১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্পাদক সমীপে

স্বচ্ছতা এবং সততার অর্থ এক নয়

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা শব্দটা খুব বেশি মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু স্বচ্ছতা শব্দটার অর্থ নিয়ে আমার কাছে খুব দ্বিধা লাগে। স্বচ্ছতা শব্দটা কী সততা অর্থে ব্যবহার করা হয়, না পরিষ্কার অর্থে ব্যবহার করা হয়? আমার জানা মতে স্বচ্ছতা শব্দের অর্থ পরিষ্কার। সততা ছাড়া যদি পরিষ্কার অর্থে ব্যবহার করা হয়- আমার জানা মতে স্বচ্ছতা শব্দটা ব্যবহার করা উচিত না। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য হলো সরকারী-বেসরকারী যে কোন কাজ বাস্তবায়নের জন্য একটা নীতি তৈরি করা হয়। নীতি অনুযায়ী যদি কাজটা করা হয় তাহলে কাজটার সততা ও স্বচ্ছতা দুটাই থাকে। নীতি বাস্তবায়ন কাজের দলিল অনুযায়ী কাজটা সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রশাসনিক বিভাগ নীতি অনুযায়ী কাজ না করে দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ করে যেখানে সততার কোন খবর থাকে না। কিন্তু কাজ বাস্তবায়নের দলিল দেখলে মনে হবে সকল কাজ সততার সঙ্গে করা হয়েছে। অসৎ উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে কাজ করা হলেও লিখিত দলিলে দেখা যাবে সকল কাজ নীতি অনুযায়ী করা হয়েছে। এখানে কাজ বাস্তবায়নের লিখিত দলিল কিন্তু স্বচ্ছ। অসৎ উপায় অবলম্বন করে কাজ বাস্তবায়িত দলিলে স্বচ্ছতা আনা হয়েছে কিন্তু বাস্তবে সততার কোন খবর নেই। তাই আমি মনে করি স্বচ্ছতা না বলে সততা শব্দটা ব্যবহার করা উচিত। তা না হলে এভাবে বলা দরকার ‘সততার সঙ্গে স্বচ্ছতা থাকতে হবে’।

হুমায়ুন কবীর খান

ভালুকা, ময়মনসিংহ

গুলিস্তানের সৌন্দর্য বিলীন

ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নাকের উজানে চোখের নিচে অস্থিত ফুলের বাগান নামে খ্যাতহ গুলিস্তান ঢাকা মানে গুলিস্তান। গুলিস্তান এখন ময়লা আর্জনার শহর। সামান্য বৃষ্টি বাদলে এক হাঁটু কাদা। স্থানে স্থানে পানি জমে থাকছে। ছেঁড়া কাগজ, ঠোঙ্গা, পলেথিন, খড়কুটা, মোরগ-মুরগির পালক সবই রয়েছে এখানে। প্রাইভেটকার দাঁড়িয়ে আছে হ্যান্ড মাইকে উলঙ্গ অশ্রাব্য শব্দগুলো চলন্ত পথিকদের কানে আঘাত করছে, ক্যানভাসার বীরদর্পে শব্দ প্রয়োগ করে ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার ঘিরে ধরছে গুলিস্তানকে। স্বল্প হলুদ বাতির জোনাকি পোকার আলো তিন ফুট দুরত্বে মুখম-লের চেহেরা লক্ষ্য করা কঠিন। কোথায় লাইট পোস্ট কোথায় উজ্জ্বল আলো। চিৎকার, হৈ চৈ, কান্নার আওয়াজ আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। পকেটমার, ছিনতাইকারী, টানা ও মলমপার্টি তাদের সঠিক কাজ করে যাচ্ছে। এলোমেলো সব কাজ। ফুটপাথ দখল, সড়কে দোকান, মূল সড়কে একাধিক ময়লা ফেলার কনটেইনার রাস্তাকে আরও সরু করেছে। সামান্য বৃষ্টিতে গুলিস্তানের প্রধান সড়কটি পানিতে তলিয়ে যায়। টাউট-বাটপারে ভরপুর গুলিস্তানে নিরাপত্তার অভাব ষোল আনা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনপ্রধান নির্বাহী ও আইজিপি সিভিল ড্রেসে গুলিস্তান ভ্রমণ করে এসব প্রত্যক্ষ করুন, উপলদ্ধি করুন। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

