২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকার মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকবে তো?

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ওরফে ফকা চৌধুরী পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী লোক ছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান মুসলিম লীগের পাণ্ডাও বলা যায়। তখন আমরা ছোট, আইয়ুবের মিলিটারি শাসন চলছে, অর্থাৎ সাদা পোশাকে খাকি শাসন। ফকা চৌধুরী তখন পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির স্পীকার। আইয়ুব খাঁ একবার রাষ্ট্রীয় সফরে দেশের বাইরে গেলে তখনকার সংবিধান (যার অস্তিত্ব বলে কিছু ছিল না, তবুও) অনুযায়ী ফকা চৌধুরী পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান। যদ্দুর মনে পড়ে ১১ দিনের জন্যে। তখনই যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি হবার কথা ছিল আমাদের কুমিল্লায়, ফকা ১১ দিনের প্রেসিডেন্ট হয়ে তা চট্টগ্রামে নিয়ে যান। ঠিক তখন থেকেই ফকা চৌধুরীর নাম আমাদের সামনে চলে আসে। কুমিল্লার মানুষ হিসেবে (অবশ্য এখন চাঁদপুরের) এরপর ফকা আমাদের কাছে এক ঘৃণিত রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পায়। দিনে দিনে তার সম্পর্কে নানান কাহিনী প্রচার হতে শুরু করে। এখনকার জেলা বা থানা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের মতো ফকা চৌধুরীও না-কি গুণ্ডা পালতেন। তাদের চামচাও বলা যায়। এমনি এক গুণ্ডা ওরফে চামচার নাম ছিল শুক্কুর আলী। ফকা চৌধুরী চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উচ্চারণে তাকে ডাকত ‘শুক্কুইজ্জা’ বলে। একবার এক জনসভায় ফকা চৌধুরী আকস্মিকভাবে শেরওয়ানীর ভেতর বুকে ঝুলানো কভার দেয়া ‘কোরআন শরীফ’ তুলে ধরে কতগুলো মিথ্যে কথা বললেন। শুক্কুর আলী সব সময় কাছে থাকত, থাকতে থাকতে বুঝতে পারত কোন্্টা ফকার সত্যিবচন আর কোন্্টা মিথ্যে বচন? বক্তৃতা মঞ্চ থেকে নামার পর শুক্কুর আলী প্রশ্ন করল, লিডার পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে এমন মিথ্যে কথাটি বললেন? ফকার উত্তর ছিল- এ জন্যেই তুই চামচা আমি নেতা, আরে শুক্কুইজ্জা আমাকে কি অত বোকা পেয়েছিস, ওটা কোরআন শরীফ নয়, এই বলে তিনি কাভারটা খুলে বললেন, এই দেখ এটি একটি ডিকশনারি? এই ছিল চট্টগ্রামের মুসলিম লীগের ডাকসাইটে নেতা ফকা চৌধুরী?

