকে জেরা করেন খালেদার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।

এদিকে, মামলা সংশ্লিষ্ট না হলেও ১/১১-এর সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা বিভিন্ন মামলার প্রসঙ্গ টেনে এনে বাদীকে জেরা করা বেআইনী বলে দাবি করেছেন দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল। তিনি বলেন, কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হেয় করার জন্যই এ সব বিষয় জেরায় টেনে আনা হয়েছে।

এর আগে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তবে এজলাসে বিচারকের ওঠার সময় সাড়ে ১০টা হওয়ায় ১০ মিনিট এজলাসের বাইরে নিজের গাড়িতেই অপেক্ষা করেন তিনি। বৃহস্পতিবার হালকা বেগুনি রংয়ের শাড়ি পরে আদালতে আসেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।

পরে সকাল সাড়ে ১০টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে প্রথমেই বিচারক খালেদা জিয়াসহ উপস্থিত সকলকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাক্ষ্য বাতিলে আমরা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম। আদালত আমাদের আবেদনটি খারিজ করেছেন। খোকন বলেন, তবে আমরা এখনও আদেশের সার্টিফাইড কপি পাইনি। এ জন্য সুপ্রীমকোর্টে আপীলও করতে পারিনি। এ জন্য এ মামলায় সময় চাচ্ছি। পরে আদালত জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার অসমাপ্ত জেরা শুরু করতে বলেন। এর আগে গত ১৮ জুন জেরা শুরু করেছিলেন খালেদার প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। বৃহস্পতিবারও খন্দকার মাহবুব হোসেনই জেরা করেন। খন্দকার মাহবুব হোসেন জেরার শুরু থেকেই ১/১১-এর সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা বিভিন্ন মামলার বিষয়ে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বাদী ও দুদকের উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদকে প্রশ্ন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে দুদকের অইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল দাঁড়িয়ে আদালতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার বিষয়গুলো এ মামলার সংশ্লিষ্ট না। এ্যাভিডেন্স এ্যাক্টসহ কোন আইনে এটা সমর্থন করে না, যে মামলা সংশ্লিষ্ট নয় এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা। তবে ওই সময় আদালতের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে কোন বক্তব্য না যাওয়ায় খন্দকার মাহবুব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করতে থাকেন।

জেরার এক পর্যায়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন ১/১১-এর সময় পিটিয়ে মানুষ হত্যার দায়ে দায়ের করা একটি মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে আদালত তাকে আটকে দেন এবং বলেন এটা আমি নিতে পারবো না। দুর্নীতি মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এ সময় খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, তাহলে আরও করাপশন দেই। জবাবে আদালত বলেন, দেন যত করাপশন আছে দেন। ৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত করাপশন আছে সব লিখে একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করে দেই। আমরা কি আশা নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম আর কি পেলাম।

জেরার এক পর্যায়ে মামলার বাদী হারুন অর রশিদকে খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রশ্ন করেন, শহীদ জিয়াউর রহমান চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে বিএনপি চেয়ারপার্সন প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন এমন কোন প্রমাণ আপনাদের কাছে আছে? জবাবে হারুন অর রশিদ বলেন, দালিলিক প্রমাণ আছে।

খন্দকার মাহবুব প্রশ্ন করেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকা নিয়েছেন এমন কোন লিখিত অভিযোগ আপনাদের কাছে কি আছে? থাকলে কে করেছে। জবাবে বাদী বলেন, লিখিত অভিযোগ আছে, ডাঃ ফারজানা আহমেদ নামে একজন অভিযোগ দিয়েছেন।

পরে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী আজকে (বৃহস্পতিবার) আর জেরা করতে পারবেন না। আমাদের সময় প্রয়োজন। এ সময় আদালত বলেন, জেরা শুরু করলে জেরা শেষ না হওয়া ডে টু ডে জেরা করতে হবে, এটাই আইনে বলা আছে। পরে আদালত এ সংক্রান্ত একটি আইন পড়ে শোনান। আদালত এ সময় আরও বলেন, আইনের ব্যত্যয় ঘটালে সুপ্রীমকোর্টের কাছে আমার জবাব দিতে হবে। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি চট্টগ্রামে বলেছেন, দ্রুত তারিখ দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। পরে এ বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের বক্তব্য শুনতে চান।

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আইনে যা কিছুই থাক না কেন, কোন মানবিক বিষয় বিবেচনা করে আদালত যা সিদ্ধান্ত দিবেন তাই চূড়ান্ত। পরে আদালত বলেন, আমি সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আগামী ৩০ জুলাই পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করলাম। পরে খালেদার আইনজীবীরা আরেকটু সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেন। এরপর আদালত বৃহস্পতিবারে দাখিল হওয়া সব আবেদনের বিষয়ে আদেশ দেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদার করা আবেদনের বিষয়ে আদালত কোন আদেশ না দিয়ে নথিভুক্ত রাখেন। অন্য তিন আসামির পক্ষে করা তিনটি আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। তিন আসামির মধ্যে দুই জনকে ধার্য তারিখে হাজির হওয়ার শর্তে স্থায়ী জামিন দেন আদালত। আর অন্য একজনের পক্ষে সময় আবেদন মঞ্জুর করেন। শেষ সময় খালেদার আইনজীবীর বক্তব্যে আদালতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ৩ আগস্ট দিন ধার্য করেন আদালত।

শুনানি শেষে দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে জেরার সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বেআইনীভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার বিষয় টেনে এনেছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রীর মামলার সঙ্গে এ মামলার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। কাজল বলেন, তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করার জন্যই তার মামলাগুলো জেরায় টেনে এনেছেন।

এ দুই দুর্নীতি মামলায় নানা কারণ দেখিয়ে শুনানির জন্য নির্ধারিত ৬৬ কার্যদিবসের মধ্যে ৫৮ কার্যদিবসই অনুপস্থিত থেকেছেন খালেদা জিয়া, হাজির হয়েছেন মাত্র ৮ দিন। দীর্ঘদিন ধরে শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াসহ অপর দুই আসামি মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছিলেন আদালত। ৪ মার্চও এ গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রাখেন আদালত। পরে গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে প্রতি ধার্য্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকার নিশ্চয়তা দিয়ে গত ৫ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন খালেদা জিয়াসহ ওই তিন আসামি।

চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ॥ ২০১১ সালের ৮ অগাস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চার জনের বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুনুর রশিদ। তেজগাঁও থানার এ মামলায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এ মামলার অপর আসামিরা হলেন- খালেদার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডবিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। এদের মধ্যে হারিছ চৌধুরী মামলার শুরু হতেই পলাতক। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। খালেদাসহ বাকি দুই আসামি জামিনে রয়েছেন।

অরফানেজ ট্রাস্ট ॥ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় অন্য মামলাটি দায়ের করে। এতিমদের সহায়তার জন্য একটি বিদেশী ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় এ মামলায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুন উর রশিদ ২০১০ সালের ৫ অগাস্ট বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেন।

মামলার অপর আসামিরা হলেন- মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।