১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৃষ্টিতেও রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রে ভিড়

শর্মী চক্রবর্তী ॥ শ্রাবণের অঝোর ধারা ব্যস্ত রাজধানীবাসীর ঈদ আনন্দ উপভোগে খুব বেশি বাগড়া দিতে পারেনি। কারও কারও ক্ষেত্রে কিঞ্চিত্ ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে প্রাণ খুলে ঘুরে বেড়ানোতে বড় বাধা ছিল বৃষ্টি। ঈদের পুরোটা দিন ছিল বৃষ্টি। শুক্রবার রাত থেকে ভেঙে পড়েছিল শ্রাবণের আকাশ। সোমবার পর্যন্ত শ্রাবণের কালো গুমোট আকাশ থেকে ঝরে পড়েছিল অবিশ্রান্ত বৃষ্টির কণা। কখনও একনাগাড়ে, কখনও কিছু বিরতি দিয়ে। ঈদের দিন সকালে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে ছিল। কিন্তু তার পরও ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দ উপভোগ থেকে বিরত থাকেননি রাজধানীবাসী। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি আর পোশাক পরে সর্বস্তরের মানুষ ছুটে গেছেন মসজিদ আর ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণকে উপেক্ষা করে আনন্দ পরিপূর্ণ করতে নগরবাসীর অনেকেই ছুটে গেছেন বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। তখন রাজধানী ও আশপাশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছিল হাজারো মানুষের উপস্থিতি। যানবাহন পেলে ফাঁকা ও যানজটমুক্ত রাজপথ পেরিয়ে অল্প সময়েই বিনোদন কেন্দ্রে পৌঁছেছেন মানুষ। তবে গণপরিবহন কম থাকায় চলাচলে সমস্যায় পড়েছেন অনেকেই। সময়মতো যানবাহন না পেয়ে বৃষ্টিতে ভিজলেও তাতে আনন্দের রেশ কাটেনি। শনিবার দুপুরের পর বৃষ্টির তোড় খানিকটা কমে আসতেই উৎসবপ্রিয় মানুষ বেরিয়ে পড়েন নির্মল আনন্দের খোঁজে। বৃষ্টিমুখর দিনে শখ করে কেউ কেউ রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন।

ঢাকাবাসীর ঈদ আনন্দ উদযাপনের প্রধান জায়গা হলো বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র। ঈদে বাড়তি বিনোদনের আশায় অনেকে ছুটছেন বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। ঈদের দিন ও দ্বিতীয় দিনে মিরপুর চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, শিশুমেলা, বলধা গার্ডেন, গুলশান লেক পার্ক, ধানম-ি লেক, নভোথিয়েটার, জাতীয় জাদুঘর, যমুনা ফিউচার পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জাতীয় সংসদের সামনে, চন্দ্রিমা উদ্যান, টিএসসি ও হাতিরঝিল,সদরঘাটের আহসান মঞ্জিল, সায়েদাবাদের ওয়ান্ডারল্যান্ডের মতো শিশুদের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ভালই ছিল। তবে বৃষ্টির কারণে অন্যবারের তুলনায় এবারে লোকসংখ্যা ছিল অনেকটা কম।

ঢাকার অদূরে সাভারের নন্দন পার্ক, আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডম, ওয়াটার কিংডমে বেড়াতে যাওয়া থেকেও অনেককে বিরত রাখতে পারেনি বর্ষণ। অনেকে আবার ঝুম বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় চড়ে ফাঁকা রাজধানীতে ঘুরেছেন। এটি কারও কারও জন্য ছিল অনেক আনন্দের। ঈদের দিন থেকে রাজধানীর বেশিরভাগ প্রধান সড়ক ছিল যানজটমুক্ত। প্রায় ফাঁকা। ঈদের ছুটিতে প্রায় ফাঁকা ভিআইপি সড়কে রিকশা চলতেও ছিল না কোন বাধা। বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেকে। এই রিকশাবিলাসে কেউ কেউ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে রিকশার হুড ফেলেছেন, কেউবা হুড খোলা রেখে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ উপভোগ করেছেন। অনেকে আনন্দকে ধরে রাখতে মেতে ছিলেন মোবাইল ফোনে সেলফি তোলায়।

বৃষ্টির দিনগুলোতে বাড়ি থেকে বের হতে মন চায় না কারো। কিন্তু ঈদের দিন বলে কথা। আর বছর ঘুরে এই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকে মানুষ। বৃষ্টি তো আর ঈদ আনন্দের থেকে বড় হতে পারে না। তাই তো বৃষ্টি বিড়ম্বনা উপেক্ষা করেই প্রিয়জনের হাত ধরে হাতিরঝিলে বেড়িয়েছেন রাজধানীবাসী। নতুন পোশাকে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে ছেলে-বুড়োরাও ঘুরে বেরিয়েছিলেন।

শনিবার ঈদের দিন বিকেলে হাতিরঝিল এলাকায় পরিবার-পরিজন কিংবা প্রিয়জন অথবা কাছের মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করছেন অনেকেই। জনতার ঢল দেখে মনে হওয়ার কথাÑ হাতিরঝিল এলাকা যেন ঢাকার আর একটি বিনোদন কেন্দ্র। আর হবেই না বা কেন? হাতিরঝিলের বিশাল অংশজুড়ে ফাঁকা স্থান। ইট-পাথরের এ শহরে এমন ফাঁকা স্থানে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ ঢাকাবাসী খুব কমই পান। এছাড়া ঝিলের পাড়ে রয়েছে বসার জায়গা। ঠা-া বাতাসে মন ভাল হওয়ারই কথা। তাই ঈদের ছুটিতে বৃষ্টিতে ভিজেই প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাতে হাতিরঝিলকে বেছে নিয়েছেন অনেকেই।

মগবাজার থেকে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলেন সামিহা। তিনি জানান, ঢাকার বেশিরভাগ বিনোদন কেন্দ্র যেমন চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন অনেক দূরে। তাই ঈদের বিকেলে বাড়ির পাশে হাতিরঝিলে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

মধুবাগের সাজ্জাদ হোসেন। বৃষ্টি ছাপিয়ে স্ত্রী, সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন হাতিরঝিলে। তিনি জানান, বছরে ঈদ তো একদিনই। তাছাড়া অফিস থেকেও তো আর ছুটি পাব না। তাই বৃষ্টির জন্য যদি ঘরে বসে থাকি তাহলে ঈদ আনন্দও হবে না, ছুটিটাও মাটি হয়ে যাবে।

মায়ের সঙ্গে ঈদ আনন্দ কাটাতে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন স্কুলছাত্রী সৌমিতা। তিনি জানান, বৃষ্টির জন্য সারাদিন ঘরে বসে ছিলাম। বিকেলে আর ঘরে আটকে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। তাই মার সঙ্গে বেড়াতে বের হয়েছি। হাতিরঝিলেও ছিল ধনী-দরিদ্র, ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষের ভিড়। দুপুরে বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও হাতিরঝিল প্রকল্পের চারটি সেতু ও উড়ালসড়ক এবং লেকের পাড়ে ঘুরেফিরে মানুষ আনন্দ করছিলেন। বিকেল হতেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গোটা হাতিরঝিল।

হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা সবার চোখে-মুখে ছিল আনন্দের বন্যা। কেউ প্রিয়জনকে নিয়ে গল্প করছেন। কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মারছেন। কেউ বা গাইছেন গান। লেকের পাশে বসে মনের মানুষকে নিয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছিলেন তরুণ-তরুণী।

নানা পেশার নানা বয়সের মানুষ ভিড় করায় সেখানে বেচাকেনাও চলে হরেক রকম দ্রব্যের। শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে ঝালমুড়ি, চটপটি নানা ধরনের জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর।

শুধু হাতিরঝিলই নয় অনান্য বিনোদন কেন্দ্রেও ছিল ঢাকাবাসীর আনাগোনা। ঢাকা চিড়িয়াখানায় ছিল দর্শনার্থীর বিপুল উপস্থিতি, তবে গত বছরের মতো উপচেপড়া বাঁধভাঙা ভিড় নয়। কারণ সেই বৃষ্টি। যারা গিয়েছিলেন তাদের প্রায় সবার হাতেই ছিল ছাতা। কারও গায়ে ছিল রেনকোট। এসব নিয়েই বৃষ্টির মধ্যে চিড়িয়াখানায় নারী, পুরুষ, শিশুরা পশু-পাখি দেখতে গিয়েছিলেন। ঈদে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্তের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই চিড়িয়াখানা। শিশুরা মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে নানা প্রাণী দেখেছে, উপভোগ করেছেন। কিন্তু ঈদের দিন তুমুল বৃষ্টি এই আনন্দ অনেকটা ম্লান করে দেয়। আর চিড়িয়াখানার ভেতর কোন ছাউনি না থাকায় প্রায় সব দর্শনার্থীকেই কাকভেজা হতে হয়েছে।

