২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাতক্ষীরায় শিশু নির্যাতনের ছবি সাজানো

সাতক্ষীরায় শিশু নির্যাতনের ছবি সাজানো
  • উৎস খুঁজছে পুলিশ আটক আসামি জেলে

স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা ॥ সাতক্ষীরার শ্যামনগরের জয়নগর গ্রামে দুই শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে নির্যাতনের বাস্তবতা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। শিকল ও দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় শিশু দুটির ছবির উৎসদাতা কে, তা নিয়ে বৃহস্পতি ও শুক্রবার উপজেলা প্রশাসন ও থানা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় তদন্ত করা হয়েছে। ঘটনাস্থল শ্যামনগরের সংবাদকর্মীরাও এ ধরনের শিশু নির্যাতনের ছবি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা ছবি তোলার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করার দাবি করেছেন। ছবিতে জয়নগর গ্রামের মোস্তফার বাড়ির যে গাছের সঙ্গে শিশু দুটির বেঁধে নির্যাতন দেখানো হয়েছে বাস্তবে সেই গাছের মিল পাওয়া গেছে নির্যাতিত এক শিশুর বাড়ির গাছের সঙ্গে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থল ঘুরে সংবাদকর্মীদের এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অপরদিকে দুটি শিশুকে রশি ও শিকল দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় প্রধান আসামি গোলাম মোস্তফাকে জেলহাজতে পাঠানো হচ্ছে। বুধবার রাতে এ ব্যাপারে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৮ ধারায় শ্যামনগর থানায় মামলা (নম্বর ৩৪ তারিখ ২২.০৭.১৫ ) করেছেন নির্যাতিত শিশু আবু নাসিমের বাবা হামিদ তরফদার। শিশু নির্যাতনের এই ঘটনা গত ২৮ রমজান ১৬ জুলাই তারিখে ঘটলেও তা জানাজানি হয় ২২ জুলাই বুধবার। এরপরই গ্রেফতার করা হয় মোস্তফাকে। পুলিশ এ ঘটনা নিয়ে অধিকতর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমদাদুল হক। তিনি জানান, ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সাইয়েদ মঞ্জুর আলম জয়নগর গ্রাম ঘুরে এসে শুক্রবার বিকেলে জনকণ্ঠকে বলেন, শিশু দুটি নির্যাতিত হলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবির সঙ্গে শিশু নির্যাতনের বাস্তবতার কোন মিল নেই। নির্যাতনকারী গোলাম মোস্তফার বাড়ি থেকে ছবি নেয়া হলে তার সঙ্গে বাড়িঘরের ছবি আসবেই। ছবিতে যে গাছের সঙ্গে শিশু দুটিকে বেঁধে রাখা দেখানো হয়েছে সেই গাছটি নির্যাতিত শিশু ইয়াসিনদের বাড়ির একটি গাছের। তিনি বলেন, ছবিটি সাজানো এবং ঘটনার অনেক পরে তোলা বলে মনে হয়েছে।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, শ্যামনগরের কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের তিন সহোদর গোলাম মোস্তফা, আবদুল কুদ্দুস ও আবু মুসার মধ্যে পারিবারিক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। সম্প্রতি গোলাম মোস্তফা তার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে লোক চলাচল বন্ধের জন্য খেজুর কাঁটার একটি বেড়া দেন। এই বেড়া সরিয়ে সেখানে খেলতে আসে পাড়ার দুটি শিশু ইয়াসিন (৮) ও নাসিম (৯)। আটক মোস্তফা পুলিশকে জানিয়েছেন প্রতিপক্ষরা বেড়া ডিঙ্গিয়ে তার জমিতে আসার চ্যালেঞ্জ দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ও তার ছেলে শিশু দুটিকে ধরে বেঁধে রাখেন। কয়েক মিনিট পর পাড়ার মহিলারা তা খুলে দেন বলে তিনি দাবি করলেও শিশু নাসিমের বাবা মামলার বাদী ভ্যানচালক হামিদ তরফদার জানান, ‘তাদেরকে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বারোটা পর্যন্ত বেঁধে রেখে নির্যাতন চালানো হয়।’ তিনি আরও জানান, ‘তাদের শিশু দুটি সকাল থেকেই ছিল অভুক্ত। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে বেড়া নষ্ট করে খেলা করার অভিযোগে শিশু দুটিকে ধরে গোলাম মোস্তফার কাছে নিয়ে যান প্রতিবেশী ইট ভাটার শ্রমিক সরদার আবদুস সাত্তার মোড়ল। এরপরই তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে।