মেছের আলী

শ্রীনগর

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও নারীকল্যাণ

আমার জন্মের কয়েক বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়। কৈশোরে আমি আমার বাবার কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব গাথার ইতিহাস শুনি। দেশ রক্ষায় বঙ্গবন্ধুর ডাকে নিরস্ত্র বাংলার সন্তানরা কিভাবে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও অনেক নারীর আত্মত্যাগ এবং সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক। আমিও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমার দুই চাচাত ভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর যোগ্যতা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্নকে সার্থক করে চলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলার সূর্যসন্তান তথা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও তাঁদের সম্মানজনক ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের সমাজে বহু শিক্ষিত ও যোগ্যতম নারী আছে। এরা নিম্ন মধ্যবিত্ত। এরা না পারে গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে কাজ করতে, না পারে অন্যকিছু করতে। এরা নানাভাবে নির্যাতিত। এই নির্যাতিত নারীর মধ্যে এমনও আছে যারা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে চাকরি খুঁজে পায়নি। চাকরি খুঁজতে খুঁজতে বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে চাই, আমাদের এই সমাজে শিক্ষিত অথচ অবহেলিত নারীদের রক্ষাকল্পে ও তাঁদের যথাযথ পুনর্বাসনে কিছু একটা করেন, যাতে তাঁরা নিজেদের প্রাপ্য সম্মান নিয়ে জীবনযাপন করতে পারেন।

রুনা লায়লা

গে-ারিয়া, ঢাকা

মানসম্মত শিক্ষক

ফরিদপুর জেলায় অবস্থিত কানাইপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত রণকাইল গ্রামের রণকাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের জন্য কোন মানসম্মত শিক্ষক নেই। এখানে অনেক শিক্ষকের এসএসসি ও এইচএসসিতে দু’একবার ফেল করার পর পাসের ইতিহাস রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক মানসিকতাসম্পন্ন জনশক্তি। এ বিদ্যালয়ে দু’এক বছর হলো বিজ্ঞান বিভাগে পড়ানো হয়। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সক্ষম শিক্ষার্থী থাকলে ও শিক্ষকের অভাবে তারা বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারছে না। এখানে বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি সরকার থেকে দেয়া হলেও শিক্ষক না থাকার কারণে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারছে না। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ও বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলাতে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকল্প নেই। বিজ্ঞান বিভাগের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন এজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মোঃ শাহীন সরদার

কানাইপুর, ফরিদপুর

গণপরিবহনে ছাত্রছাত্রী

আমরা যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ি থেকে দূরে পড়াশোনা করছি, ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় টিকেট নিয়ে ঝামেলায় পড়ি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রোজার মাসের শেষের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে, এতে ছাত্রছাত্রীরা নানা দুর্ভোগের শিকার হয়। বিশেষ করে মেয়েরা হয়রানির সম্মুখীন হয়ে থাকে। কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অনেকাংশে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

কারিনা আফরোজ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ফেনসিডিলের মরণ ছোবল

ফেনসিডিল এক ধরনের ওষুধ। কাশির ওষুধ। সাধারণত ইন্ডিয়া, নেপাল এবং বাংলাদেশের লোকদের মাঝে এর আসক্তি দেখা যায়। তবে এর মাঝে বাংলাদেশের লোকদের মাঝেই এর আসক্তি খুব বেশি। তবে অন্যান্য দেশের মধ্যে একমাত্র সাউথ আফ্রিকাতেই উল্লেখযোগ্যভাবে এর আসক্তি দেখা যায়।

ফেনসিডিল সাধারণত ইন্ডিয়াতে তৈরি হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করা হয়েছিল এ ওষুধ তৈরির কারখানা বন্ধ করার জন্য। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি তা বোঝা যাচ্ছে ভালভাবেই। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ ফেনসিডিল আসক্ত এবং তা ক্রমেই বেড়ে চলছে।

ছদ্মনাম: ফেন্সি/ডাইল/ফান্টা/ফান্টু/ইঞ্চি/টাকা (১০০০ টাকা মানে একটা ফেনসিডিল)/মধু/বাঘের দুধ/লাইন/মবিল/মাল ইত্যাদি। মাদকাসক্তরা নিজেদের মধ্যে ফেন্সি নিয়ে আলাপ করার সময় কিংবা কেনার সময় এই ছদ্ম নাম ব্যবহার করে, যাতে সাধারণ মানুষ কি নিয়ে আলাপ হচ্ছে তা বুঝতে না পারেন।

বর্তমানে ফেনসিডিল একটু দামী নেশা। সাধারণত প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর বেচাকেনা হয় এবং এক জায়গায় ৫-৬ দিনের বেশি থাকে না। বেশিরভাগ সময়ই মোটরসাইকেল না থাকলে এটা সংগ্রহ করা কষ্টকর। মাঝে মাঝে যারা বিক্রি করে তারাও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ক্রেতার কাছে দিয়ে আসে। সাধারণত লোকাল লিডারদের ছত্রছায়ায় এর বেচাকেনা চলে। দামের ক্ষেত্রে বলা যায়, আজ থেকে ৬-৭ বছর আগেও এক বোতল বিক্রি হতো ৮০-১০০ টাকায়। বর্তমানে এলাকাভেদে এর দামের তারতম্য দেখা যায়। সাধারণত সীমান্ত এলাকায় ২০০-২৫০ টাকায়, সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৩০০-৩৫০ টাকায় এবং অন্যান্য এলাকায় ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। দামের ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা দু’জনই একক সংখ্যা ব্যবহার করে। মানে ৭ টাকা ৮ টাকা এবং এর কেনাবেচা অত্যন্ত তড়িৎগতিতে সম্পন্ন হয়।

দিন কে দিন ফেনসিডিল আসক্তি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর সেবনের সুবিধার জন্য। অন্য যে কোন ধরনের মাদক সেবনের জন্য ন্যূনতম একটু সময় এবং জায়গা দরকার। কিন্তু ফেনসিডিলের জন্য সময় এবং জায়গা কোনটারই দরকার নেই। অনেকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসেও খেয়ে থাকে। সাধারণত দাম একটু বেশি হওয়ার কারণে দু’জন শেয়ার করে এক বোতল খায়। আর এক বোতলে থাকে ১০০ মিলি। সাধারণত কৌতূহল থেকেই অনেকেই ফেনসিডিল খেয়ে থাকেন। এতে বিভিন্ন সমস্যা হয়, যেমন- শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, রুচি নষ্ট হওয়া, এবডোমিনাল পেইন, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। কিন্তু ফেনসিখোরদের পরিণতি খুব ভয়াবহ। আর বেশিরভাগ ফেনসিখোরদের কেউই এমনকি পরিবারের সদস্যরাও ট্রেস করতে পারে না। যারা একেবারেই ফেনসিখোর তারা একা একা চলাফেরা করে। দিনের বেলায় কাজ না থাকলে বের হয় না। ফেনসিডিলের নেশা ছাড়ার জন্য আত্মবিশ্বাসী হওয়া জরুরী।

আবুল বাশার মিরাজ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

উচ্চশিক্ষায় কর

‘শিক্ষা জাতির মেরুদ-’ কথাটি অনেক পুরনো। জাতির মেরুদ-কে সোজা করতে হলে উচ্চশিক্ষিত হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। তাই তো আজ আমরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের করুণ পরিস্থিতির জন্য আজ আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হয়েছি। এখন বর্তমান সময়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা অধ্যয়ন করে না। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা দেশ ও নিজের কথা চিন্তা করে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এই দেশের আরও বেশি উন্নতির জন্য প্রয়োজন উচ্চশিক্ষিত যুব সমাজ। আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা খুবই নগণ্য। যে পরিমাণ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করে বের হচ্ছে, তার তিন ভাগের এক ভাগকে জায়গা দিতে পারছে না পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাচ্ছে না তারা কি পড়াশোনা ছেড়ে দেবে?

আমাদের দেশের সরকার চায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে। এই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে জাতিকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আর এই উচ্চশিক্ষার জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বছর (২০১৫-১৬ অর্থবছর) বাজেটে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ৭.৫০% কর আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যা শিক্ষা খরচকে আরও বৃদ্ধি করে দেবে। সকলের পক্ষে এই বাড়তি অর্থ যোগান দেয়া সম্ভব হবে না। কেননা বর্তমানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা অধ্যয়ন করে না, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও অধ্যয়ন করে। শিক্ষা তো কোন ভোগ্যপণ্য নয়, শিক্ষা হচ্ছে আমাদের মৌলিক অধিকার।

মাহফিজুর রহমান শিমুল

নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল

ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী

ভাওয়াল রাজার গাজীপুর

জয়দেবপুরের পাশেই গাজীপুর। জেলা শহর গাজীপুর বেশ সাজানো-গোছানো। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক কীর্তি। দিল্লীর সম্রাট মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে পালোয়ান গাজী নামক জনৈক মুসলমান বীর এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে এই পালোয়ান গাজীর নামানুসারে এলাকার নাম হয় ‘গাজীপুর’। গাজীপুরের কৃতী সন্তান হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীন। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। জন্ম ১৯২৫ সালে। ঢাকা জেলখানায় তাঁকে ১৯৭৫ সালে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাস ভাওয়ালের জয়দেবপুরে ১৮৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ভাওয়াল রাজ স্টেটের ম্যানেজার প্রখ্যাত সাহিত্যিক রায় বাহাদুর কালী প্রধান ঘোষের অধীনে গোবিন্দ চন্দ্র দাস রাজ স্টেটের কর্মচারী ছিলেন। ১৯১৮ সালে তিনি মারা যান। কবির কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো ‘ফুল চন্দন’।

জয়দেবপুরের অন্যতম আকর্ষণ ভাওয়ালের রাজবাড়ী। এটি এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন একটি দীঘি দেখবেন। এখানে একদা রানীরা স্নান করতেন। ভাওয়াল রাজবাড়ীকে নিয়ে আছে অনেক কাহিনী। রাজা রমেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে তার স্ত্রী বিভাবতীর কোন আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না। রানী বিভাবতী পরকীয়া প্রেমে আবদ্ধ ছিলেন তাদেরই রাজকর্মচারী ডাঃ আশুতোষের সঙ্গে। কুমার রমেন্দ্র জানতেন না এ ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আশুতোষ ও রানীর এ সম্পর্ক। ডাঃ আশুতোষ রানীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাজাকে দার্জিলিংয়ে গিয়ে হাওয়া বদলের কথা জানালেন। ডাঃ আশুতোষ দার্জিলিংয়ে গিয়ে রাজাকে ওষুধের নাম করে বিষপান করালেন। বিষ খেয়ে রাজা অচেতন হলেন। অতঃপর তার দেহটা সৎকারের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হলো চিতায়। এদিকে প্রচ- বর্ষণে শবদেহ বহনকারীরা মৃতদেহ দাহ না করেই ফিরে এলো। রানী বিভাবতী জেনেছিলেন, দাহ সম্পন্ন হয়েছে। রাজা কিন্তু আসলে মারা যাননি। জ্ঞান ফিরে তিনি রানীর সঙ্গে দেখা না করে সন্ন্যাসী জীবন বেছে নিলেন। বহু বছর পরে রাজা জয়দেবপুরের ভাওয়ালে আসেন এবং হারানো রাজত্ব ফিরে পান।

বিভিন্ন তথ্য : মুহম্মদ শাহ তুঘলকের সময় পালোয়ান গাজী এ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। পর্যায়ক্রমে গাজীবংশের লোকেরা ৫শ’ বছরের বেশি সময় এ এলাকা শাসন করেন। জনগণ তাদের শাসনামলের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ভালবেসে এলাকার নাম রাখের গাজীপুর। গাজীপুর জেলার উত্তরে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলা, দক্ষিণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, পূর্বে নরসিংদী জেলা অবস্থিত। আয়তন ১,৮০৬.৩৬ বর্গকিলোমিটার। গাজীপুর জেলার মোট উপজেলা ৭টি। এগুলো হলোÑ গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, টঙ্গী ও জয়দেবপুর। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তুরাগ, বালু, বানার, শীতলক্ষ্যা ও লাখিয়া নদী। রাজবাড়ী, ভাওয়াল উদ্যান ও নুহাশপল্লী এখানের অন্যতম আকর্ষণ।

ভাওয়াল গড়ের সেই করুণ কাহিনী : ঐতিহাসিক ভাওয়াল গড়ের কাহিনী আজ আর কারও অজানা নেই। কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ, রানী লীলাবতী, আশু ডাক্তার অনেক আগেই মারা গেছেন। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে রাজপ্রাসাদ, দীঘি ও মন্দিরগুলো দাঁড়িয়ে আছে। পনেরো বছর বয়সে লীলাবতীর বিয়ে হয়। তার বাবা ছিলেন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ। বিয়ের পরে স্বামীর ঘরে যান লীলাবতী। প্রায়ই তিনি দীঘির ঘাটে যেতেন। ঘাটের কিছু দূরেই বিশাল শালবনের সবুজ মায়াময় পরিবেশ। তার মাঝে রাঙা মাটির রাস্তা। এসব লীলাবতীর মন কেড়ে নিত। রাজার নাটমন্দিরে খুব ঘটা করে পূজা হতো। রানী বিলাসমণি নিজে মেয়েদের তত্ত্বতালাশ করতেন। ‘চতর’ গ্রামে থাকতেন লীলাবতী। ওই গ্রাম হতে ভাওয়াল রাজপ্রাসাদ খুব বেশি দূরে ছিল না। লীলাবতীর স্বামী রাজার সেরেস্তারই কাজ করতেন। কুমার রমেন্দ্র নারায়ণের প্রমোদকুঞ্জ থেকে নাকি লীলাবতী রেহাই পায়নি। পরে নিজের অপবিত্র দেহটা স্বামীর কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। লীলাবতী আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, পরে অবশ্য করেননি।

লিয়াকত হোসেন খোকন

মিরপুর, ঢাকা