এই ডাকসাইটে নেতারই গুণধর পুত্র সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী। তাকে প্রথম দেখলাম তেজগাঁওর পুরানো পার্লামেন্টে, সম্ভবত ১৯৭৯ সালে। ইয়ং দীর্ঘাঙ্গী, কথা বলেন গলা ছাড়িয়ে। মানুষের ‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ বলে যে কথাটি সম্প্রতি বেশি শুনছি, তা ক’বছর আগেও আমি বুঝতাম না। একটি বেআদব বা অভদ্র মানুষের শরীরের ভাষা অর্থাৎ অঙ্গভঙ্গিও হয় অসভ্য, অভদ্রজনোচিত। সাকা চৌধুরীকে দেখে প্রথম মানুষের বডি ল্যাংগুয়েজ বা শরীরের ভাষা কথাটি বুঝতে পারলাম। যে মানুষের বডি ল্যাংগুয়েজ অভদ্র-অশোভন সে মানুষ কোন ভদ্র সমাজের সদস্য হতে পারার কথা নয়। কিন্তু সাকা চৌধুরী খারাপ এবং ইরিটেটিং বডি ল্যাংগুয়েজ ধারণ করেও ভদ্র সমাজে মিশে গিয়েছিলেন। কখনও কখনও এমন ভাব প্রদর্শন করতেন যে, তিনি খুব উচ্চ শিক্ষিত এবং বিলাতের দু’একটা বার-এট-ল ডিগ্রী রয়েছে তার। যা দেখি একটা ইনটেলেকচ্যুয়াল ভাবও ছিল তার মধ্যে (যদিও সবই ছিল ভুয়া। বরং সত্যিটা হলো একাত্তরে রাজাকারী করার কারণে বিজয়ের আগে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন)। এই অনুপস্থিতিটাকে তিনি ব্যবহার করেছেন বিদেশে লেখাপড়া করা বা স্পেশালাইজড ডিগ্রী অর্জনের কাল হিসেবে? কিন্তু সব কি আর ঢাকা যায়? সাকাও ঢাকতে পারেনি তার একাত্তরের নৃশংসতার ঘটনাবলী। লোকটি এতই অভদ্র এবং অশোভন বডি ল্যাংগুয়েজের মানুষ ছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়েও কৌতুক করতেন বলে শুনেছি। সাকা চৌধুরী মুসলিম লীগ পরিবারের সন্তান যা তার বাপের জীবদ্দশায়ই খতম হয়ে যায়। পরবর্তীতে অবশ্য মিলিটারি জিয়ার হাফ মিলিটারি পতœী খালেদার আঁচল ধরে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এখানেও তার অশোভন কথাবার্তা সর্বজনবিদিত। খালেদা জিয়া ও তার লুটেরা ছেলে তারেককে নিয়ে যে কৌতুকটি করেছিলেন তা রীতিমতো অশোভনীয় এবং অভদ্রজনোচিত। বলেছিলেন, “এতদিন শুনেছি কুত্তায় লেজ নাড়ে, এখন দেখছি লেজে কুত্তা নাড়ে।” এই কথা বলেও সাকা খালেদার বিএনপি নেতা হন, রীতিমতো বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য হন। এই রহস্যটি আবিষ্কার করতেও বেশি সময় লাগেনি। কারণ খালেদা-তারেক-সাকা তিনজনই পাকি এজেন্ট হিসেবে কখনও বুঝে, কখনও না বুঝে বাংলাদেশে রাজনীতি করেছেন। পাকিস্তানের টার্গেট হলো একাত্তরের প্রতিশোধ নেয়া। সে ক্ষেত্রে খালেদা বা তারেক বা সাকার চেয়ে ভাল এজেন্ট আর বেশি তো নেই। গোলাম আযম গেছে, নিজামী, মুজাহিদ যায় যায়। অপরদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাও চলে পাকিস্তানী আইএসআইর অর্থায়নে, আর সেই উলফার সঙ্গে সাকার সম্পর্ক রয়েছে গিভ এ্যান্ড টেকের ভিত্তিতে। যে কারণে খালেদা এমন অপমানকর মন্তব্য হজম করেও সাকাকে দলের শীর্ষ পর্যায়ে তো রেখেছেনই, ২০০১-এ ক্ষমতায় আসার পর একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় খালেদার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টাও বানালেন। এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়া ওআইসির সেক্রেটারি জেনারেল পদে নির্বাচন করার জন্যে বাংলাদেশের পক্ষে সাকা চৌধুরীকে মনোনয়ন দিলেন। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়া স্বাধীন বাংলাদেশ এবং সার্বভৌম বাঙালী জাতিকে অপমান করলেন। একটা যুদ্ধাপরাধী, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, কিভাবে এই লোকটি হিংস্রতার সঙ্গে মানুষ হত্যা করেছে তাকে খালেদা জিয়া মনোনয়ন দিলেন। কিন্তু খালেদা দিলে কি হবে, গোটা মুসলিম বিশ্ব পাকিস্তান নয়, সে নির্বাচনে তাই সাকা অপমানিত হয়ে ঘরে ফিরেছিলেন। কত ভোট পেয়েছিলেন তা উল্লেখ না করাই ভাল। রাজাকাররা যে নির্লজ্জ তা সাকাকে দেখলেই ভালভাবে বোঝা যাবে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় তার বিকট হাসি কে না দেখেছে। মনে হয়, এসব দেখানোর জন্যেই ট্রাইব্যুনালের সিঁড়ির গোড়ায় টিভি ক্যামেরাম্যানদের অবস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। এমনকি ট্রাইব্যুনালে যে দিন সাকার ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা হলো সেদিন তার পরিবারের লোকজন ‘ভি-চিহ্ন’ দেখায় এবং টিভি ক্যামেরা তা বার বার দেখিয়েছিল। আমার মনে হয়েছে এই ‘ভি-চিহ্ন’ প্রদর্শন যতটা না সংবাদ মূল্যের কারণে, তারচেয়ে বেশি এই যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে মানুষের সহানুভূতি সৃষ্টির জন্যে।