এদিকে শিশু দুটিকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিন সন্ধ্যায় শিশু দুটির বাবা প্রতিবেশী আবদুল হামিদ ও ইসমাইল হোসেন গোলাম মোস্তফার বাড়িতে এসে হামলা করেন। এতে মোস্তফা ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মাসুদা খাতুন আহত হন। মোস্তফা এ নিয়ে মামলার উদ্যোগ নিলে স্থানীয়রা তাকে বিষয়টি নিজেদের মধ্যকার বলে মিটিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু কোন তৃতীয় পক্ষ একটি সাজানো ছবি তৈরি করে তা সংবাদ মাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগ নিয়ে কয়েকজন সংবাদকর্মীর কাছে এই ছবি ছড়িয়ে দেয়া হয়। এদিকে মামলার তদন্তকারী অফিসার শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুস সাত্তার জানান, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গোলাম মোস্তফা শিশু দুটিকে চড় থাপ্পড় দিয়ে বেঁধে রাখার কথা স্বীকার করেছেন। তবে পায়ে শিকল দেয়া এবং পুরো দেহ রশি দিয়ে পেঁচিয়ে নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত ছবি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে পুলিশকে জানিয়েছেন আটক মোস্তফা।

এদিকে শিশু দুটিকে রশি দিয়ে হাত বেঁধে ও শক্ত করে পেঁচিয়ে পায়ে শিকল দিয়ে গাছের সঙ্গে সটান বেঁধে রাখার কোন প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান এলাকায় মেলেনি। তবে শিশু নাসিমের বাবা আবদুল হামিদ দাবি করেছেন তিনি নিজে না দেখলেও তার স্ত্রী আয়েশা খাতুন তা দেখেছেন। যে গাছে শিশু দুটিকে বেঁধে রাখার ঘটনা ঘটে তার সঙ্গে ছবিতে থাকা গাছের কোন মিল নেই।’ এদিকে শিশু দুটিকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ছবির উৎস কি তা নিয়ে পুলিশ তদন্তে নেমেছে। কে এই ছবি তুলেছেন এবং কখন কবে কোথা থেকে এই ছবি তুলেছেন সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এদিকে ছবিটি সাজানো কিংবা তা পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের কোন জবাব দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন কালিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘শিশু দুটিকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই নির্যাতনের মাত্রা কতটুকু তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। এছাড়া আসামি গ্রেফতার হয়েছে। তিনি স্বীকারও করেছেন নির্যাতনের কথা’।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সাইয়েদ মঞ্জুর আলম জানান, ‘নির্যাতনকারী গোলাম মোস্তফার বাড়ি থেকে ছবি নেয়া হলে তার সঙ্গে বাড়িঘরের ছবি আসবেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে ছবিতে শিশু দুটিকে বেঁধে রাখা দেখানো হয়েছে সেই গাছটি নির্যাতিত শিশু ইয়াসিনের বাড়ির একটি গাছের।’ এসব কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ছবিটি সাজানো। এর সঙ্গে শিশু নির্যাতনের বাস্তবতার কোন মিল নেই। সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোদাচ্ছের হোসেন জানান, ছবিটি সাজানো এবং তা ঘটনার কয়েকদিন পর ভিন্ন স্থান থেকে তোলা হয়েছে। ছবির এই গাছটি মোস্তফার বাড়ির নয় বলে জানান তিনি। এদিকে কালীগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর মনিরুজ্জামান জানান, তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়ে ছবির গাছটি চি?িত করে নিশ্চিত হয়েছেন ওই গাছের সঙ্গে শিশু নির্যাতনের কোন সম্পর্ক নেই।