১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল, টাকার লেনদেন বেড়েছে ১৭ শতাংশ

ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল, টাকার লেনদেন বেড়েছে ১৭ শতাংশ
  • প্রাক-মুদ্রানীতি পরামর্শক সভায় ড. আতিউর রহমান

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেছেন, এবার রোজার ঈদে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। গতবারের তুলনায় টাকার লেনদেন ১৭ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে- এমনটা দাবি করে আতিউর রহমান বলেন, রফতানি খাতকে উৎসাহিত করতে খুব শীঘ্রই ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) মার্কিন ডলার মূল্যের নতুন দুটি ঋণ তহবিল গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৩শ’ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেয়া হবে নতুন কারখানা স্থাপন ও পুরনো কারখানা চালু করতে। বাকি ২শ’ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পরিবেশবান্ধব তথা সবুজ অর্থায়নে বিনিয়োগ করা হবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলের একটি হোটেলে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাক-মুদ্রানীতি পরামর্শক সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান এ কথা জানান। এ সময় অন্যদের মধ্যে ডেপুটি গবর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান উপস্থিত ছিলেন। সভায় মুদ্রানীতির নানান দিক ও ধরন নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল।

গবর্নর বলেন, বিশ্বমন্দার মধ্যে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। এখন গোটা ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরে এসেছে। তিনি আরও বলেন, ঋণ শ্রেণীকরণে আমরা আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অণুসরণ করা শুরু করেছি। এ জন্য খেলাপী ঋণ বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ধীরে ধীরে তা কমে আসবে। গবর্নর বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে এর পুরোটা আমাদের হাতে না। তারপরও আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। আগে বড় অংকের ঘাটতি নিয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে হয়েছে। কিন্তু এবার ব্যাংকিং খাতে প্রচুর পরিমাণে উদ্বৃত্ত থাকছে। ব্যাংকিং খাতে এখন খাই খাই কোন ভাব নেই দাবি করে তিনি বলেন, এখন ব্যাংকে তারল্যের কোন সঙ্কট নেই। বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নতুন ধারার ব্যাংকিং উল্লেখ করে গবর্নর বলেন, শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদে ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছি। তিনি জানান, উৎপাদনশীল খাতগুলো চাঙ্গা করতে আরও বেশি অর্থায়ন করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ড. আতিউর রহমান বলেন, রফতানি খাতকে উৎসাহী করতে নতুন কারখানা স্থাপন ও পুরনো কারখানা চালু করতে অর্থায়ন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইডিএফ ফান্ডের আওতায় ৩শ’ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পরিবেশবান্ধব তথা সবুজ অর্থায়নে আরও ২শ’ মিলিয়ন ঋণ দেয়া হবে। আসন্ন মুদ্রানীতিতে ফান্ডগুলোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হবে বলে তিনি জানান। গবর্নর বলেন, এবার রোজার ঈদে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। গতবারের তুলনায় টাকার লেনদেন ১৭ শতাংশ বেড়েছে বলে তিনি জানান। বিদেশী ঋণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে গবর্নর বলেন, রফতানিকারকদের উৎসাহিত করতে এই ঋণ দেয়া হচ্ছে। বিদেশী ঋণের কারণে বেসরকারী খাতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমছে বলে তিনি জানান। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব রয়েছেÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আতিউর রহমান বলেন, আগের চেয়ে অনেক বেশি নজরদারি বেড়েছে ব্যাংকিং খাতে। তিনি বলেন, দেশে কার্যরত সকল ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যয় এবং রেটিং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে গাইডলাইনও তৈরি করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি রোধে ব্যবস্থা নেয়ার ফলে এখন আর বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটছে না। ব্যাংকগুলোতে বড় বড় ঋণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সর্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ব্যাংকের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাকে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। গবর্নর বলেন, যেসব ব্যাংকে অনিয়ম হয়েছে সেসব ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভবিষ্যতে কোন ব্যাংকে অনিয়ম হলেই সেই ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল বলেন, নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশের অর্থনীতি আজকের অবস্থানে এসেছে। নানা প্রতিকূলতার পরও বিনিয়োগ, রফতানি, আমদানিসহ অর্থনীতির সব সূচক ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। অবশ্য সামনের দিনে বড় ধরনের কোন অস্থিরতা দেখা না দিলে অর্থনীতির সার্বিক সূচকে অগ্রগতির এ ধারা বজায় থাকবে বলে আশা করা যায়। বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সরকারী খাতে ঋণ কমেছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ ৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা কমে এক লাখ ৭ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তার আগের তুলনায় ব্যাংকে সরকারের ঋণ বেড়েছিল ৬ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। মূলত প্রত্যাশার তুলনায় গত অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি অর্থ আসায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার চাহিদা কম ছিল। আগের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারী খাতে অভ্যন্তরীণ ঋণ বৃদ্ধির প্রোগ্রাম ছিল ১৪ শতাংশ। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক ঋণসহ কর্মসূচী নির্ধারণ করা হয়েছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৪ শতাংশের মতো ঋণ বেড়েছিল। এবারে বেসরকারী খাতে ঋণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার আশপাশেই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এবারের মুদ্রানীতির ভঙ্গি প্রবৃদ্ধি সহায়ক ও বিনিয়োগবান্ধব হবে। স্প্রেড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ঋণ ও আমানতের সুদহার (স্প্রেড) অনেক কম। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমছে।