২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঈদ শেষে দক্ষিণের লাখো মানুষের কাজে ফেরার যুদ্ধ

  • বরিশাল লঞ্চঘাট ও বাস টার্মিনালে শুক্রবার ছিল উপচেপড়া ভিড়

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ আপনজনদের সঙ্গে ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দ উপভোগ করে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষ। নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে আসা এসব মানুষের যাত্রাপথে তেমন কোন সমস্যার সৃষ্টি না হলেও একমাত্র বৃষ্টির কারণে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। গত কয়েকদিনের তুলনায় সরকারী ছুটির দিন শুক্রবার বরিশাল লঞ্চঘাট ও বাস টার্মিনালে ছিল কর্মস্থলে ফেরার যুদ্ধে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়।

কংক্রিটের দেয়ালে ঘেরা শহরের ছকবাঁধা জীবনের ক্লান্তি ভুলে আপনজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ গ্রামের সবুজ, শ্যামল পরিবেশে ঈদের ছুটি কাটিয়েছেন। গ্রামের মেঠোপথ, আপনজনদের মধুর সব স্মৃতি পেছনে ঠেলে ঈদের ছুটি শেষে জীবিকার তাগিদে ঘরমুখী ওইসব মানুষগুলো এখন সবাই কর্মস্থলমুখী। নগরীর লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনালে কর্মস্থলমুখী যাত্রীদের ভিড় সামাল দিতে ও শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস এবং লঞ্চ ঘাটে প্রশাসনের বাড়তি নিরাপত্তা বলয় অব্যাহত রয়েছে।

সরেজমিনে বরিশাল নৌবন্দরে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো টার্মিনাল এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অধিকাংশ লঞ্চ ঘুরে দেখা গেছে, ডেকের সিট দখল হয়ে গেছে। একইভাবে লঞ্চের কেবিনের আশপাশ ভরে গেছে। চাকরিজীবী হাফিজুর রহমান জানান, তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরি করেন। পরিবারের সদস্যদের ভিড় কমলে আসতে বলা হলেও যেভাবেই হোক আজ তাকে কর্মস্থলে ফিরতেই হবে। কিন্তু তিনি কোন কেবিনের টিকেট কিংবা ডেকেও জায়গা না পেয়ে লঞ্চের ছাদে উঠেই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন। হাফিজুর রহমানের মতো অনেকেই লঞ্চের ছাদে করে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছেন। তবে রাতে বৃষ্টি হলে তাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ’র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মোঃ সোহরাব হোসেন জানান, শুক্রবার বিধায় যাত্রীর চাপ বেড়ে গেছে। এজন্য কালাম খান-১, পারাবাত-১১, পারাবাত-১০, দ্বীপরাজ, সুরভী-৯, সুরভী-৮, সুন্দরবন-৭, সুন্দরবন-৮, কীর্তনখোলা-২ এবং ফারহান-৮ লঞ্চ আগেভাগেই ঘাটে এনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। লঞ্চে যাত্রী ভরে গেলেই লঞ্চ ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আবুল বাসার মজুমদার জানান, যাত্রীর চাপ সামালাতে ১০টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া যাত্রীরা যাতে টার্মিনালে অবস্থান নিতে পারে সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি যাত্রীদের নিরাপত্তায় একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্ব ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়োজিত রয়েছে। তাছাড়া নৌ-বন্দরে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।

বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটের বিলাসবহুল সুন্দরবন লঞ্চ কোম্পানির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থেকে শুরু করে তাদের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে আমাদের সকল প্রকার ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার যুদ্ধ শুরু হলেও বৃষ্টির কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব আহম্মেদ বলেন, ঈদে বাড়ি ফেরার চেয়ে কর্মস্থলে ফেরার যাত্রীদের সংখ্যা বেশি। যে কারণে যাত্রীদের সুবিধার্থে বরিশাল-ঢাকাসহ প্রতিটি রুটের রোড পারমিট প্রথা বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ থাকায় বিলম্ব না করে বাসের সিট অনুযায়ী যাত্রী উঠামাত্রই বাসগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে।

বাড়তি নিরাপত্তা ॥ ঈদে ঘরে ফেরার পর ঈদ পরবর্তী নিরপাদে কর্মস্থলে ফেরার ক্ষেত্রে এবারই সর্বপ্রথম নতুন চমক সৃষ্টি করেছেন সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ফলে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের লাখো যাত্রী ঈদের আনন্দ শেষে লঞ্চ ও সড়ক পথে অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্যে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন। যাত্রীদের বাড়িতে ফেরা ও পুনরায় কর্মস্থলে ফেরার ক্ষেত্রে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড থেকে শুরু করে প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে একাধিক কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ায় যাত্রীরা শতভাগ নিরাপত্তার মাঝেই পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পেরেছেন। জেলা প্রশাসক ড. মোঃ গাজী সাইফুজ্জামান জানান, ঈদে ঘরমুখী ও ঈদের আনন্দ শেষে কর্মস্থলে ফেরার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। যেকারণে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বরিশাল-ঢাকা নৌরুটসহ সড়ক পথে যাতায়াতকারী গোটা দক্ষিণাঞ্চলের ঈদে ঘরমুখী লাখ লাখ বাসিন্দা ঈদ শেষে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন। স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি শেষে শুক্রবার লঞ্চযোগে বরিশাল টার্মিনাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া বাকেরগঞ্জের সোহরাব হোসেন জানান, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার তারা অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পেরেছেন। আকলিমা বেগম নামের আরেক যাত্রী বলেন, ঈদের সময় যাত্রীদের বাড়তি ভিড় হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার পরেও সঠিক সময়ে লঞ্চগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া এবং ঘাটে তেমন কোন ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই যাতায়াতের ক্ষেত্রে এবার নতুন চমক সৃষ্টি হয়েছে।

চাঁদপুর ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, চাঁদপুর থেকে ঢাকা অভিমুখে ধারণ ক্ষমতার বাইরে ২/৩ গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে ছাড়ছে যাত্রীবাহী লঞ্চ। শুক্রবার সকাল থেকে বিকাল ২টা ৪০ পর্যন্ত চাঁদপুর লঞ্চঘাটে এমন চিত্রই লক্ষ্য করা গেছে।

লঞ্চে জায়গা না থাকার কারণে অনেক যাত্রী টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পরিবারের সঙ্গে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন শেষে কর্মমুখী মানুষ তাদের কাজে যোগ দিতে হঠাৎ করে গতকাল সকাল থেকে লঞ্চঘাটে আসতে থাকে। শরীয়তপুর জেলার চরাঞ্চল, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর জেলাসহ চাঁদপুরের বেশিরভাগ মানুষই লঞ্চে যাতায়াত করে। এই সুযোগে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাদের ইচ্ছেমত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করছে।