২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নাটকীয়তার অপেক্ষায় চট্টগ্রাম টেস্টের চতুর্থ দিন

  • প্রোটিয়াদের চেয়ে ১৭ রানে এগিয়ে টাইগাররা

মোঃ মামুন রশীদ ॥ ব্যক্তিগত প্রাপ্তির দিক থেকে আক্ষেপ, হতাশা এবং আনন্দ সবই আছে। কিন্তু দলগতভাবে কে এগিয়ে-টাইগার না কি প্রোটিয়ারা? এই প্রশ্নে কোন দলের তাঁবুতেই আফসোস শব্দটার জায়গা নেই। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে চলমান প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিনেও বৃষ্টি হামলে পড়েছিল। এখন পর্যন্ত স্বাগতিক বাংলাদেশ এগিয়ে আছে ১৭ রানে। সে কারণে মুশফিকুর রহীমের দল পিছিয়ে নেই। আবার দিনশেষে দ্বিতীয় ইনিংসে বিনা উইকেটে ৬১ রান তুলে স্বস্তি প্রোটিয়া শিবিরেও। কিঞ্চিত যেটুকু পার্থক্য সেটা আজ চতুর্থ দিনেই বড় হতে পারে যে কোন দলের জন্য। এই মুহূর্তে তাই বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্টে উভয় দলই বিদ্রোহী নজরুলের ‘গাহি সাম্যের গান’ ছন্দে সহাবস্থানেই আছে। অবশ্য আনন্দটা একটু বেশিই বাংলাদেশের জন্য। সবেমাত্র দ্বিতীয়বারের মতো তারা ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংস ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লিড নিতে পেরেছিল। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে লিড নেয়ার কীর্তি দেখিয়েছে টাইগাররা। আগের চার টেস্টের মধ্যে দুটি ড্র ও একটি করে জয়-পরাজয় দেখলেও এখন পর্যন্ত সাগরিকা টেস্টের ভাগ্যে কি আছে আজ চতুর্থ দিনের ওপর নির্ভর করছে তা। ড্র কিংবা ফলাফল যে কোন দলের পক্ষেই হতে পারে। তবে উভয়দলের তাঁবুতেই বাসা বেঁধেছে একটি অস্বস্তি। সেই একমাত্র অস্বস্তির নাম বৃষ্টি।

ম্যাচ শুরুর দিন থেকে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও দ্বিতীয় দিন থেকে মাঠের প্রতিপক্ষের সঙ্গে অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেছে প্রকৃতি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন মিলিয়ে প্রায় ৫০ ওভার চলে গেছে বৈরী প্রকৃতির দখলে। যদিও আজ দক্ষিণ আফ্রিকাকে দ্রুত অলআউট করার লক্ষ্য বাংলাদেশের এবং প্রোটিয়াদের লক্ষ্য বড় একটি স্কোর দাঁড় করানোর। লিটন দাস জানালেন লিড ১৫০ থেকে ২০০ রানের মধ্যেই রাখার লক্ষ্য টাইগারদের। অর্থাৎ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ দিন আজ।

সাগরিকা টেস্টের প্রথম দু’দিনই ছিল বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। ব্যাটে-বলে বিশ্বের এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে পিছিয়ে রেখেছিল টাইগাররা। এ কারণে দ্বিতীয় দিনশেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ জানিয়েছিলেন প্রথম ইনিংসে অন্তত ৪০০ রান করে এগিয়ে থাকার উদ্দেশ্য। সেটা হয়নি। তবে লিড নিয়েই শেষ করতে পেরেছিল টাইগাররা। আগের দিনের ৪ উইকেটে ১৭৯ রান নিয়ে খেলতে নেমে আরও ১৪৭ রান যোগ করে বাংলাদেশ। হারায় বাকি ৬ উইকেট। সবমিলিয়ে ৩২৬ রানে শেষ মুশফিকবাহিনীর প্রথম ইনিংস। এর আগে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে খেলা ৮ টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ২৫৯ রানের। এবার সেটিকে ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ দল। টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হওয়ার পর প্রোটিয়াদের বিপক্ষে লিডে থাকল টাইগাররা দ্বিতীয়বারের মতো। ২০০৮ সালে ঢাকা টেস্টে প্রথম ও শেষবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লিড নিতে পেরেছিল। এছাড়া ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করে প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লিড নেয়ার এটি পঞ্চম ঘটনা টাইগারদের। সর্বপ্রথম ২০১২ সালে মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেটা করেছিল বাংলাদেশ। এছাড়া ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ড ও গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এবং গত বছর মিরপুরে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে প্রতিপক্ষের পরে ব্যাটিং করেও লিড নিতে পেরেছিল। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও কিউইদের বিপক্ষে ড্র এবং জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে জিতে গেলেও ক্যারিবীয়দের কাছে হেরে গিয়েছিল।