মতিঝিল থেকে স্কুলশিক্ষার্র্থী জান্নাত তার বাবা-মার সঙ্গে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিল ঈদের দিন। মা-বাবার সঙ্গে এ খাঁচা থেকে ও খাঁচা ঘুরে ঘুরে দেখেছে। তারা সবাই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। তারপরও ঘোরাঘুরি বাদ দেয়নি। পুরোটা চিড়িয়াখানা ঘুরে বাসায় ফিরে তারা।

ঈদের দিন এবং এর পরদিন শিশুপার্কের প্রতিটি রাইডের সামনে সাধারণ দিনের তুলনায় বেশি ভিড় ছিল। ঈদ উপলক্ষে নতুন করে সাজানো হয়েছিল পার্কের চারপাশ। রং নষ্ট হয়ে যাওয়া রাডগুলোতে নতুন করে রং লাগানো হয়েছিল। কিন্তু সাজসজ্জা তেমন কাজে আসেনি, বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পার্কের পরিবেশ পরিষ্কার করা হলেও বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় পার্কের প্রবেশমুখে ঢুকতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল অনেককেই। এখানে শুধু শিশুরাই নয় তাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন বড়রা। বড়দের সংখ্যাও কম ছিল না। বলতে গেলে শিশুপার্কে বড়দের সংখ্যা ছিল শিশুদের সংখ্যার কাছাকাছি। শ্যামলীর শিশুমেলাতেও ছিল আনন্দপ্রিয় শিশু, কিশোর ও তাদের অভিভাবকদের ভিড়। এবার ঈদের দিন খোলা ছিল না জাতীয় জাদুঘর, স্বাধীনতা জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল ও লালবাগ কেল্লা। তবে ঈদের পরদিন রবিবার বেলা ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা ছিল এসব দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র।

শিশুপার্কের উল্টোদিকে রাস্তার ওপারে রমনা পার্কেও ছিল দর্শনার্থীর আনাগোনা। ছাতা হাতে কেউ সবান্ধব গিয়েছিলেন, কেউ গিয়েছিলেন সপরিবারে। তবে এদের সংখ্যা অন্যবারের তুলনায় অনেক কম ছিল। বৃষ্টির সময় রমনা পার্কের ছাউনিগুলো ছিল আশ্রয়স্থল। বড় গাছগুলোই বৃষ্টিতে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও ঘুরতে গেছেন অনেকে। অনেকে বৃষ্টিভেজা গাঢ় সবুজের সান্নিধ্য পেতে ছুটে গেছেন বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ওয়ারির বলধা গার্ডেনে। তবে অবিরাম ঝির ঝির বৃষ্টির জন্য ভালভাবে কেউ আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি।

ঢাকার অদূরে থিম পার্ক বলে খ্যাত বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও ছিল উল্লেখ করার মতো ভিড়। ফ্যান্টাসি কিংডম, নন্দন পার্কের মতো আধুনিক এই বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বৃষ্টি কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে ঢল নেমেছিল এসব কেন্দ্রে দর্শনার্থীর। মধ্যরাত পর্যন্ত হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর ছিল এসব কেন্দ্র। ঈদ উপলক্ষে এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন ছিল কনসার্ট, ড্যান্স শো, ডিজে শো, সেলফি জোন, মেহেদি কর্নারসহ অনেক কিছু। ঈদের দিন এসব আয়োজনে অংশ নিয়েছে অনেকেই।

পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল বেড়ানোর জায়গাগুলোতে সপরিবারে গিয়েছিলেন অনেকে। চকবাজার, লক্ষীবাজার, সুরিটোলা, আরমানিটোলা, ইংলিশ রোড, ধূপখোলা মাঠ, নয়াবাজারসহ কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। ঈদের দিন থেকে শুরু হওয়া মেলাগুলোতে ছিল শিশু-কিশোরদের সরব উপস্থিতি। ছিল বড়রাও।