১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই ছিটমহল বিনিময়ে সম্মত দুই দেশ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছিটমহল এলাকায় দ্রুত সীমানা চিহ্নিত করতে চায় বাংলাদেশ ও ভারত। এছাড়া আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বৃহস্পতিবার ঢাকায় দুই দেশের মধ্যে জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে এসব আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমি হস্তান্তর, ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছে দুই দেশ।

সীমান্ত চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের দুই দিনব্যাপী বৈঠক শুরু হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের ৪০ জন প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম। অপরদিকে ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথান। বৈঠকে উভয় দেশের ছিটমহল এলাকার জেলা প্রশাসকরাও যোগ দিয়েছেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উভয় দেশ দ্রুত সীমানা চিহ্নিত করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়ে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ। বৈঠকে ছিটমহলে জনগণনা জরিপকালে ভারতে যাওয়ার জন্য যেসব নাগরিক ফরম পূরণ করে এখন মত বদলেছেন, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ শুক্রবার বৈঠকে বিষয়টি আবারও তোলা হবে বলে জানা গেছে।

বৈঠকে দুই দেশের অপদখলীয় ভূমির বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের মধ্যে অপদখলীয় ভূমি সমস্যার সমাধান ও নতুন করে সীমানা চিহ্নিত করে দ্রুত স্ট্রিপ ম্যাপ তৈরির জন্য উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। এছাড়া স্ট্রিপ ম্যাপ তৈরির পর দ্রুত সীমানা পিলার বসানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছেন উভয় দেশের প্রতিনিধিরা। বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইতোমধ্যেই এক হাজার ১১৪টি স্ট্রিপ ম্যাপ সই ও বিনিময় হয়েছে। তবে স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী অপদখলীয় জমি ও অচিহ্নিত এলাকার ৩৫টি স্ট্রিপ ম্যাপ দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে।

ছিটমহল এলাকার সাধারণ নাগরিকদের সাময়িক চলাচলের জন্য তিনটি নতুন পয়েন্ট চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে নাগরিকরা উভয় দেশের মধ্যে সাময়িকভাবে চলাচল করতে পারবে। ছিটমহল বিনিময় চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেখানের বাসিন্দারা হলদিবাড়ি, বুড়িমারি ও বাংলাবান্ধা পয়েন্ট দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিনিধিদের এই বৈঠকে ছিটমহলবাসীর নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। ছিটমহল বিনিময় না হওয়া পর্যন্ত উভয় দেশ ছিটমহলবাসীর নিরাপত্তা দেবে। এছাড়া ছিটমহল এলাকায় কোন ধরনের আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না ঘটে সে বিষয়েও উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। ছিটমহল এলাকার সাধারণ মানুষের সম্পদের যথাযথ নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা বলেছেন, ছিটমহল এলাকার সাধারণ মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে সরকারের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। ছিটমহল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশনা মেনে চলা হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২ ছিটমহলের মধ্যে ভারতীয় ১১১ ছিটমহলের অবস্থান নীলফামারীতে চারটি, লালমনিরহাটে ৫৯, পঞ্চগড়ে ৩৬ ও কুড়িগ্রামে ১২টি। আর বাংলাদেশের ৫১ ছিটমহলের অবস্থান ভারতের কোচবিহারে ৪৭ ও জলপাইগুড়িতে চারটি। জনগণনা জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ১১১ ছিটমহলের ৪১ হাজার ৪৪৯ বাসিন্দার মধ্যে ভারতে যেতে চান মাত্র ৯৭৯ জন। এর মধ্যে নীলফামারীর চার ছিটমহল থেকে কেউ ভারতে যেতে চায়নি। তবে পঞ্চগড়ের ৩৬ ছিটমহল থেকে ৪৮৩ জন, কুড়িগ্রামের ১২ ছিটমহল থেকে ৩০১ জন ও লালমনিরহাটের ৫৯ ছিটমহল থেকে ১৯৫ জন ভারতের যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। ভারতে যেতে ইচ্ছুক নাগরিকদের তালিকা ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসকদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশই নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। এই সময়সীমার মধ্যেই সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। তবে দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় ও নাগরিকত্ব নির্ধারণের পরও কোন সমস্যা হলে ২০২০ পর্যন্ত তা সমাধান করা হবে। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি বছরের ৩০ নবেম্বরের মধ্যে ছিটমহলের ভূমি জরিপ, রেকর্ড তৈরি, খতিয়ান ম্যাপ তৈরির পর দুই দেশের জেলা প্রশাসনের মধ্যে বিনিময় করা হবে।

ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই দুই দেশের সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অপরদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকেও সেদেশের ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ইতোমধ্যেই তিন হাজার নয় কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কোচবিহার এলাকায় অস্থায়ী শিবির নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে রাজ্য সরকার। তবে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের কেউ এ দেশে আসতে না চাওয়ায় এখনও পুনর্বাসনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। তবে ছিটমহলের কোন নাগরিক আসতে চাইলে তাদের পুনর্বাসনে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ প্রশাসন।

উল্লেখ্য, আজ শুক্রবার বাংলাদেশ ও ভারতের জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক একই স্থানে আবার শুরু হবে।