১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যৌতুকের জন্য নিত্য বাড়ছে নারী নির্যাতন

  • পাঁচ বছরে মামলা হয়েছে ১৪ হাজার;###;বিচার ঝুলে থাকে বছরের পর বছর;###;আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই

শর্মী চক্রবর্তী ॥ যৌতুকের টাকা না পেয়ে সাভারের জিঞ্জিরা এলাকার রবিউল ইসলাম গত ১৭ জুলাই ইলেকট্রিক টেস্টার দিয়ে স্ত্রী সুখীর একটি চোখ উপড়ে ফেলেছে। অন্য চোখেও তীব্রভাবে আঘাত করে। এ কাজে সহায়তা করে রবিউলের স্বজনরা। বর্তমানে দৃষ্টি হারিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে সুখী।

অন্যদিকে যৌতুকের জন্য যশোরের রূপদিয়া খানপাড়ায় নাসিমা বেগম নামে এক গৃহবধূকে ঘুমন্ত অবস্থায় কুপিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি। এর একদিন পর শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ছয়গাঁও গ্রামে যৌতুকের জন্য গৃহবধূ শিমু আক্তারকে স্বামী ও শাশুড়ি দুধের সঙ্গে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। দুটো ঘটনাই এ মাসের।

২৩ জুলাই তিন লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে দশ বছরের স্কুল পড়ুয়া শ্যালককে অপহরণ করে মনির হোসেন। সাভারের আশুলিয়ায় কুমকুমারী গ্রামের দুলাল ফকিরের ছেলে মনির। শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানার নন্দীগ্রামে ঈদ করতে যায় মনির। সেখানে স্ত্রী লিপি বেগম বাবার কাছ থেকে যৌতুকের ওই টাকা না দেয়ার কথা বললে ছোটভাই চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র জুনায়েদ জীবনকে অপহরণ করে।

যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্বামী মঞ্জুরুল ইসলাম (২৫) পিটিয়ে হত্যা করেন তার স্ত্রী আরিফাকে (২১)। এ ঘটনায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে স্বামী মঞ্জুরুলকে। বৃহস্পতিবার রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তালুক শাহবাজ বাবুপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিয়ের পর থেকেই মঞ্জুরুল যৌতুকের ৫০ হাজার টাকার জন্য তার স্ত্রীকে নির্যাতন করতো।

মৃত্যুর হাত থেকে যারা প্রাণে বেঁচেছেন, তাদের অনেকেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে দিন পার করছেন। এমনই একজন হাটহাজারীর গৃহবধূ সাহিদা আক্তার সাথি। তিন লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে বেধড়ক পেটানোর পর মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে তার স্বামী সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চালক আবদুর রহিম। নওগাঁর মান্দায় মাহমুদা বিবি নামে এক গৃহবধূ যৌতুক দিতে না পারায় বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের পর জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে স্বামী জালাল হোসেন।

এভাবেই ঘরে-ঘরে, গ্রামে-গ্রামে, শহরে-শহরে যৌতুকের জন্য ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা। যৌতুকের জন্য একদিকে যেমন নারী নির্যাতন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ। দেশের প্রচলিত আইনে যৌতুক দেয়া-নেয়া সমান অপরাধ। কিন্তু কে মানছে আইন, কে শুনছে কার কথা? যৌতুকের জন্য যশোরের রূপদিয়া খানপাড়ায় নাসিমা বেগম নামে এক গৃহবধূকে ঘুমন্ত অবস্থায় কুপিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি। এর একদিন পর শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম ছয়গাঁও গ্রামে যৌতুকের জন্য গৃহবধূ শিমু আক্তারকে স্বামী ও শাশুড়ি দুধের সঙ্গে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। দুটো ঘটনাই এ মাসের। ইউনাইটেড ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ (ইউএনডিপি) পরিচালিত বাংলাদেশে যৌতুকের ওপর ১০ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যৌতুকের কারণে ২০১০ থেকে ’১৫ সালের মে পর্যন্ত সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ১৯২। খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে যৌতুক দাবি করায় মামলা হয়েছে এমন তালিকায় রয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, ইউপি চেয়ারম্যানও।

পত্রিকার কাটিং থেকে সংগ্রহ করা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে ২৩৬ নারীকে এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৯৫ নারী। চলতি বছর অর্থাৎ, ২০১৫ সালে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে নিহত হয়েছেন ১৬ নারী। এ ছাড়া গত তিন মাসে হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৫।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবছরই যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছেন বহু নারী। যার সামান্য কিছু ঘটনাই কেবল আমাদের নজরে আসে। কেবল গরিবের ঘরে নয় মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, ধনী সব ধরনের পরিবারেই এখন যৌতুকের অভিশাপ ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মতে, নির্যাতনের অনেক কম অংশ জানাজানি হয়, গ্রাম-শহরে বহু নারী লোকলজ্জা এবং পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছেন নির্যাতন। পাঠ্যসূচীতে নৈতিকতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা, নারীদের শিক্ষিত করে তোলা এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা, নারীদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হলে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা, পরিবারে নারীর প্রতি সহিংস আচরণ বন্ধ করা, দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার সুনিশ্চিত করা, এলাকায়-এলাকায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