এই সাকার ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে আপীলের রায়ও হবে আগামী ২৯ জুলাই। এ নিয়ে মানুষের শঙ্কার অন্ত নেই। যে অপরাধী মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরও বিকট হাসিতে ভি-চিহ্ন দেখাতে পারে আপীল বিভাগে আবার কোন্্ চিহ্ন দেখাবে? ট্রাইব্যুনালের রায় (মৃত্যুদণ্ড) বহাল থাকবে তো? এমন একটি প্রশ্ন রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণকারী মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা এবং শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে। গণজাগরণ মঞ্চ যে কারণে এরই মধ্যে নতুন করে শাহবাগে কর্মসূচী পালন করবে বলেও শোনা যাচ্ছে এবং এবার সব পক্ষ মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে।

মানুষের মনের শঙ্কাও একেবারে অমূলক নয়। সরকার পক্ষের নানান লবি তৎপর; এ জন্যে বিশেষ মহল থেকে নিদ্রাবিহীন তৎপরতা চলছে এবং সে ক্ষেত্রে সন্দেহের তীর বর্তমান সরকারের কাছের কিছু মানুষের প্রতিও রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। ওদের কেউ তার আত্মীয়, কেউ বন্ধু। তাছাড়া শ্রেণী চরিত্রের দিক দিয়ে তারা সমগোত্রীয়। এটি সত্যি না গুজব জানি না, সত্যি হলে এরচেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে?

তাছাড়া সাকার অর্থের উৎস বা থলি কোনটাই কম নয়। এই অর্থ কি করতে পারে, কি পারে না তার একটা নজির আমাদের সামনেই রয়েছে। দুর্নীতির মামলায় বর্তমানে লন্ডনে পলাতক খালেদা তনয় তারেক রহমানকে দুর্নীতির মামলায় আদালতে খালাস দিয়ে এক বিচারক দেশত্যাগ করেছে। শোনা যায়, সেই বিচারকের (নিম্ন আদালতের) জন্যে মালয়েশিয়ায় আগেই বাড়ি কিনে রাখা হয়েছিল।

ইতোপূর্বে মানুষ লক্ষ্য করছে বয়সের কথা বলে একাত্তরের সবচেয়ে ঘৃণিত রাজাকার এবং পাকিস্তানী হানাদার মিলিটারির দালাল গোলাম আযমকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (৯০ বছর) দেয়া হয়েছিল। কারাগারেই তার মৃত্যু হয় এবং প্রশাসনের একশ্রেণীর বদান্যতায় তার জানাজা হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পাশের সড়কে এবং তাকে কবরস্থ করা হয় রাজধানীতে। এমনি করে আরেক শীর্ষ রাজাকার জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকেও মৃত্যুদণ্ডের বদলে আমৃত্যু কারাভোগের সাজা দেয়া হয়। সেও গোলাম আযমের মতোই বেশিরভাগ সময় হাসপাতালেই কাটাচ্ছে। বাঙালী জাতির জন্যে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের যে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতক মিলিটারি জিয়া কিংবা রাজাকার গোলাম আযমের জানাজা এবং দাফন হয় রাজধানীতে, সবুর খানের মতো দালালের কবর হয় পার্লামেন্ট চত্বরে অথচ বাঙালীর হাজার বছরের স্বপ্নসাধক আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জনকারী তথা বাঙালী জাতির রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় বীরদের জানাজা বা দাফন রাজধানীতে হতে দেয়া হয়নি। এতে জাতি হিসেবে আমরা অপমানিত বোধ করছি। সাকা চৌধুরীরও ট্রাইব্যুনালের সাজা শিথিল করা গেলে এবং খালেদা জিয়া যদি ভবিষ্যতে কখনও ক্ষমতায় আসতে পারে (যদিও তার কোন সম্ভাবনা নেই) তবে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে পারবে, আমাদের শঙ্কা এখানেই। যেমন মিলিটারি জিয়া কেবল যে জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার খুনীদের পুরস্কৃত করেই ক্ষান্ত হয়নি, সকল রাজাকারকে কারাগার থেকেও মুক্ত করে দিয়েছিলেন। খালেদা তাদের গাড়িতে শহীদের রক্ত রঞ্জিত পতাকাও তুলে দিয়েছিলেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মহসিন হলের ৭ খুনের যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরও জিয়া কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন, যাদের কেউ এখন খালেদা জিয়ার জোটের নেতা কেউ তার বশংবদ সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা। নাগরিকদের শঙ্কা এখানেই।

ঢাকা-২৪ জুলাই ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক