১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরকারী ঔদাসিন্যে বাড়ছে তামাকের আগ্রাসন

  • তামাক চাষের দুষ্টচক্র শেষ

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ তামাক চাষের আগ্রাসন ঠেকাতে সরকারী উদ্যোগ হতাশাজনক। এ বিষয়ে নেই কোন নীতিমালা। ছোট ছোট কিছু উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো কোন কাজে আসছে না। ফলে ভঙ্গ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, আপাতত নীতিমালা করার কোন উদ্যোগ নেই। তবে ভিন্ন কথা বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে নীতিমালা করা উচিত, আমরা ভাবছি। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। তামাক চাষের ব্যাপকতার হার দেশ ও জাতির জন্য ভীতিকর খবর হলেও এ বিষয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয় সরকারের নীতি-নির্ধারক মহল। এমনই হতাশার চিত্র পাওয়া গেছে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশে গৃহস্থালিভিত্তিক তামাক চাষের ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও বাণিজ্যিক তামাক উৎপাদন শুরু ৬০ এর দশকে। মূলত তামাক শিল্পের যান্ত্রিকীকরণের হাত ধরেই বাণিজ্যিক তামাক চাষ শুরু হয় দেশে। পরবর্তী কয়েক দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রণোদনায় এই চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। নীতি-নির্ধারণী মহলসহ সংশ্লিষ্টরা তামাক চাষের ক্ষয়ক্ষতি উপলব্ধি করলেও তা নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বিভিন্ন সময় কিছু বিচ্ছিন্ন নির্দেশনা যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক তামাক চাষে ঋণ প্রদান বন্ধ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন, তামাক চাষে ভর্তুকি মূল্যের সার ব্যবহার বন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কর্তৃক তামাক চাষ নিরুৎসাহিতকরণে ছোটখাটো কিছু উদ্যোগ প্রভৃতি থাকলেও দুর্বল তদারকি এবং তামাক কোম্পানির শক্তিশালী হস্তক্ষেপের কারণে এসব চেষ্টার কোন সুফল মিলছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, আমি তামাক চাষে ঋণ দেয়া বন্ধ করেছি। এর অর্থ অনেক বড় ও অনেক বেশি কিছু করতে পেরেছি তা নয়। কিন্তু আমি যেটি করেছি তা হলো এর মধ্য দিয়ে একটি সিগন্যাল দিয়েছি।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষরকারী (২০০৩ সালে) দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণ (তামাকের চাহিদা-হ্রাস ও যোগান নিয়ন্ত্রণ) বিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে এফসিটিসির আলোকে একটি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করেছে। তবে আইনটি সার্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট কার্যকরী নয়। এটি মূলত তামাকের চাহিদা হ্রাসমূলক কিছু পদক্ষেপ মাত্র। তামাকের যোগান নিয়ন্ত্রণে বাস্তবায়নযোগ্য কোন বিধান নেই এ আইনে। এক্ষেত্রে কেবল একটি ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছেÑ ‘তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন ও উহার ব্যবহার ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করিবার জন্য উদ্বুদ্ধ এবং তামাকজাত সামগ্রীর শিল্প স্থাপন, তামাক জাতীয় ফসল উৎপাদন ও চাষ নিরুৎসাহিত করিবার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করিতে পারিবে।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ধারা বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। উল্লেখ্য, তামাকের যোগান নিয়ন্ত্রণে এফসিটিসির আর্টিকেল ১৭ ও ১৮ অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রসমূহ তামাকের বিকল্প ফসল চাষে কৃষকদের সহায়তা প্রদান ও তামাক চাষের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে উদ্যোগ গ্রহণ করবে এ মর্মে পরামর্শ রয়েছে। তাছাড়া দুর্বল কর পদক্ষেপ ও তামাকপণ্যের প্যাকেটে ছবিসহ সতর্কবাণীর মতো আরও কিছু শক্তিশালী চাহিদা-হ্রাসমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত না হওয়ায় তামাকের ব্যবহার ও ক্ষয়ক্ষতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, তামাক রফতানি করে এ বছর ১৬ হাজার কোটি টাকা এসেছে। তাই একবারেই এর উৎপাদন বন্ধ করা যাবে না। আমরা ইতোমধ্যেই ডিউটি অনেক বাড়িয়েছি। এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এগোতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেন, বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর আনুমানিক ১ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতিকর প্রভাব সমাজের ওপর এক বিশাল বোঝা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী তামাকের পরিমাপযোগ্য নীট সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ হবে কমপক্ষে ১৬ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। অবশ্য অনেক ক্ষতিরই আর্থিক মূল্য নিরূপণ করা যায় না। যেমন স্বাস্থ্যজনিত বংশ পরম্পরায়, পরোক্ষ ধূমপায়ীদের ক্ষতি, তামাক চাষে জমির উর্বরতাজনিত দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এবং বন-বৃক্ষ উজাড়জনিত ক্ষতি ক্ষয়ক্ষতির অর্থ মূল্য নিরূপণ করা যায় না। এসব দিক বিবেচনা করে বর্তমানে তামাক পাতার ওপর রফতানি শুল্ক ধার্য করা আছে ১০ শতাংশ হারে। তামাকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি বিবেচনায় এই রফতানি শুল্ক হার নগণ্য। তামাক রফতানি নিরুৎসাহিত করতে রফতানি শুল্ক হার কমপক্ষে ২০ শতাংশে নির্ধারণ করা উচিত।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, তামাক চাষ ক্ষতিকর। এ জন্য নীতিমালা করা দরকার। নিশ্চয়ই আমরা এ বিষয়ে ভাবছি।