যৌতুক প্রতিরোধ আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আইন থাকা সত্ত্বেও হরহামেশায় যৌতুক লেনদেন হচ্ছে। যৌতুক নেয়া ও দেয়ার বিষয়ে দেশে প্রচলিত বিদ্যমান আইন তোয়াক্কা না করে শিক্ষিত পরিবারগুলোতে যৌতুকের প্রবণতা এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। আবার কোন মধ্যবিত্ত পরিবার বিয়ে উপযুক্ত কন্যার জন্য ‘চাকুরে’ জামাই পেলে বরপক্ষকে যা লাগে তা দিতে দ্বিধাবোধ করেন না। এর বাইরে ‘যৌতুক না চাইলে কন্যার পিতা বেশি দেবেন’ মর্মে শিক্ষিত পরিবারে এখন যৌতুক বিষয়ে তেমন কোন চাহিদা থাকে না। যে কারণে মেয়ের বাবা গহনা, আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশন, মোটরসাইকেলসহ নানা পণ্য মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে দেন।

যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ তে বলা হয়েছে, যৌতুক নেয়া ও দেয়া দুটোই অপরাধ। আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, যৌতুক দেয়া বা দেয়ায় সহায়তা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বাধিক পাঁচ বছর ও সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদ- ও জরিমানা অথবা উভয় দ- দেয়া যেতে পারে। এ আইনের ৪ ধারাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যৌতুক দাবি করলে দ- বিধান রাখা হয়েছে। কোন ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌতুক দাবি করলে তাকে সর্বাধিক পাঁচ বছর এবং সর্বনিম্ন এক বছর মেয়াদের কারাদ- বা জরিমানা অথবা উভয় দ- দেয়ার বিধান হয়েছে।

যৌতুক দাবি করা কিংবা দেয়া-নেয়ার এক বছরের মধ্যে আদালতে মামলা করতে হবে। যৌতুকের জন্য নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করায় সরকার সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করে। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ সালে সংশোধন হয়। এ আইনের ১১ ধারায় কোন নারীর স্বামী অথবা স্বামীর পিতা, মাতা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি যৌতুকের জন্য ওই নারীর মৃত্যু ঘটায় বা ঘটানোর চেষ্টা করে, অথবা ওই নারীকে আহত বা আহত করার চেষ্টা করে তাহলে স্বামী বা স্বামীর পিতা, মাতা, অভিভাবক, আত্মীয় বা ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ১১ (ক) ধারায় মৃত্যু ঘটানোর জন্য মৃত্যুদ- হত্যা চেষ্টার জন্য যাবজ্জীবন কারাদ-, ১১ (খ) ধারায় মারাত্মক জখম করার জন্য যাবজ্জীবন কারাদ- বা ১২ বছর পর্যন্ত কারাদ- (ন্যূনতম পাঁচ বছর) ও ১১ (গ) ধারায় যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে মারধরের অপরাধে তিন বছর, সর্বনিম্ন এক বছরের কারাদ- দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, যৌতুকের জন্য যত পরিমাণ সহিংসতার ঘটনা বাস্তবে ঘটছে, তার তুলনায় প্রকাশিত ঘটনার সংখ্যা অনেক কম। সামাজিক লোকলজ্জা, পারিবারিক সম্মানহানির কারণে নির্যাতিত অনেক নারীই আইনের আশ্রয় নেন না বা খবর প্রকাশ করেন না। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে যৌতুকের সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। নারীর প্রতি যে সহিংসতা তার ৯৫ ভাগই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে হয়ে থাকে। গত ৬ মাসে ৩৫১ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ২২৬ নারীকে হত্যা করা হয় এবং তার মধ্যে ১০০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রত্যেক সদস্য যদি নিজের এলাকাকে নারী নির্যাতনমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন তাহলে এদেশ অবশ্যই নারী নির্যাতনমুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইনজীবী মাকছুদা আক্তার বলেন, সাভারের গৃহবধূ সুখীর ওপর তার স্বামী যে নির্যাতন করেছে তা পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুকের জন্য নির্যাতনেরই একটি ভয়াবহ রূপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরের ওপর নির্যাতন এবং ড. তোফাজ্জল কর্তৃক তার স্ত্রী নাজমাকে নির্যাতন করে হত্যা করা তারই প্রমাণ। এর কারণ হচ্ছে যৌতুক নিরোধ আইন, পারিবারিক সুরক্ষা আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হচ্ছে না। কাজেই এ সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য যৌতুক নিরোধ আইন আরও যুগোপযোগী করতে হবে এবং এর সংজ্ঞা আরও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। যৌতুক নিয়ে প্রয়োজন সচেতনতা বাড়ানো এবং দরকার প্রচার।

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, যৌতুকের বিরুদ্ধে দেশে কঠোর আইন আছে। কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ক্রমাগত ঘটেই চলেছে তিনি বলেন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু বা নির্যাতনের ঘটনায় যে সব মামলা হয়, দেখা যায় বছরের পর বছর সেগুলো আদালতে ঝুলে আছে। মামলার এ দীর্ঘসূত্রতায় অনেক সময় সাক্ষী হারিয়ে যায়। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক আসামিই জামিনে ছাড়া পায় এবং বাদী পক্ষকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে। ফলে, বাদী পক্ষ অনেক ক্ষেত্রেই মামলা মীমাংসা করে নিতে বাধ্য হয়। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা তো আবশ্যক। সেই সঙ্গে যৌতুকের বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে তবে যৌতুক বন্ধ করা সম্ভব।