তৃতীয় দিনে মুশফিক আর সাকিবের ওপর ছিল সব নির্ভরতা। কারণ চলতি টেস্টে ৭ ব্যাটসম্যান নিয়ে নামা বাংলাদেশ দলের চার টপঅর্ডার আগের দিনই সাজঘরে গেছেন। বাংলাদেশ পিছিয়ে তখন পর্যন্ত ৬৯ রানে। তবে আস্থার প্রতিদান টানা ১১তম ইনিংসে দিতে ব্যর্থ হলেন অধিনায়ক মুশফিক। ব্যক্তিগত ২৮ রানেই আউট! টানা ১১ ইনিংসে অর্ধশতক বঞ্চিত। আগের দিনের সঙ্গে আর ১২ রান যোগ করেই ফিরে গেলেন সাজঘরে। প্রথম শিকার হিসেবে তাকে ধরলেন আগের দিন ব্যর্থ বিশ্বসেরা টেস্ট বোলার গতিময় স্টেইন। শেষটাও তিনিই করেন দিনের শেষভাগে তাইজুল ইসলাম ও মুস্তাফিজুর রহমানের উইকেট নিয়ে। ৭৮ রানে ৩ উইকেট নিয়ে তাই তিনিই এ ইনিংসে প্রোটিয়া দলের সফলতম বোলার। অবশ্য অফস্পিনার সাইমন হারমার বলে দারুণ ঘূর্ণি আদায় করে নিতে পেরেছেন। তিনিও তিন উইকেট শিকার করেন। তার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাকিবের প্রথম ফিফটি না হওয়ার আক্ষেপ থাকল। ৪৭ রানে বিদায় নেন তিনি। তবে তরুণ লিটনের সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে ৮২ রানের জুটি গড়ে দলকে লিড এনে দিয়েছেন ততক্ষণে। লিটন দারুণ ব্যাট চালিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি আদায় করেন। তারপর আর টিকতে পারেননি তিনিও। তবে ঝড় তুলেছিলেন মোহাম্মদ শহীদ। তিনি হারমারের এক ওভারে তিন চার ও এক ছক্কাসহ ১৮ রান তুলে নেন।

বাংলাদেশের ইনিংস দেখেই বোঝা যাচ্ছিল স্পিন ধরতে শুরু করেছে সাগরিকার উইকেটে। সেই সঙ্গে রিভার্স সুইংও হচ্ছে বলেই ফিল্যান্ডার ও স্টেইন তৃতীয় দিন কিছুটা চেপে বসতে পেরেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটিংয়ে নামার পর রসদ হিসেবে থাকা চার স্পিনারকে আক্রমণে এনেও দুই ওপেনারের মনোসংযোগে চিড় ধরাতে পারলেন না টাইগার অধিনায়ক মুশফিক। নির্বিঘেœই ব্যাট চালিয়ে যায় তারা। চা বিরতির পর আলোর স্বল্পতায় খেলা বন্ধ হয়, পরে দ্বিতীয় দফায় বৃষ্টি হানা দিলে দিনের খেলা সমাপ্ত ঘোষণা করেন আম্পায়াররা। প্রথম দফায় মধ্যাহ্ন বিরতির সময় বৃষ্টি নেমেছিল। যার কারণে মধ্যাহ্ন বিরতির পর নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে আধাঘণ্টা দেরিতে দ্বিতীয় সেশন শুরু হয়েছিল। তবু প্রকৃতির আলোর স্বল্পতা থাকায় ফ্লাডলাইটের আলোয় খেলতে হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য চা বিরতি এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ বিকেলে সাগরিকায় একইসঙ্গে বৃষ্টি এবং আলোক স্বল্পতা খেলতে শুরু করল। আগের দিনও বৃষ্টি শত্রু হয়ে নেমে ২৫ ওভার নিজের পেটে পুরেছিল। তৃতীয় দিন বৃষ্টি-স্বল্প আলো কেড়ে নিল আরও ২৪.৫ ওভার। অস্বস্তি এ দু’দলের তাঁবুতে এই একটিই।

মুশফিকের আবারও কম রানে আউট হওয়ার হতাশা, স্টেইনের চার শ’ উইকেট ছুঁতে না পারার আক্ষেপ আবার স্টেইনের স্বমূর্তিতে ফেরার উল্লাস, লিটনের প্রথম অর্ধশতকের আনন্দগুলো নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অর্জনের দিক থেকে চলতি টেস্ট দারুণ জমেই উঠেছে। তবে এখন সাম্যাবস্থানে থাকা দু’দলের বড় শত্রু বৈরী প্রকৃতি। সেটাই কাল হতে পারে যে কোন দলের জন্য। হারমার সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, ‘রোদ উঠলে ফেটে ওঠা উইকেট আরও কার্যকর হবে স্পিনারদের জন্য। তবে আমরা ভালভাবে শুরু করে বড় সংগ্রহ গড়তে চাই।’ কিন্তু সেটা কোনভাবেই চায় না বাংলাদেশ। লিটন বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব দক্ষিণ আফ্রিকাকে আটকাতে হবে। জয়ের লক্ষ্য ১৫০-২০০ হলে আমাদের জন্য খুব ভাল হবে। সে জন্য আমাদের বোলারদের দায়িত্ব নিয়ে ভাল বোলিং করতে হবে।’ প্রথম ইনিংসে তো সেটা করেই দেখিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা। সবার চোখ এখন তাই চতুর্থ দিনের নাটকীয়তার দিকে। বোলাররা ভাল বোলিংয়ের চ্যালেঞ্জে জিতলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে বাংলাদেশের। আর ব্যাটসম্যানরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে রান আসবে এবং নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে দক্ষিণ আফ্রিকার তাঁবুতে। আজকেই তাই সাগরিকা টেস্টের ভাগ্য নির্ধারণী দিন। অগ্নিপরীক্ষা দু’দলের জন্যই। ড্র নাকি ফলাফল হবে সেটার ফয়সালাটা আজই।