২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাচারকারী ৭০ দালালের নাম বলেছে দেশে ফেরা ১৫৫ জন

  • ১৪ জেলায় এদের বিরুদ্ধে মামলা হবে অধরা রয়ে গেছে আরও তিন শতাধিক

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার থেকে ॥ মিয়ানমার থেকে ফিরিয়ে আনা ১৫৫ জনকে তাদের অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দেশের ১৪ জেলার ওইসব বাসিন্দা ৭০জন মানব পাচারকারী দালালের নাম প্রকাশ করেছে প্রশাসনের কাছে। শুক্রবার দুপুরে ৯ শিশু ও ১৪৬ যুবককে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে জেলা পুলিশ। কক্সবাজার ছাড়াও ঐ ১৪ জেলায় মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা দায়ের করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনীর এক জেনারেলসহ মোট ৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদিকে মালয়েশিয়া যেতে পারলে ভাল চাকরি বা বেশি আয় করা যাবে। বদলে যাবে ভাগ্য। কুঁড়ে ঘর থেকে বিল্ডিং এবং অঢেল অর্থ সম্পদ গড়তে সহজ হবে। দালাল চক্রের এমন প্রলোভনে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিয়ে তিন মাস পর টেকনাফে ফিরে আসা এক যুবকের মানব পাচার সংক্রান্ত লোমহর্ষক কাহিনী শুনে অবাক বনে গেছেন স্থানীয়রা। অনেকে কেঁদেও ফেলেছেন। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সাগরে জাহাজে ভেসে ২ মাস প্রাণ বাজি রেখে দেশে ফিরে এসেছেন টেকনাফ

উনছিপ্রাং গ্রামের মৃত আবদুল নবীর পুত্র নুরুল কবির। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস খালি হাতে দেশে ফিরলেও ঘরে এসে দেখেন, পুত্রের চিন্তায় খেয়ে না খেয়ে তার গর্ভধারিণী মা প্রায় পাগল বনে গেছেন। হারিয়ে ফেলেছে ভারসাম্য। কাছে পেয়েও নিজের ছেলেকে চিনতে পারছেন না। মা বলে ডাকলেও কোন উত্তর নেই। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে মা ও স্ত্রী সন্তানদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য মালয়েশিয়া যাত্রা, তিনমাস পর দেশে ফিরে মায়ের অবস্থা দেখে পুত্রও প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে ৩ মাস পূর্বে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রা করেছিলেন নুরুল কবির। ২ মাস পর ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে পৌঁছেন। সেখানে তাদের ভাসমান ট্রলার ডুবে যেতে দেখে জেলেরা এগিয়ে এসে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে ট্রলারের ৭শ’ জন অভিবাসীকে। একমাস ৭দিন ইন্দোনেশিয়ায় থাকার পর গত ২৯ জুন দেশে ফিরে আসে প্রাণে রক্ষা পাওয়া নুরুল কবির।

ছবি দেখে দিন যাপন ॥ কক্সবাজার পৌরসভা দক্ষিণ ডিককুলের বাসিন্দা দিনমজুর মুহাম্মদ হারুন ও মা গৃহিণী হাসিনা বেগমের একমাত্র ছেলে আবদুল মান্নানের সন্ধানে ছেলের ছবি হাতে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন স্থানে। তাদের কাছে বর্তমানে নিখোঁজ সন্তানের ছবিটিই হচ্ছে বড় সম্পদ। ছেলের শোকে তারা ছবিটিকে হাজার বার বুকে জড়াচ্ছেন প্রতিদিন। পুত্রের কথা মনে পড়লে ছবি দেখে দেখে দির যাপন করছেন বলে জানিয়েছেন নিখোঁজ সন্তান আবদুল মান্নানের পিতা হারুন। বুধবার মিয়ানমার থেকে ১৫৫ বাংলাদেশীকে বিজিবি দেশে ফিরিয়ে এনেছে খবর পেয়ে পাগলের মতো হয়ে তারা ছুটেছেন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। কিন্তু না সেখানেও তাদের আদরের পুত্র আবদুল মান্নান নেই। চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে বিকেলে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে এসে হাতে ছবি আর একখানা জিডির কপি দেখিয়ে বলেন, তাদের অজান্তে দালালরা আবদুল মান্নানকে নিয়ে গেছে। তাদের বিশ্বাস মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড অথবা মিয়ানমারের জঙ্গলে দালালদের হাতে এখনও বেঁচে থাকতে পারে তাদের ছেলেটি। ইতোপূর্বে ছেলের সঙ্গে থাকা তার বন্ধুর ফোন পেয়ে টেকনাফের এক দালালের হাতে আড়াই লাখ টাকা দিয়েছে পিতা হারুন। কিন্তু পুত্রের কোন সন্ধান এখনও পায়নি তারা। গত ১০ মে কক্সবাজার সদর থানায় দিনমজুর পিতা মুহাম্মদ হারুন বাদী হয়ে ডায়েরি (নং ৫০৬) করেছেন। আবদুল মান্নানের মতো কক্সবাজার জেলার আরও অন্তত ৫ শতাধিক যুবক-কিশোর নিখোঁজ রয়েছে এখনও।

৭০ দালালের নাম প্রকাশ ॥ অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে মিয়ানমার সমুদ্র উপকূলে ভাসমান উদ্ধার ১৫৫ বাংলাদেশীকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর সকল প্রকার আইনী প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার তাদের স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার আরও ১৫৯ জন অভিবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা রয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ জনকণ্ঠকে জানান, ১৫৫ জনের মধ্যে কেউ কোন অপরাধী না হওয়ায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মাধ্যমে শুক্রবার দুপুরে সবাইকে স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওই ১৫৫ জন দেশের ১৪ জেলার বাসিন্দা। জিজ্ঞাসাবাদকালে তারা ৭০ জন দালালের নাম উল্লেখ করেছে। ঐ ৭০জন দালালের মধ্যে কক্সবাজার জেলার একাধিক দালাল রয়েছে। ফলে কক্সবাজারেও ওইসব মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হবে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ। মানব পাচারের অপরাধে ওইসব দালালের বিরুদ্ধ কক্সবাজারসহ ১৫টি জেলায় একটি করে মামলা দায়ের করা হবে।

থাইল্যান্ডে জেনারেলসহ ৭২জন গ্রেফতার ॥ থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনীর এক জেনারেলসহ মোট ৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে। সেনাবাহিনীর জেনারেল মানাস কংপানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত মে মাসে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী একটি এলাকা শঙ্খলায় গণকবরে ২৬ জন অভিবাসীর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়াার পর থাই কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করতে মাঠে নামে। সূত্রে জানা যায়, সাগর পথে মানব পাচারের ঘটনায় থাইল্যান্ডের ইতিহাসে এত ব্যাপক তদন্ত ইতোপূর্বে আর কখনও হয়নি। প্রশাসনের ঐ অভিযান শুরু হলে মানব পাচারকারী সিন্ডিকেট সাগর উপকূলে অভিবাসী বোঝাই বহু জাহাজ ফেলে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে বেশির ভাগই অভিবাসী রোহিঙ্গা মুসলিম এবং বাংলাদেশী।

নির্বাচিত সংবাদ