সূত্র জানায়, তামাক পাতা শুকানোর কাজে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর হাজার হাজার মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে তামাক চুল্লিতে। আর এসব কাঠের যোগান দিতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে বন। পাথ কানাডা পরিচালিত ২০০২ সালের এক গবেষণা মতে, দেশের মোট বন উজাড়ের ৩১ শতাংশের জন্য দায়ী এ তামাক চাষ। গত মৌসুমে শুধু বান্দরবান জেলায় ৬ হাজারেরও বেশি তামাক চুল্লি নির্মাণ করা হয়েছিল। শুধু খাগড়াছড়ি জেলার তামাক চুল্লিতে বছরে ১ লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হয়।

তাছাড়া তামাক চাষে মাটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কারণ ধানের চেয়ে তামাক চাষে ৩ গুণ বেশি ইউরিয়া সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। তামাক চাষের জন্য একটি জমি ২ থেকে ৩ বার ব্যবহার করা যায়। তারপর এই জমিতে আর ভাল তামাক হয় না এবং অন্যান্য ফসলের ফলনও ব্যাপকভাবে কমে যায়। উপরন্তু, অতিমাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে মাটির উর্বরতা নষ্ট হতে থাকে। তামাক চাষপ্রবণ এলাকার অধিকাংশ শিশু-কিশোর তামাকচাষ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ যেমন বীজতলা থেকে তামাকের চারা উত্তোলন, চারারোপণ, আগাছা পরিষ্কার, বিষ ছিটানো, তামাক পাতা বাছাই, পাতা পোড়ানো/শুকানো এমনকি তামাকপাতা বাজারজাতকরণের কাজে সম্পৃক্ত থাকে। ফলে তামাক চাষ মৌসুমে তারা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। এছাড়া তামাকপাতা বিক্রির মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার প্রায় সব স্কুলে বসে তামাকের হাট। বান্দরবান জেলার বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (লামা উপজেলার লাইনঝিরি দাখিল মাদ্রাসার দুই শ’ গজের মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, লামামুখ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ঢাকা টোব্যাকো, লাইনঝিরি বাজারসংলগ্ন আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানির বায়িং হাউস) আশপাশে তামাক কোম্পানির বায়িং হাউস থাকায় শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হয় প্রতিনিয়ত। অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পান না স্থানীয়রা।

গবেষণা সংস্থা প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে দীর্ঘসময় যুক্ত থাকার কারণে গোটা কৃষক পরিবারই বছরের অধিকাংশ সময় শ্বাস-প্রশ্বাস, ত্বক, ফুসফুস ও দেহের বিভিন্ন অঙ্গে দুরারোগ্য ব্যাধি ছাড়াও দৈনন্দিন মাথা ঝিম ঝিম করা, বমি বমি ভাব, বুক ধড়ফড় করা, কোমর ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া, মেরুদ- ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, ক্ষুধা মন্দা ইত্যাদি অসুখে ভোগেন। পাশাপাশি শিশু-কিশোররা গ্রীন টোব্যাকো সিনড্রোম রোগে আক্রান্ত হয়, ফলে দেশব্যাপী হাজার হাজার তামাক চাষী বিশেষত নারী ও শিশু-কিশোর ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছে।